সোহাগ খন্দকার সাঘাটা (গাইবান্ধা)
রাত নামলেই আতঙ্ক বাড়ে যমুনাপাড়ের মানুষের। ঘুমের মধ্যেও শঙ্কা- ভোর হওয়ার আগেই হয়তো বসতভিটাটুকু নদীতে চলে যাবে। একসময় যে ঘরে সংসার ছিল, উঠানে ছিল গাছপালা, চারপাশে ছিল ফসলের মাঠ; এখন নদীর দিকে তাকিয়ে তাদের হিসাব করতে হয়, আর কতটুকু জমি বা ঘর অবশিষ্ট আছে।
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার নদীপাড়ের মানুষের এই উদ্বেগের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ দিনের ভাঙনের বাস্তবতা। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ২৩ বছরে যমুনার গতিপথ পরিবর্তন ও ভাঙনে সাঘাটা উপজেলার প্রায় ২০ দশমিক ৮৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা নদীতে বিলীন হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভারতখালী, সাঘাটা, হলদিয়া, কামালেরপাড়া ও কচুয়া ইউনিয়ন।
সরেজমিন অনুসন্ধানে নলছিয়া ও হলদিয়া ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী এলাকায় দেখা যায়, কোথাও সিসি ব্লক, কোথাও জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। তবে প্রতিরক্ষা কাজের পাশাপাশি স্থানীয়দের মধ্যে রয়ে গেছে অনিশ্চয়তা। নলছিয়া গ্রামের রাশিদুল ইসলাম বলেন, ‘নদীভাঙনের কারণে আমরা খুব বিপদে আছি। সরকারি কাজ চলছে। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার পর আমরা কতটা নিরাপদ থাকব, সেটাই বুঝতে পারছি না।’ হলদিয়া ইউনিয়নের কাজলী আক্তার বলেন, ‘রাত হলে ভয় হয়, ঘুমাতে পারি না। কখন নদীতে চলে যাই, সেই চিন্তা থাকে। একসময় যমুনা এখান থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার পূর্বে ছিল। এখন নদী আমাদের ইউনিয়নের কাছে চলে এসেছে।’
স্থানীয়দের দাবি, গত এক দশকে হলদিয়া ইউনিয়নের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা ভাঙনের শিকার হয়েছে। কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও মাদরাসা একাধিকবার স্থানান্তর করা হলেও ভাঙনের ঝুঁকি কাটেনি।
ভাঙনের প্রভাব পড়েছে শিক্ষাজীবনেও। সাঘাটার গোবিন্দপুর উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মাহবুর রহমান বলেন, বিদ্যালয়ের পাকা ভবন নদীতে বিলীন হওয়ার পর তার পড়াশোনা আর চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। গাইবান্ধা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লক্ষ কুমার দাস জানান, এক বছরে জেলার বিভিন্ন নদীর ভাঙনে আটটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীতে বিলীন হয়েছে। সদর, সাঘাটা, সুন্দরগঞ্জ ও ফুলছড়ির কয়েকটি বিদ্যালয় এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে। ভাঙনের সাথে অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়েও স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে। হলদিয়ার মমিম মিয়া বলেন, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ না হলে ভাঙন রোধের উদ্যোগ টেকসই হবে না। তার দাবি, নদীর তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে প্রতিরক্ষা কাজের পরও নতুন করে ভাঙন দেখা দিতে পারে।





