শাহ আলম নূর
নীতি সুদহার কমেছে, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য আছে, সরকারি ঋণও বাড়ছে- তবু বেসরকারি খাতে ঋণের চাকা ঘুরছে না। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। ব্যাংকে অর্থ আছে, কিন্তু উদ্যোক্তার হাতে নতুন ঋণের চাহিদা নেই। আবার যারা ঋণ চাইছেন, তাদের বড় একটি অংশ ব্যাংকের কঠোর যাচাই, উচ্চ কার্যকর সুদহার, জামানত এবং খেলাপি ঋণের ঝুঁকির কারণে অর্থায়ন পাচ্ছেন না। এমন পরিস্থিতিতে ‘ঋণ নেই’ এমন নয়; বরং ঋণ নেয়ার মতো নিরাপদ বিনিয়োগ নেই, আর ঋণ দেয়ার মতো স্বস্তিও নেই ব্যাংকের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, জুন ২০২৬ শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। ১৯৯৩ সালের পর এটিই সর্বনিম্ন। মে মাসে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ, এপ্রিলে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং মার্চে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। জুলাইয়ে সামান্য বেড়ে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ হলেও তা টানা পঞ্চম মাসে ৫ শতাংশের নিচে ছিল। অথচ ডিসেম্বর ২০২৬-এর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ। অর্থাৎ লক্ষ্যের চেয়ে ঋণপ্রবাহ এখনো ২ শতাংশীয় পয়েন্টের বেশি পিছিয়ে।
এ দিকে শুধু প্রবৃদ্ধির হার নয়, টাকার অঙ্কেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। জুন শেষে বেসরকারি খাতের ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা। এক বছরে স্থিতি বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু আগের অর্থবছরের তুলনায় নতুন ঋণ বৃদ্ধির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ৭৮ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা; আগের অর্থবছরে বেড়েছিল এক লাখ ৬ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকা।
এমন অবস্থায় গত ২ আগস্ট থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক রেপো বা নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করেছে। স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি নামানো হয়েছে ১১ শতাংশে। কিন্তু ২৩ সেপ্টেম্বরের মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠকে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশই বহাল রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি এখনো লক্ষ্যমাত্রার ওপরে এবং আন্তর্জাতিক ও দেশীয় নানা ধাক্কার প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে আপাতত নীতি সুদে নতুন পরিবর্তন না করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নীতি সুদ ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে নামার পরও ব্যবসায়ীরা ঋণ নিচ্ছেন না কেন। এমন প্রশ্নের জবাবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই সামনে আসে ঋণের প্রকৃত খরচ। নীতি সুদহার আর উদ্যোক্তার হাতে পাওয়া ঋণের সুদ এক জিনিস নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ২০২৬-এ ব্যাংকগুলোর ভারিত গড় ঋণ সুদহার ছিল প্রায় ১১ দশমিক ৮১ শতাংশ। অর্থাৎ নীতি সুদ ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে নামলেও ব্যবসায়ীকে বাস্তবে ঋণ নিতে হচ্ছে তার চেয়ে উল্লেখযোগ্য বেশি সুদে।
এ দিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সমস্যাটি আরো গভীর। বাংলাদেশ ব্যাংকের জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬-এর সিএমএমএমই অর্থায়ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, মার্চ শেষে এ খাতে মোট ঋণস্থিতি নেমে এসেছে দুই লাখ ৯৮ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকায়। ডিসেম্বরের তুলনায় এটি ৫ দশমিক ১৫ শতাংশ কম। মোট ব্যাংকঋণে সিএমএসএমই খাতের অংশ মাত্র ১৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ, যেখানে ২০২৬ সালের লক্ষ্যমাত্রা ২৫ দশমিক ৫০ শতাংশ।
অর্থাৎ যে খাতকে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেই ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারাই ব্যাংকঋণের মূল স্রোত থেকে পিছিয়ে পড়ছেন। এদিকে আরো বড় বিপদ লুকিয়ে আছে ঋণের মানে। মার্চ ২০২৬ শেষে সিএমএসএমই ঋণের ২৬ দশমিক ০৪ শতাংশই শ্রেণীকৃত বা খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। ডিসেম্বর ২০২৫-এ এ হার ছিল ২৪ দশমিক ০৩ শতাংশ। মাত্র তিন মাসে শ্রেণীকৃত ঋণের অনুপাত বেড়েছে ২ দশমিক ০১ শতাংশীয় পয়েন্ট। এতে ব্যাংকারদের কাছে এই খাতের নতুন ঋণ এখন বাড়তি ঝুঁকির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, স্থানীয় জ্বালানি পরিস্থিতি ও নতুন বিনিয়োগের ঘাটতির কারণে ঋণপ্রবৃদ্ধি ধীর হয়েছে। সরকারি উন্নয়ন কর্মসূচি ও নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে অর্থনীতি গতি পেলে ঋণের প্রবৃদ্ধিও বাড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানও দুর্বল রফতানি চাহিদা, মানুষের আয় কমে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকে বিনিয়োগ পিছিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, গ্যাস সঙ্কটের কারণে অনেক কারখানা সক্ষমতার নিচে চলছে। ফলে নতুন বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তাও কমছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একজন উদ্যোক্তার কারখানা যদি বর্তমান সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে না পারে, তাহলে নতুন ঋণ নিয়ে নতুন মেশিন কেনার প্রয়োজন কোথায়। বাজারে পণ্যের চাহিদা যদি দুর্বল থাকে, তাহলে উৎপাদন বাড়িয়ে পণ্য বিক্রি করবেন কোথায়। আর উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস-বিদ্যুৎ নিশ্চিত না হলে ব্যাংকঋণ নিয়ে নতুন কারখানা বানিয়ে লাভই বা কতটুকু।
এ দিকে গ্যাসের অপেক্ষায় আটকে আছে বিপুলসংখ্যক শিল্পসংযোগের আবেদন। প্রায় এক হাজার ৮৫৭টি শিল্পসংযোগের আবেদন গ্যাসের অভাবে ঝুলে আছে। এসব প্রকল্পে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বিনিয়োগকারী আছে, প্রকল্প আছে, অর্থায়নের সম্ভাবনাও আছে; কিন্তু উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপকরণ গ্যাসের নিশ্চয়তা নেই। এমন পরিস্থিতিতে নতুন ব্যাংকঋণ নেয়া অনেক উদ্যোক্তার কাছে উল্টো বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ঋণের কিস্তি দিতে হবে এখনই; কিন্তু গ্যাস কবে আসবে, উৎপাদন কবে শুরু হবে, পণ্য কবে বিক্রি হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে সুদের হার কিছুটা কমলেও বিনিয়োগের ঝুঁকি কমছে না।
অন্য দিকে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্যের ঘাটতির বদলে দেখা যাচ্ছে অর্থের বড় একটি অংশ অলস পড়ে থাকার চিত্র। জুন ২০২৬ শেষে ব্যাংকিং ব্যবস্থার আমানত এক বছরে ১০ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেড়ে ২০ লাখ ৭৯ হাজার ৯১১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে বেসরকারি ঋণ বেড়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ টাকা ঢুকছে ব্যাংকে, কিন্তু সেই টাকা বের হচ্ছে না উৎপাদনশীল বেসরকারি বিনিয়োগে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, শুধু সুদের হার কমালেই বেসরকারি ঋণ বাড়বে না। বিনিয়োগকারীর আস্থা, ব্যবসার পরিবেশ এবং বাজারের চাহিদা ফিরিয়ে আনতে হবে। উচ্চ পরিচালন ব্যয় ও দুর্বল ভোক্তা চাহিদা ব্যবসার মুনাফার ওপর চাপ তৈরি করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, সুদের হার কমেছে, কিন্তু ঝুঁকি কমেনি। ব্যাংকে তারল্য আছে, কিন্তু বিনিয়োগের সুযোগ বাড়েনি। ঋণের সরবরাহ আছে, কিন্তু যোগ্য ও আগ্রহী ঋণগ্রহীতা কমেছে। আর যারা ঋণ নিতে চান, তাদের অনেকেই উচ্চ সুদ, জামানত, কাগজপত্র ও ব্যাংকের কঠোর যাচাইয়ের দেয়ালে আটকে যাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের বর্তমান ঋণ-স্থবিরতা তাই শুধু ব্যাংকিং খাতের সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতির গভীরে তৈরি হওয়া বিনিয়োগ-আস্থার সঙ্কটেরও প্রতিচ্ছবি। নীতি সুদ ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণের খরচ কমানোর সঙ্কেত দিয়েছে। কিন্তু বাজারে চাহিদা না থাকলে, কারখানায় গ্যাস না থাকলে এবং ভবিষ্যৎ নীতির নিশ্চয়তা না থাকলে সেই সঙ্কেত উদ্যোক্তার বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত বদলাতে পারছে না। তারা বলছেন, এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ‘নীতি সুদ কত তা নয়। প্রশ্ন হলো-ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করলে ব্যবসায়ী উৎপাদন করতে পারবেন কি না, উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারবেন কি না এবং সেই ব্যবসা থেকে ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধের পর পর্যাপ্ত লাভ থাকবে কি না।





