আবদুল কাদের তাপাদার, সিলেট
পেট্রোবাংলার বৃহৎ কোম্পানি সিলেট গ্যাস ফিল্ড লিমিটেডের (এসজিএফএল) সিলেট-১০ নম্বর কূপ। এসজিএফএলের সদর দফতরের অনতিদূরে গোয়াইনঘাট উপজেলার বাঘের সড়ক এলাকায় অবস্থান অনুসন্ধানমূলক এই গ্যাস কূপের।
২ দফায় ২০২ কোটি টাকা থেকে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ৫১৭ কোটি টাকা । সেই টাকা থেকে ৪৮০ কোটি টাকা খরচ করেও এই কূপে মেলেনি গ্যাস। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতায় বিপুল অর্থ গচ্চা গেছে রাষ্ট্রের। এতে ব্যয় করে গ্যাস না পাওয়ার জন্য জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতাকে দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতা এবং তত্ত্বাবধানের অভাবে রাষ্ট্রের এই টাকা অপচয় করা হয়েছে। প্রকল্প গ্রহণের আগে সঠিকভাবে ফিজিবিলিটি স্টাডি করা উচিত বলে মত তাদের।
তথ্য বলছে, দেশে গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে ২০২১ সালের ২০ সেপ্টেম্বরে ‘সিলেট-১০ নম্বর কূপ খনন প্রকল্পটির অনুমোদন দেয় তৎকালীন সরকার। এতে খরচ ধরা হয়েছিল ২০২ কোটি টাকারও বেশি। দুই বছর তিন মাসে অর্থাৎ ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে এর কাজ শেষ করতে বলা হয়। কিন্তু এই সময়ে কাজ তেমন কিছু হয়নি। পরে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ থেকে সংশোধন করে খরচ বাড়িয়ে দ্বিগুণের বেশি ৫১৭ কোটি টাকা নির্ধারণ করে। একই সাথে সময়ও বাড়ানো হয় দেড় বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত। তাতেও কাজ শেষ হয়নি। আবার সময় বাড়ানো হয় এক বছর। যার মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ৩০ জুন।
দুই বছর ৩ মাসের জায়গায় চার বছর ৯ মাস সময় গেছে। তারপরও গ্যাসের উচ্চচাপের কারণে নির্ধারিত তিন হাজার ৩০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত কূপ খনন করেনি চীনা কোম্পানি সিনোপ্যাক ইন্টারন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম সার্ভিস করপোরেশন।
নির্ধারিত তিন হাজার ৩০০ মিটার গভীরতায় খনন করা হয়নি। এতে গ্যাসের চাপ কমে যায়। এই কূপ থেকে পানি এবং বালি আসায় এই গ্যাস কূপ থেকে উৎপাদন বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রকল্পটিতে খরচ হয়েছে ৪৮০ কোটি টাকা।
সূত্র জানায়, গত ২১ জুন প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কিছু ব্যাপারে আপত্তি করে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পাঠাতে বলা হয়। তা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ৬ জুলাই এর অনুমোদন দেন। তবে নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অবহিত করার জন্য গত ১৬ সেপ্টেম্বর উপস্থাপন করা হয়।
তথ্য মতে, সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার আলীগাঁও ইউনিয়নের বাঘের সড়ক এলাকায় প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর কূপটির খননকাজের উদ্বোধন করা হয়। কূপটির বিভিন্ন স্তরে (৪টি স্তরে) গ্যাসের সন্ধান পাওয়া যায়। এর মধ্যে ২৫৪০-২৫৭৫ মিটার গভীরে টেস্টে প্রায় ২৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যায়। এই কাজটির দায়িত্ব দেয়া হয় চীনা কোম্পানি সিনোপ্যাককে।
২০১৮ সালের এসএলবির প্রতিবেদনে তিন হাজার ৩০০ মিটার গভীরতায় খননের প্রস্তাব করা হয়। যাতে উল্লেখযোগ্য গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়।
প্রকল্পের প্রধান প্রধান কাজ ধরা হয়-৮ দশমিক ৪৮ একর ভূমি অধিগ্রহণ, সিলেট-১০ এবং সিলেট-১০ এক্স নং কূপ খনন, গ্যাস গ্যাদারিং পাইপলাইন নির্মাণ। এ ছাড়া সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় বিদেশী পরামর্শক নিয়োগ। প্রকল্পটির কাজও শুরু হয়েছিল। ২০২৩ সালে সিলেট গ্যাসফিল্ডের ১০ নম্বর কূপ খনন করে বিপুল গ্যাসের মজুদও পাওয়া যায় বলে জানানো হয়। এই কূপ থেকে প্রতিদিন ১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলেও জানানো হয়েছিল। এই কূপে গ্যাসের হাইপ্রেশার ছিল প্রায় তিন হাজার ৪০০ পিএসআই।
চীনের সিনোপেক ইন্টারন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম সার্ভিস করপোরেশন ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কূপটির কমপ্লিশন কাজ শেষ করে। এরপর কূপ থেকে হরিপুর গ্যাসক্ষেত্রের প্রসেস প্ল্যান্ট পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৪ ইঞ্চি ব্যাসের উচ্চচাপ গ্যাস গ্যাদারিং পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়। সিনোপ্যাক দুই হাজার ৫৭৬ মিটার পর্যন্ত খনন করে।
পাইপলাইন নির্মাণ শেষে ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল কূপটি থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। পরে এ কূপ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পানি ও বালু উঠতে শুরু করে। একই সাথে কূপমুখের চাপও কমে যায়। এ অবস্থায় ২০২৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি কূপটির গ্যাস উৎপাদন বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী আব্দুল কাদের ভূঁইয়া বলেন, মূলত উচ্চচাপের কারণেই আর নিচে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এখানে মাটির নিচে যেসব কাজ করতে টাকা খরচ হয়েছে সেটি কোনো কাজে আসবে না। তবে পাইপসহ অন্য যা আছে তা সিলেট-১০ এক্স কূপ খননে কাজে লাগানো যাবে। কাজেই টাকা যে কাজে লাগেনি তা না।





