করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক (পরজীবি) নাশক ওষুধ আইভারমেকটিন পরীক্ষা করে দেখছে মহাখালীর আইসিডিডিআরবি। গবেষণায় মোট ৭২ জন করোনা আক্রান্তকে অন্তর্ভূক্ত করা হবে। করোনা চিকিৎসা দেয়া হয় দেশের এমন চারটি হাসপাতালের এই ৭২ রোগীকে বাছাই করা হবে। এর মধ্যে কর্মীটোলা জেনারেল হাসপাতাল এবং মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ৩৬ জনের মধ্যে শুরু হয়েছে এবং অপর দুইটি হাসপাতালের ৩৬ জনকে এই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

উল্লেখ্য বাংলাদেশের বেক্সিমকো ফার্মা সিউটিকেলস এই গবেষণার অর্থায়ন করবে। এই কোম্পানিটি আইভারমেকটিনও তৈরি করে থাকে।

আইসিডিডিআরবি করোনা চিকিৎসায় আইভারমেকটিনের সাথে অ্যান্টিবায়েটিক ডক্সিসাইক্লিন, অথবা শুধু আইভারমেকটিন ব্যবহারের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে পরীক্ষামূলক গবেষণাটি শুরু করেছে বলে জানিয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি থাকা ৪০ থেকে ৬৫ বছর বয়সী রোগীদের নিয়ে গবেষণাটি করা হবে।

আইসিডিডিআরবি আরো জানিয়েছে, এই গবেষণার লক্ষ্য হল আইভারমেকটিনের সাথে ডক্সিসাইক্লিন অথবা শুধু আইভারমেকটিন দিয়ে চিকিৎসা প্রদান করলে ভাইরাসের সংক্রমণ কমার হার এবং জ্বর ও কাশি কমতে ক’দিন লাগে সে সম্পর্কে জানা। এছাড়াও, এই গবেষণা অক্সিজেনের প্রয়োজনীয়তার পরিবর্তন, অক্সিজেন দেয়া সত্ত্বেও রোগী কেন অক্সিজেন স্যাচুরেশন (এসপিও২) ৮৮ শতাংশের বেশি ধরে রাখতে পারে না, রোগীকে অক্সিজেন সরবরাহ ও হাসপাতালে ভর্তি থাকার দিনের সংখ্যায় পরিবর্তন এবং করোনায় আক্রান্তদের মৃত্যুর কারণ জানার চেষ্টা করা হবে।

আইসিডিডিআর,বির আন্ত্রিক এবং শ্বাস-প্রশ্বাস রোগের সিয়িনর বিজ্ঞানী এবং গবেষণার প্রধান তত্ত্বাবধায়ক ড. ওয়াসিফ আলী খান বলেন, ‘এই ভাইরাসের দ্রুত বিস্তারের কারণে আমাদের প্রয়োজন সার্সকভ-২’র বিরুদ্ধে কার্যকর একটি অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ খুঁজে বের করা। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের কাছে করোনা চিকিৎসার জন্য কোনো ওষুধ নেই এবং এ ধরণের ওষুধ আবিষ্কার হতে কয়েক দশক লেগে যেতে পারে। তাই, আমাদের এমন ওষুধ খুঁজে বের করা প্রয়োজন যা বাজারে সহজলভ্য, যার ওপর যথেষ্টভাবে গবেষণা করা হয়েছে, যার পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া কম এবং যা জীবন বাঁচাতে সক্ষম।’

বেক্সিমকো ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হাসান বলেন, ‘বাংলাদেশে কোভিড-১৯ রোগীদের মধ্যে আইভারমেকটিনের প্রথম সুপরিকল্পিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে সহায়তা করতে পেরে আমরা আনন্দিত। এই গবেষণাসহ অন্যান্য দেশে চলমান গবেষণার ফলাফল ইতিবাচক হলে কোভিড-১৯ মহামারীর জন্য আইভারমেকটিন একটি অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যের ও সহজপ্রাপ্য সমাধান হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারবে।’

আইসিডিআিরবি জানিয়েছে, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্যানেল এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সাথে যুক্ত আছেন। কোভিড-১৯ পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে আক্রান্ত আগ্রহী রোগীদেরই এই গবেষনায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং একই সাথে যারা মৃদু অসুস্থ এবং সাত দিনের কম সময় অসুস্থতায় ভুগছেন এমন রোগীদেরকে এই গবেষনায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

গবেষণায় ব্যবহৃত ওষুধ দু’টির প্রতি অ্যালার্জি আছে, হৃদরোগ, কিডনি এবং লিভারের সমস্যা আছে, এবং গর্ভবতী বা বুকের দুধ খাওয়ান এমন মহিলাদেরকে এই গবেষণার আওতায় রাখা হবে না।

গবেষণার আওতাভুক্ত একটি দলের রোগীরা এক ডোজ আইভারমেকটিনের সাথে পাঁচ দিন ডক্সিসাইক্লিন পাবেন, অপর একটি দল পাঁচ দিন প্রতিদিন শুধু একটি করে আইভারমেকটিন পাবেন এবং তৃতীয় দল পাঁচ দিনব্যাপী প্রতিদিন একটি করে প্লাসিবো পাবেন। পরীক্ষার ওষুধ ও প্লাসিবোগুলো একইভাবে প্যাকেজ করা হবে এবং গবেষণাধীন ব্যক্তি ও চিকিৎসকরা কেউ জানবেন না কোন রোগী কোন ওষুধ পাচ্ছেন।

সম্প্রতি নতুন করোনাভাইরাসের সম্ভাবনাময় চিকিৎসায় আইভারমেকটিন-এর ব্যবহার মানুষের ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে এবং কোভিড-১৯ এর চিকিৎসায় এটি কেমন কার্যকর তা দেখার জন্য অনেক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। আইভারমেকটিন একটি অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যের এবং বেশিরভাগ মানুষের জন্য নিরাপদ বলে বিবেচিত ওষুধ, তবে খুব অল্প-সংখ্যক মানুষের মধ্যে এটি ব্যবহারে কিছু পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, যেমন ত্বকে ফুসকুড়ি ওঠা, বমি বমি ভাব, বমি, ডায়রিয়া, পেটে ব্যথা, মুখ বা কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ফোলা, স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া (মাথা ঘোরা, খিঁচুনি, বিভ্রান্তি), রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া ইত্যাদি। এজন্যে রোগীদেরকে শারীরিক, ক্লিনিক্যাল এবং গবেষণাগারে পরীক্ষার মাধ্যমে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। হাসাপাতাল থেকে ছাড়ার ছয় সপ্তাহ পর পুনরায় পর্যবেক্ষণ করা হবে। গবেষণার আওতাভুক্ত সকল রোগী তাঁদের অবস্থা অনুযায়ী প্রচলিত কোভিড-১৯ চিকিৎসা সেবা পাবেন।

এর আগে বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. তারিকুল আলম আইভারমেকটিনের (স্ক্যাবো) সাথে ডক্সিসাইক্লিন ব্যবহার করে করোনার রোগীদের মধ্যে একটি গবেষণা চালালন। সেখানে করোনার রোগীরা সুস্থ হয়েছেন বলে দেশ -বিদেশের সংবাদ পত্রে নিউজ হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার পিটার ডোহার্টি ইনস্টিটিউট অফ ইনফেকশন অ্যান্ড ইমিউনিটি এবং মোনাশ ইউনিভার্সিটির করা একটি গবেষণায় বলা হয়েছে ‘ইভারমেক্টিন’ খাওয়ালে করোনার রোগীরা সুস্থ হয়। এই গবেষণায় দেখা গেছে, এক ধরনের সেলে করোনাভাইরাসের ইনফেকশন এই ওষুধের এক ডোজ ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই ভাইরাসের পরিমান ৫০০০ গুণ নিচে নামিয়ে আনতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো ল্যাবরেটরিতে সেলের উপর করা এই পরীক্ষায় ইভারমেকটিনের যে ডোজ ব্যবহার করা হয়েছে, তা মানুষের শরীরে ব্যবহার সম্ভব নয়।

কাজেই এই প্রচলিত ডোজে ইভারমেকটিন মানুষের শরীরে কোনো কাজ করবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আরেকটা কারণ হচ্ছে ইভারমেকটিন রক্তের প্লাজমায় থাকা অন্যন্য প্রোটিনের সাথে লেগে থাকে, ফ্রি যেটুকু ইভারমেকটিন রক্তে থাকে, তা ফুসফুসের সেলে ভাইরাস কমাবে কিনা, তা এখনো জানা যায়নি। কিন্তু ইভারমেকটিন অতি অল্প মাত্রায়ও ভাইরাস মেরে ফেলতে পারে এবং ইভারমেকটিনের প্রচলিত ডোজের দশগুণ বেশি ওষুধও মানুষের শরীরে কোনো পার্শপ্রতিক্রিয়া তৈরি করে না। বাংলাদেশে বেক্সিমকো ছাড়াও ডেল্টা, পপুলার ও এসিআই ওষুধ কোম্পানি ভিন্ন নামে আইভারমেকটিন তৈরি করে।

অ্যান্টিবায়োটিক ডক্সিসাইক্লিন ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনে ব্যবহৃত হয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে ভাইরাসের উপরেও ডক্সিসাইক্লিনের প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। ভারতীয় একটি স্টাডিতে কম্পিউটারে এনালাইসিস করে দেখা গেছে, ডক্সিসাইন করোনা ভাইরাসের উপরেও সরাসরি কাজ করার ক্ষমতা রাখে। এছাড়া ডক্সিসাইক্লিন করোনাভাইরাসের ইনফেকশনে তৈরি হওয়া সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রোটিন সাইটকাইনের মাত্রা কমিয়ে আনতে পারে। করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনের যে ট্রায়াল চলেছে, তাতে তারা এজিথ্রোমাইসিনের বদলে ডক্সিসাইক্লিন ব্যবহার কার হচ্ছে।