ফজলে রাব্বি পরশ রাবি প্রতিনিধি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীদের আবাসন সঙ্কট নিরসনে নেয়া অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সাড়ে পাঁচ বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘ ১০ বছরেও তা সম্পন্ন হয়নি। ফলে আবাসন সঙ্কটের সমাধান না হওয়ায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের মেসগুলোতে ভাড়া থেকে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। প্রকল্পের কাজে ধীরগতি, প্রাক্কলন ও নকশার ত্রুটি এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেতে দীর্ঘসূত্রতা- এসবই দীর্ঘসূত্রতার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা। জানা যায়, তিন দফা মেয়াদ বাড়িয়ে প্রকল্পের সময়সীমা সর্বশেষ ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দফতর সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে ৩৬৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়। এর আওতায় অপরাজিতা হল, বিজয়-৭১ হল, ১০ তলা শিক্ষক কোয়ার্টার, ২০ তলা অ্যাকাডেমিক ভবন, ড্রেন ও শেখ রাসেল মডেল স্কুলসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়। পরে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধিসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় বিবেচনায় ২০১৯ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ৫১০ কোটি ৯৯ লাখ টাকার সংশোধিত প্রকল্পটি অনুমোদন করে।
এ প্রকল্পের কাজ ২০২২ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। তবে করোনা মহামারীসহ নানা কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। প্রথম দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর এবং দ্বিতীয় দফায় ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। এরপরও কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় তৃতীয় দফায় আরো এক বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার ভারপ্রাপ্ত পরিচালক প্রকৌশলী এস এম ওবায়দুল ইসলাম জানান, নতুন মেয়াদ অনুযায়ী ২০২৭ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় শেখ রাসেল মডেল স্কুল ও কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনের সংস্কারকাজ শেষ হয়েছে। আবাসিক হল, অ্যাকাডেমিক ভবন ও শিক্ষক কোয়ার্টারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর কাজ এখনো বাকি আছে।
বিজয়-৭১ হল : বিজয়-৭১ আবাসিক হলের প্রায় ৯৬ শতাংশ নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকৌশলী এস এম ওবায়দুল ইসলাম। তিনি বলেন, হলটির সামান্য কিছু কাজ বাকি রয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন না পাওয়ায় সেগুলো সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। হলটিতে একটি পাম্প স্থাপন প্রয়োজন হলেও তা মূল প্রাক্কলনে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এ কারণে নকশা ও প্রাক্কলনে পরিবর্তনের অনুমোদন নিতে হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এ বছর ডিসেম্বরের মধ্যে হলটি বুঝিয়ে দেয়া সম্ভব হবে।
অপরাজিতা হল : ছাত্রীদের জন্য নির্মাণাধীন ১০ তলা অপরাজিতা হলের (শেখ হাসিনা হল) কাজ পেয়েছে দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার অ্যাসোসিয়েট লিমিটেড। হলটির নির্মাণকাজ প্রায় ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকৌশলী ওবায়দুল ইসলাম জানান, ভবনটির ৯ তলা পর্যন্ত নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। তবে ফিনিশিংসহ বেশ কিছু কাজ বাকি রয়েছে। বর্ধিত মেয়াদের মধ্যে কাজ শেষ করার আশা প্রকাশ করেন তিনি।
শিক্ষক কোয়ার্টার : বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ তলা শিক্ষক কোয়ার্টারের নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে প্রথম দফার পরীক্ষায় প্রশ্ন ওঠায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মাধ্যমে আরো দুই দফা পরীক্ষা করা হয়। সর্বশেষ পরীক্ষায় নির্মাণসামগ্রীর শক্তিমাত্রা নির্ধারিত মানের মধ্যে পাওয়ায় ফের কাজ শুরু হয়। বর্তমানে ভবনটির প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ১০ তলা পর্যন্ত ছাদ নির্মাণ শেষ হয়েছে।
২০ তলা অ্যাকাডেমিক ভবন : প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন ২০ তলা অ্যাকাডেমিক ভবনের নির্মাণকাজ সবচেয়ে ধীরগতিতে এগুচ্ছে। ভবনটির মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। সরেজমিন দেখা যায়, ১৬ তলা পর্যন্ত ছাদ নির্মাণ করা হয়েছে এবং ১৭ তলার কলাম পর্যন্ত কাজ হয়েছে।
প্রকৌশলী ওবায়দুল ইসলাম বলেন, মূল প্রাক্কলনে নির্ধারিত রড দিয়ে ১৭ তলা পর্যন্ত কাজ করা সম্ভব হয়েছে। তবে পরবর্তী তিন তলার জন্য প্রয়োজনীয় রডের পরিমাণ প্রাক্কলনে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। অতিরিক্ত রডের অনুমোদন না পাওয়ায় কয়েক মাস ধরে ভবনটির মূল নির্মাণকাজ প্রায় বন্ধ রয়েছে।
প্রাক্কলন ও নকশার ত্রুটি : প্রকৌশলী ওবায়দুল ইসলাম বলেন, আগের সময়ে নেয়া প্রকল্পগুলোর প্রাক্কলন ও নকশায় কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল। বিশেষ করে আবাসিক হলগুলোর কাজের পরিমাণ নির্ধারণের তালিকা (বিওকিউ) তৈরির সময় প্রয়োজনীয় কিছু উপকরণ ও কাজ বাদ পড়ে যায়। পরে সেগুলো যুক্ত করতে ও অনুমোদন নিতে কিছুটা সময় লেগেছে।
তিনি বলেন, কাজ শুরুর পর কোনো ঘাটতি বা পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিলে তা সংযোজন-বিয়োজনের জন্য অনুমোদন নিতে হয়। ২০ তলা ভবনের ক্ষেত্রেও পরামর্শকের তৈরি বিওকিউ সম্পূর্ণ কাজের জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত উপকরণের অনুমোদন না পাওয়ায় নির্মাণকাজ ব্যাহত হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ : সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো: ফরিদুল ইসলাম বলেন, চলমান প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করতে মন্ত্রণালয়ের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে। মেয়াদ বৃদ্ধি, ভেরিয়েশন ও প্রাক্কলনে প্রয়োজনীয় অর্থের ঘাটতিসহ বিভিন্ন জটিলতা রয়েছে। এসব সমাধানে কাজ চলছে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কয়েক দফা প্রকল্প এলাকায় নিয়ে গিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি দেখানো হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পগুলো শেষ না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ও আবাসনসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান হবে না। প্রকল্পের মেয়াদ আরো এক বছর বাড়ানো হয়েছে। এটিই শেষবারের মতো সময় বাড়ানো। বর্ধিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।





