বাকৃবি প্রতিনিধি
ঔষধি উদ্ভিদ প্ল্যান্টেইন ব্যবহার করে নিরাপদ ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ব্রয়লার গোশত উৎপাদনের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। প্রায় দুই দশকের ধারাবাহিক গবেষণায় উদ্ভিদটির শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ঔষধি গুণাবলি কাজে লাগিয়ে তারা ‘বাউ-প্ল্যান্টিফ’ নামে একটি ফাইটোজেনিক ফিড অ্যাডিটিভ তৈরি করেছেন। একইসাথে আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে দেশে প্ল্যান্টেইনের বীজ উৎপাদন, চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও খামারে ব্যবহারের মাধ্যমে একটি টেকসই দেশীয় ‘সিড-টু-মিট ভ্যালু চেইন’ গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
প্রকল্পটির পরিচালক বাকৃবির অ্যানিমেল নিউট্রিশন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-মামুন জানান, প্ল্যান্টেইনে গ্লাইকোসাইড, ক্যাটালপলসহ নানা বায়োঅ্যাকটিভ উপাদান রয়েছে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস (বিএএস)-ইউএসডিএর অর্থায়নে প্রকল্পটি শুরু হয়, যার মেয়াদ চলতি সেপ্টেম্বরে শেষ হচ্ছে। ড. তামান্না হকসহ অন্য স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি শিক্ষার্থীরা এতে যুক্ত রয়েছেন।
গবেষকদের তথ্য মতে, প্ল্যান্টেইন ও কয়েকটি দেশীয় ঔষধি ভেষজের সমন্বয়ে তৈরি এই অ্যাডিটিভ ব্রয়লার ও দেশী মুরগিতে পরীক্ষা করে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। প্রচলিত কৃত্রিম ওষুধের পেছনে মুরগিপ্রতি সাড়ে আট টাকা খরচ হলেও বাউ-প্ল্যান্টিফ ব্যবহারে তা কমে সাত টাকায় নেমে আসে। গবেষণার ধারাবাহিক ট্রায়ালে ৪৫০টি ব্রয়লার মুরগি নিয়ে ৩৫ দিন করে তিন ধাপে পর্যবেক্ষণ চালানো হয়েছে। ময়মনসিংহ ও মানিকগঞ্জে উন্মুক্ত এবং গ্রিনহাউজ পদ্ধতিতে এটি চাষ করে দেশে বাণিজ্যিক উৎপাদনের চমৎকার সম্ভাবনা দেখা গেছে।
ড. আল-মামুন বলেন, বাংলাদেশে ২০০৪ সাল থেকে প্ল্যান্টেইন নিয়ে কাজ করছি। ব্রয়লার মুরগিতে এটি প্রয়োগের ঘটনা বিশ্বে এটাই প্রথম। ল্যাবরেটরি থেকে এটি এখন খামার পর্যায়ে ব্যবহারের উপযুক্ত। গবেষণার ফলাফল ইতোমধ্যে পোলট্রি সায়েন্স জার্নাল ও ইতালিয়ান জার্নাল অব অ্যানিমেল সায়েন্সে প্রকাশিত হয়েছে এবং পেটেন্টের জন্য আবেদন করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাউ-প্ল্যান্টিফ খাওয়ানো ব্রয়লারের হাড়ে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও আয়রনের পরিমাণ বাড়ে এবং কঙ্কাল শক্তিশালী হয়। গোশতের ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড বা আলফা-লিনোলেনিক অ্যাসিডের পরিমাণ প্রায় ৮ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, যা রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক। এ ছাড়া হিট স্ট্রেস বা গরমের ধকল সহ্য করার ক্ষমতাও বাড়ে।
উদ্ভাবকরা মনে করছেন, প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিক রূপ দিতে ফিড মিল, পোলট্রি শিল্প ও সরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। প্রসেসিং ও কোল্ড-চেইন ব্যবস্থা জোরদার হলে এটি দেশের পোলট্রি খাতে যুগান্তকারী বিপ্লব আনবে।