সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু
আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে বাংলাদেশের প্রবেশ, সার্বভৌম বন্ড ইস্যু এবং পুঁজিবাজার সংস্কারের জন্য হংকংভিত্তিক একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে ৭ লাখ মার্কিন ডলারে নিয়োগ দিতে যাচ্ছে সরকার। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ ৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা (১ ডলার=১২৪ টাকা হিসেবে)। এ জন্য প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের পরিবর্তে সিঙ্গেল সোর্স সিলেকশন (এসএসএস) পদ্ধতি অনুসরণের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে সরাসরি একটি প্রতিষ্ঠানকে বেছে নেয়ার যৌক্তিকতা এবং বিপুল অঙ্কের পরামর্শক ফি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বন্ড ইস্যু শেষ পর্যন্ত সফল না হলে কিংবা প্রত্যাশিত বিনিয়োগ না এলে সাত লাখ ডলারের পরামর্শক ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে প্রতিষ্ঠানটির পূর্ববর্তী কাজ, সংশ্লিষ্ট বাজারে সাফল্যের রেকর্ড, প্রস্তাবিত কাজের সুনির্দিষ্ট পরিধি এবং প্রত্যাশিত ফলাফল যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান সরকার সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনাকে দক্ষ, ব্যয়-সাশ্রয়ী ও টেকসই করার পাশাপাশি মধ্যমেয়াদে ঋণের ঝুঁকি গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে রাখার লক্ষ্যে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। একই সাথে ঋণনির্ভর অর্থায়ন থেকে বেরিয়ে ইক্যুইটিভিত্তিক বিনিয়োগ ও বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য নেয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে করপোরেট বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, গ্রিন বন্ড, সুকুক ও পৌর বন্ডসহ দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে মার্কিন ডলারভিত্তিক ইউরো বন্ড, জাপানি মুদ্রায় সামুরাই বন্ড এবং চীনা মুদ্রায় পান্ডা বন্ড ইস্যুর সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করছে সরকার।
এ লক্ষ্যে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি পুঁজিবাজার সংস্কার, সার্বভৌম বন্ড ইস্যু, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন ও বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের মতো বিষয় পর্যালোচনা করছে। কমিটির কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক মানের বিশেষায়িত পরামর্শক সেবা নিতে অর্থ বিভাগ ও হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ব্রিজউড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ এর মধ্যে একটি খসড়া চুক্তি প্রস্তুত করা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ব্রিজউড ইন্টারন্যাশনাল কৌশলগত ও আর্থিক পরামর্শ দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি পুঁজিবাজার, সার্বভৌম বন্ড, বিনিয়োগ তহবিল, টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি অবকাঠামো এবং বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে পরামর্শ দেয়ার প্রস্তাব করেছে। এসব সেবার বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটিকে মোট সাত লাখ মার্কিন ডলার দিতে হবে। চারটি কিস্তিতে প্রতিবার এক লাখ ৭৫ হাজার ডলার করে এই অর্থ পরিশোধের কথা রয়েছে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে। অর্থ বিভাগ থেকে বলা হয়েছে, সরকারি ক্রয় বিধিমালা, ২০২৫-এর বিধি ১২৫-এর (ঘ)(২) অনুসরণ করে ‘সিঙ্গেল সোর্স সিলেকশন’ পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়োগ করা যেতে পারে। অর্থাৎ অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে প্রতিযোগিতামূলকভাবে দর যাচাই না করেই নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
এই প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেয়ার পক্ষে যুক্তি হিসেবে ব্রিজউড ইন্টারন্যাশনালের বিশেষায়িত কারিগরি দক্ষতা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং নির্দিষ্ট পরামর্শক সেবা দেয়ার সক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সাত লাখ ডলারের মতো বড় অঙ্কের ব্যয়ের ক্ষেত্রে বাজার যাচাই, বিকল্প প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব এবং একই ধরনের সেবার আন্তর্জাতিক মূল্য তুলনা করা হয়েছে কি না সে বিষয়ে অর্থ বিভাগ থেকে কিছু বলা হয়নি বলে সূত্র জানায়।
চুক্তিতে দুই পক্ষের গোপনীয় তথ্য সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আইনগত বাধ্যবাধকতা বা অপর পক্ষের লিখিত সম্মতি ছাড়া তথ্য প্রকাশ করা যাবে না এবং চুক্তি শেষ হওয়ার পরও পাঁচ বছর পর্যন্ত এ গোপনীয়তা বজায় থাকবে। আবার যেকোনো পক্ষ ৯০ দিনের লিখিত নোটিশে চুক্তি বাতিল করতে পারবে। গুরুতর চুক্তিভঙ্গের ক্ষেত্রে সরকার তাৎক্ষণিকভাবে চুক্তি বাতিল করতে পারলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সংশোধনের সুযোগ দেয়ার বিধান রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে প্রবেশের আগে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা, দেশের ক্রেডিট রেটিং, ঋণের সক্ষমতা ও বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণে আন্তর্জাতিক পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু পরামর্শকের পেছনে ব্যয় করা অর্থের বিনিময়ে কী নির্দিষ্ট ফলাফল পাওয়া যাবে, তা চুক্তিতে পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। কারণ আন্তর্জাতিক বন্ড ইস্যু শেষ পর্যন্ত সফল না হলে কিংবা প্রত্যাশিত বিনিয়োগ না এলে সাত লাখ ডলারের পরামর্শক ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে প্রতিষ্ঠানটির পূর্ববর্তী কাজ, সংশ্লিষ্ট বাজারে সাফল্যের রেকর্ড, প্রস্তাবিত কাজের সুনির্দিষ্ট পরিধি এবং প্রত্যাশিত ফলাফল যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থ বিভাগ সূত্র এ বিষয়ে জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া গেলে বিষয়টি অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপন করা হবে। এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে বাংলাদেশের প্রবেশের প্রস্তুতিতে এই সাত লাখ ডলারের পরামর্শ কতটা বাস্তব ফল বয়ে আনে এবং একক উৎস থেকে প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত কতটা স্বচ্ছ ও অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক প্রমাণিত হয়।





