এস এম মিন্টু
শত কোটি টাকা মূল্যের জমিটিতে প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে চলছে গরিবের চিকিৎসাসেবা। ২০০৬ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের সময়েই জমিটির দিকে চোখ পড়ে একটি প্রভাবশালী মহলের। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর দুষ্টচক্রের টার্গেটে পড়ে গরিবের স্বাস্থসেবা প্রতিষ্ঠান মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি নির্বাচিত হন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। দলীয় প্রভাব ও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরই শুরু হয় এই স্বাস্থকেন্দ্রটি দখলের ছক। আর ছক কষার বেশিদিন না যেতেই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি রাতারাতি ভেঙে ধ্বংস্তূপে পরিণত করে নিজেদের দখলে নেয়া হয়। এ ঘটনার মূল নেতৃত্বে যিনি ছিলেন তিনি হলেন এমপি মিষ্টির ঘনিষ্ঠ সহযোগী রাজধানীর শাহ আলী থানা বিএনপির সাবেক সদস্য মো: হানিফ মিয়া। হানিফের মাধ্যমেই স্থানীয় সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ভাড়া করে রাতারাতি অর্ধশত বছরের স্বাস্থসেবা কেন্দ্রটি ভেঙে ফেলা হয়। এ ঘটনায় ১২ জনকে গ্রেফতার করতে পারলেও মূল হোতা হানিফকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। গতকাল স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, মিষ্টির প্রভাবে সবসময় ভয়ে থাকে এলাকার মানুষ। এক দিকে দলীয় প্রভাব অন্য দিকে সংরক্ষিত নারী এমপি। এমন অবস্থায় এখন মিরপুরসহ সারা দেশেই আলোচনায় শীর্ষে মিষ্টির নাম।
গতকাল কয়েকজন এলাকাবাসী জানান, মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপিতে হামলার ঘটনা যে দিন ঘটে সে দিন রাতের অন্ধকারে দেড় থেকে দু’শতাধিক লোক নিয়ে লুটপাট ও ভাঙচুর করে দখলের জন্য একটি সমবায় সমিতির নামে সাইনবোর্ড দেয়া হয়। ঘটনার সময় পাশেই পুলিশের অবস্থান এবং ছিল রাজনৈতিকভাবে নির্দেশদাতারাও।
এ ঘটনায় চার দিন পার হয়ে গেলেও কয়েকজন ভাড়াটে যুবকদের (জড়িত অভিযোগে) আটক করা হলেও ঘটনার পেছনের নির্দেশদাতা বা মূল পরিকল্পনাকারীরা আড়ালেই থেকে গেছে। তবুও জনকল্যাণমূলক এই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। গতকালও তৃতীয় দিনের মতো ধ্বংসস্তূপের সামনে খোলা আকাশের নিচে চালিয়েছেন তাদের চিকিৎসাসেবা। সেবাগ্রহীতাদের চোখে-মুখে আন্দন্দ থাকলেও ধ্বংসস্তূপ দেখে আতঙ্কের ছাপও চোখে পড়ে।
জানা যায়, ১৯৭৪ সালে সুইডিশ সেভ দ্য চিলড্রেনের রাড্ডা বার্নেনের উদ্যোগে যাত্রা শুরু হয় রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ দিন ধরে মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, প্রজনন সেবা, পরিবার পরিকল্পনা, টিকাদানসহ নানা কমিউনিটি স্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। বর্তমানে মিরপুর-১০-এর প্রধান কেন্দ্রের পাশাপাশি মিরপুর ১, বাউনিয়াবাঁধ, উত্তরা, ভাসানটেক বস্তি ও পুরান ঢাকায় এর সেবা বিস্তৃত এবং তিনটি স্থায়ী ক্লিনিকে প্যাথলজি ও হেমাটোলজি-সহ বিভিন্ন পরীক্ষার আধুনিক সুবিধা রয়েছে।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দেশের খ্যাতনামা ব্যক্তিরা এ সংস্থাটির পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত ছিলেন। প্রখ্যাত গাইনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক টি এ চৌধুরী, প্রকৌশলী অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী ও সাবেক উপদেষ্টা কাজী ফজলুর রহমানের মতো গুণীজনরা এর ট্রাস্টি বোর্ডে ছিলেন। বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন, র্যামন ম্যাগসাইসাই বিজয়ী প্রথম বাংলাদেশি নারী তাহরুন্নেসা আবদুল্লাহ কোষাধ্যক্ষ এবং সাবেক সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী, আবদুল করিমসহ বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এ এস এম কাশেম ও এ কে আজাদ এর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এ দিকে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় হামলাকারীদের জড়ো করা, দেশীয় অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ এবং এক্সাভেটর আনার সাথে যুক্ত স্থানীয় কয়েকজনের ব্যাপারে তথ্য পাওয়া গেছে, যারা সেখানকার বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত। শাহআলী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো: রাজীব হোসেন জানান, এ ঘটনায় সোমবার বিকেল পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রধান ও একমাত্র আসামি হানিফকে গ্রেফতারের চেষ্ট অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি এসআরবি, ডিবিসহ বিভিন্ন ইউনিট কাজ করছে।
গরিবের হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত : মিরপুর-১ সহ আশপাশের এলাকাবাসীর কাছে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি ছিল গরিবের হাসপাতাল নামে পরিচিত। গত রোববার ডাক্তারদের সাথে পরামর্শ নিতে এসেছিলেন মনোয়ারা বেগম। তখন ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে আসা মানুষের ভিড় দেখে তিনি ফিরে যাচ্ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের মতো গরিব মানুষ এখন কোথায় যাবে? এটা আমাদের গরিবের হাসপাতাল ছিল, তাও ভেঙে দিয়েছে।’ মিরপুর-১ নম্বরের বাসিন্দা রুহি আক্তার ছয় মাস বয়সী শিশুকে নিয়ে টিকা দিতে এসেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ঘটনার পর ভেবেছিলাম টিকাদান ক্যাম্পেইন চলবে না; কিন্তু এসে দেখলাম রোদে টেবিল-চেয়ার পেতে টিকা দেয়া হচ্ছে। এতে আমাদের কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে তারা পরিস্থিতির মধ্যেও ক্যাম্পেইন চালিয়ে যাচ্ছে, এটা খুবই ভালো।’ আরেক শিশুর অভিভাবক হাফসা বেগম বলেন, ‘আমরা বেশির ভাগ সময় এখানেই চিকিৎসা নিতে আসি। এখানে খরচ কম এবং তারা দায়িত্ব নিয়ে রোগীদের সেবা দেয়।’ এখানে সেবা নিতে আসা রোগীরা সরকারের কাছে অনুরোধ জানান, সরকার যাতে সেবা ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেয়। সেবাগুলো যাতে পুনরায় চালুর ব্যবস্থা করে।
টার্গেট করা হয়েছিল দেড় যুগ আগে : রাড্ডার কর্মকর্তা, স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০০৪ সালে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি ক্লিনিকের জমি দখলের চেষ্টা শুরু হয়। তৎকালীন সময়ে সরকার ক্ষমতায় ছিল বিএনপি। ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে সমিতি তৈরি করেন। ওই সময় সমিতির নামে সরকারিভাবে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি ক্লিনিকের জমি ইজারা নেয়ার চেষ্টা করেন। তখন ওই সমিতির সভাপতি ছিলেন বর্তমান সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। ২০০৬ সালে গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদফতর থেকে রাড্ডার জমিটি সমিতিকে বরাদ্দ দেয়ার কথা উল্লেখ করা হলেও তেমন কোনো কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। এরপর প্রায় দেড় যুগ পার হয়ে যায় রাড্ডার জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড। ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে রাড্ডার জমিটি ফের দখলের পাঁয়তারা শুরু হয়। ২০২৬-এ বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার শুরু থেকেই রাড্ডার জমি দখলের পাঁয়তারা শুরু হয় বলে স্থানীয়রা জনান।
তদন্তে উঠে আসছে রাঘববোয়ালদের নাম : তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেয়ার কাজে বড় বড় রাঘববোয়ালের নাম আসতে শুরু করছে। বিশেষ করে এসেছে সংসদ সদস্য মিষ্টির নাম। তিনি শুধু সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির সংসদ সদস্যই নন, বর্তমানে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্বেও রয়েছেন। ভাঙচুরের ঘটনায় মামলার প্রধান ও একমাত্র নামধারী আসামি শাহ আলী থানা বিএনপির সাবেক সদস্য মো: হানিফ মিয়াও মিষ্টির অনুসারী।
তবে বিভিন্ন গণ্যমাধ্যমে মিষ্টি বলছেন, হানিফ এখন আর তার সাথে রাজনীতি করেন না। সমিতির নথিপত্রে নিজের পুরনো স্বাক্ষর ও সভাপতি পদের প্রমাণ থাকলেও মিষ্টি রাড্ডাকাণ্ডের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তা অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করছেন, রাজনৈতিক কোন্দল ও গ্রুপিংয়ের কারণে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার নাম জড়ানো হচ্ছে এবং হামলার বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না।
আসকের নিন্দা ও উদ্বেগ : গতকাল এক বিবৃতিতে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে আসক। সংস্থাটি বলেছে, হামলা ও ধ্বংসের সাথে সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের পাশাপাশি এর পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা ও পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা স্বাধীনভাবে তদন্ত করে দায় নির্ধারণ করতে হবে। আসকের মতে, মিরপুরের ঘটনাটি শুধু একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংসের বিষয় নয়; এটি আইনের শাসন, নাগরিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের জবাবদিহির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি দৃশ্যমান জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।





