নিজস্ব প্রতিবেদক

চলতি সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ডেঙ্গু রোগে মৃত্যু গত ৮ মাসের মৃত্যুকে ছাড়িয়ে গেছে। নতুন রোগী ভর্তি ও আজ শনিবারই ছাড়িয়ে যেতে পারে সেপ্টেম্বরের বিগত দিনগুলোতে। গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সেপ্টেম্বরের দিনগুলোতে দেশে ১১৪ জন ডেঙ্গু রোগে মারা গেছে, একই সময়ের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৪ হাজার ২৫৮ জন। এর বাইরেও যারা ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেয়নি তাদের পরিসংখ্যান এখানে নেই। বিপরীতে চলতি বছরের গত জানুয়ারি থেকে আগস্টের শেষ দিন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে সারা দেশে মৃত্যু হয়েছে ৯৭ জন এবং গত ৮ মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৩৫ হাজার ৮৪৬ জন। 
সেপ্টেম্বর মাসকে ডেঙ্গু রোগের জন্য ‘পিক মান্থ’ বলা হয়। এ মাসে বৃষ্টির ধরন অন্যান্য মাসের চেয়ে আলাদা ছিল। এ মাসে যেমন বৃষ্টি হয়েছে তেমনি ডেঙ্গু জীবাণুবাহী এডিস মশার ডিম ছাড়ার জন্য আদর্শ পরিবেশ ছিল অন্যান্য মাসের চেয়ে। কিটতত্ত্ববিদরা বলছেন, ডেঙ্গু জীবাণুবাহী এডিস মশার জন্য ২৮ থেকে ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসযুক্ত গরম পরিবেশ প্রয়োজন হয়। সে সাথে নির্দিষ্ট মাত্রায় বাতাসের আর্দ্রতা প্রয়োজন, যা সেপ্টেম্বর মাসের পরিবেশে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। 
 ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসেই বেশি মৃত্যু হয় কেন এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, রোগী বেশি হলে মৃত্যুও সে তুলনায় বেশিই হতে পারে। তবে যাদের ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় তাদের বেশির ভাগেরই মাল্টি অর্গান ফেইলিউরের কারণে। এদের বেশির ভাগই হাসপাতালেই আসেন দেরি করে। আবার আমাদের কাছে আসার আগে অনেকেই অপচিকিৎসার শিকার হন। শেষ সময়ে আমাদের কাছে আসেন। ডা. সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, এ সময়ে জ্বর হলেই ডেঙ্গু পরীক্ষা করা উচিত। আর ডেঙ্গু হলে অবশ্যই হাসপাতালে আসতে হবে অথবা মেডিসিনের ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। বাংলাদেশের সর্বত্র সব চিকিৎসকের কাছে ডেঙ্গু চিকিৎসার গাইডলাইন পেঁৗঁছে দেয়া হয়েছে। তারা সে গাইডলাইন অনুসারে চিকিৎসা পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ডাক্তারের কাছে না এসে যারা ঘরে বসে থাকেন তারাই বেশি ভোগেন। তিনি জানান, ডেঙ্গুতে জ্বর সেরে যাওয়ার পরের সময়টা বিপজ্জনক হতে পারে। সে কারণে, জ্বর সেরে গেছে মানে ডেঙ্গু ভালো হয়ে গেছে সেরকমটি ভাবা যাবে না। ডাক্তারের পরামর্শ মতে পরীক্ষা করিয়েই নিশ্চিত হতে হবে।
এ দিকে গতকাল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত এর আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে যে দু’জন ডেঙ্গুতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে তাদের দু’জনই ঢাকার দুই হাসপাতালে মারা গেছে। ২৪ ঘণ্টায় যে ৯৫৫ জন ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তাদের মধ্যে ৪৫০ জনই ঢাকার সিটি করপোরেশনসহ ঢাকা বিভাগের অন্যান্য হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বাকিদের মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে ২৪৬ জন, খুলনা বিভাগে ১৩০ জন, বরিশাল বিভাগে ৪৪ জন, রংপুর বিভাগে ৪৪ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৩৭ জন এবং সিলেট বিভাগে চারজন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। রাজশাহী বিভাগের কোনো তথ্য স্বাস্থ্য অধিদফতর গতকাল দিতে পারেনি। 
গতকাল পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে ৬৪ হাজার ৮২৭ জন হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন। বাকিরা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এখনো চিকিৎসাধীন আছেন। ডেঙ্গুতে মৃতদের মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের হাসপাতালে মারা গেছেন ৬৫ জন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের হাসপাতালে মারা গেছে ২৬ জন এবং ঢাকা বিভাগের অন্যান্য হাসপাতালে মারা গেছে ১১ জন। ঢাকা বিভাগের বাইরে বরিশাল বিভাগে ১৬ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২১ জন, খুলনা বিভাগে ৩৭ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ২০ জন, রাজশাহীতে ১০ জন, রংপুর বিভাগে চারজন এবং সিলেট বিভাগে একজন মারা গেছে ডেঙ্গুতে।  
সাভারে ডেঙ্গুতে ব্যবসায়ীর মৃত্যু
সাভার (ঢাকা) সংবাদদাতা জানান, সাভার পৌর এলাকার ডগরমোড়ায় গতকাল শুক্রবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এক ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়েছে। তার নাম মামুনুর রহমান (৩৩)। তিনি ডগরমোড়ার মরহুম ইঞ্জিনিয়ার হযরত আলীর বাসায় ভাড়া থেকে বাসার নিচে মুদি ও মনিহারি ব্যবসা করতেন। 
স্থানীয় সূত্রে জানা যায় গত ৪-৫ দিন আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তাকে প্রথমে এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে ভর্তি করালে সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। বিকেলে স্থানীয় মসজিদে নামাজে জানাজা শেষে তার গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা নিয়ে যাওয়া হয়। নিহত মামুনুর রহমান স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে রেখে গেছেন। 
ডগরমোড়া সমাজকল্যাণ সমিতির সভাপতি হাসান মাহমুদ মাস্টার নয়া দিগন্ত জানান সাভারে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েই চলছে। গত ১৫ দিনে শুধু সাভার পৌর এলাকার ডগরমোড়া মহল্লায় সাত-আটজনের মৃত্যু  হয়েছে।