নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশে হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের বিস্তার, বিভিন্ন সংগঠনের তৎপরতা, আন্তঃদেশীয় সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পলিসি স্টাডিজের (সিএসপিএস) আলোচনা সভায় অংশ নেয়া বক্তারা। তারা বলেন, বিষয়টি শুধু ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক বিতর্ক হিসেবে না দেখে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সাথে যুক্ত করে বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
গতকাল শুক্রবার সিএসপিএসের সম্মেলন কক্ষে ‘বাংলাদেশের হিন্দুত্ববাদ ও সার্বভৌমত্ব প্রশ্ন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এমন অভিমত উঠে আসে। সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবদুর রব। সভাপতিত্ব করেন সিএসপিএসের চেয়ারম্যান ও সাবেক সচিব ড. আইয়ুব মিয়া। আলোচনায় অংশ নেন সাবেক অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম, গবেষক শাহ আব্দুল হালিম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) আবু নাসের, কমান্ডার শামীম, কর্নেল (অব:) জাকারিয়া, সাবেক সচিব ড. আবুল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, ড. সাদেক আবদুল্লাহ, মাসুমুর রহমান খলিলী, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মাহবুবুর রহমান, ব্যারিস্টার মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন প্রমুখ।
মূল প্রবন্ধে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভিসি ড. মোহাম্মদ আবদুর রব বাংলাদেশে হিন্দুত্ববাদের সম্ভাব্য বিস্তারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, হিন্দু ধর্ম, হিন্দু সম্প্রদায় এবং হিন্দুত্ববাদকে একই বিষয় হিসেবে দেখা ঠিক নয়। হিন্দু ধর্ম একটি ধর্মীয় বিশ্বাস ও জীবনদর্শন; অন্যদিকে হিন্দুত্ববাদ মূলত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ হিসেবে বিকশিত হয়েছে। তবে বাংলাদেশের কিছু সংগঠন ও প্ল্যাটফর্মের কর্মকাণ্ডে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক ভাষ্য ও ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সাথে সাদৃশ্য দেখা যাচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
প্রবন্ধে ইসকন, বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোট, ঐক্যবদ্ধ সনাতনী সমাজ বাংলাদেশ, বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোট, বাংলাদেশ হিন্দু জাগরণ মঞ্চ, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সংগঠনের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করা হয়। ইসকনের বিষয়ে প্রবন্ধে বলা হয়, সংগঠনটি মূলত আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় প্রচারের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হলেও বাংলাদেশে এর কিছু কর্মকাণ্ডকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রবন্ধকারের দাবি, বাংলাদেশে ইসকনের বিস্তারের সাথে ভারতের কৌশলগত স্বার্থের সম্পর্ক রয়েছে। তবে এসব দাবির অনেকগুলোই স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে আলোচনায় মত আসে।
ইসকনের সাথে ভারতের সরকারি যোগাযোগের প্রসঙ্গে প্রবন্ধে ২০১৮ সালে সিলেটে ইসকনের একটি ছাত্রাবাস উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তৎকালীন ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলার বক্তব্যের উল্লেখ করা হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে শ্রিংলাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, ভারত সরকার বাংলাদেশে ইসকনের কর্মকাণ্ডে সহায়তা করেছে এবং সিলেটে একটি প্রকল্পে ভারতীয় হাইকমিশন ৭ দশমিক ৪ কোটি টাকা অর্থায়ন করেছে। তবে সরকারি সহায়তা থাকলেই কোনো সংগঠনের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বা মতাদর্শগত নির্দেশনার প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়- এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।
মূল প্রবন্ধে বাংলাদেশ হিন্দু জাগরণ মঞ্চের কার্যক্রমেরও উল্লেখ করা হয়। সংগঠনটির কয়েকজন নেতার ২০২৪ সালে ভারত সফর এবং বিজেপির কয়েকজন নেতার সাথে সাক্ষাতের বিষয়টি তুলে ধরে প্রবন্ধে প্রশ্ন তোলা হয়, এসব যোগাযোগের রাজনৈতিক তাৎপর্য কী। প্রকাশ্য সংবাদ প্রতিবেদনেও নিহার হালদারের সাথে ভারতের ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গের কয়েকজন বিজেপি নেতার সাক্ষাতের তথ্য এসেছে।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক বিনিময় বা ধর্মীয় সম্পর্ককে সরাসরি রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখার পরিবর্তে প্রতিটি যোগাযোগের প্রকৃতি, অর্থের উৎস, সাংগঠনিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম পৃথকভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
প্রবন্ধে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের কর্মকাণ্ড নিয়েও সমালোচনা করা হয়। সংখ্যালঘু নির্যাতনের পরিসংখ্যান অতিরঞ্জিত করার অভিযোগ তোলা হলেও এ বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য ও তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ২০১৯ সালে সংগঠনটির তৎকালীন নেতা রানা দাশগুপ্ত আলোচিত প্রিয়া সাহার বক্তব্যকে তার ব্যক্তিগত বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন; পরবর্তীতে প্রিয়া সাহাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের খবরও প্রকাশিত হয়।
প্রিয়া সাহা ২০১৯ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশে তিন কোটি ৭০ লাখ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ‘নিখোঁজ’ হওয়ার দাবি করেছিলেন। ওই বক্তব্য ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে এবং বাংলাদেশের সংখ্যালঘু পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোট ও হিন্দু জাগরণ মঞ্চের ক্ষেত্রে ‘জয় শ্রীরাম’সহ ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী পরিসরে ব্যবহৃত বিভিন্ন স্লোগান ও প্রতীকের ব্যবহারও আলোচনায় আসে। একটি প্রকাশিত বিশ্লেষণে বাংলাদেশ হিন্দু জাগরণ মঞ্চের নাম ও ভারতের হিন্দু জাগরণ মঞ্চের সাংগঠনিক নামের সাদৃশ্য এবং ২০২৪ সালে সংগঠনটির নেতাদের ভারত সফরের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
প্রবন্ধকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও প্রবণতাকেও আলোচনায় আনেন। ছায়ানট, বিশ্বভারতী অ্যালামনাই এবং ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে ভারতীয় প্রভাব বৃদ্ধির প্রশ্ন তোলা হয়। তবে বক্তারা একই সাথে বলেন, সাংস্কৃতিক যোগাযোগ, রবীন্দ্রচর্চা বা ভারতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্ককে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক প্রকল্পের সাথে একাকার না করে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
আলোচনায় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্ব পায়। বক্তারা বলেন, কোনো বিদেশী রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, মতাদর্শিক নেটওয়ার্ক বা ধর্মীয় সংগঠন যদি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে, তবে তার প্রকৃতি ও ব্যাপ্তি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সাথে দেশের হিন্দু নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও সম-অধিকার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
মূল প্রবন্ধের শেষাংশে হিন্দুত্ববাদী তৎপরতা পর্যবেক্ষণের জন্য স্থায়ী গবেষণা ও ওয়াচডগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, বিভিন্ন সংগঠনের অর্থের উৎস ও আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ অনুসন্ধান, আইনগত অভিযোগের তদন্ত, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে সব নাগরিকের অধিকার সুরক্ষা এবং বিদেশী হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ- দুই বিষয়কেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সামগ্রিক অবিশ্বাস তৈরি না করে নির্দিষ্ট ব্যক্তি, সংগঠন, অর্থায়ন, বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে অভিযোগ যাচাই করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। আলোচনায় এও মত দেয়া হয়, হিন্দুত্ববাদ নিয়ে বিতর্ককে কেবল মুসলিম-হিন্দু দ্বন্দ্বের কাঠামোয় সীমাবদ্ধ না রেখে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং পররাষ্ট্রনীতির বৃহত্তর কাঠামোয় দেখা প্রয়োজন।