নয়া দিগন্ত ডেস্ক

স্থানীয় উপজাতীয় যোদ্ধাদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় ইরানি সমর্থনপুষ্ট হাউছি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা আরো কয়েকটি সামরিক ঘাটির দখল নিয়েছে ইয়েমেনি সেনাবাহিনী। ইয়েমেন সামরিক বাহিনীর একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এই অর্জনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, স্থানীয় আল-সাবিহা উপজাতি গোষ্ঠীর সশস্ত্র যোদ্ধাদের সাথে সমন্বয় করে ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষায়িত ‘নেশন শিল্ড বাহিনী’ এবং ‘জায়ান্ট ব্রিগেড’ যৌথ অভিযান পরিচালনা করে। শুক্রবার দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ লাহজে পরিচালিত এই অভিযানে হাউছি সামরিক উপস্থিতির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান মুক্ত করা হয়। আরব নিউজ, পাকিস্তান অবজারভার ও রয়টার্স
দখলকৃত অবস্থানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল আল-মাদারিবাহ ওয়া আল-আরাহ জেলায় অবস্থিত নৌমান পর্বতের পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটি। এই উঁচু ঘাঁটিটি ব্যবহার করে হাউছি সামরিক অধিনায়করা লাহজের বিশাল বিস্তীর্ণ এলাকা এবং সংলগ্ন তাইজ প্রদেশের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাত। চলতি মাসের শুরুর দিকে লোহিত সাগরের কৌশলগত বন্দর শহর মোখা এবং গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর হাউছি গোষ্ঠী মূলত পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য অঞ্চলের দিকে অগ্রযাত্রার চেষ্টা করছিল। তাদের মূল কৌশলগত লক্ষ্য ছিল লাহজ প্রদেশের কাহবুব অঞ্চল এবং তাইজ শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকাগুলো দখলে নেওয়া, যাতে বৈশ্বিক বাণিজ্য পথ বাব আল-মান্দেব প্রণালীর ওপর তাদের পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা আরো জোরদার করা যায়।
তবে ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর সমন্বিত প্রতিরোধ এবং আল-সাবিহা উপজাতীয় যোদ্ধাদের কঠোর পাল্টা আক্রমণের মুখে হাউছি বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং লাহজের একাধিক ঘাঁটি খালি করে পালিয়ে যায়। কৌশলগত কাহবুব অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় লোহিত সাগর উপকূলে বিদ্যমান হাউছি সামরিক স্থাপনা ও সামরিক সক্ষমতা বর্তমানে চরম সামরিক ঝুঁকিতে পড়েছে বলে ইয়েমেনি কমান্ডারের বরাতে নিশ্চিত হওয়া গেছে। অভিযানের গতিপ্রকৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সেনা কর্মকর্তা জানান, হাউছিদের অগ্রযাত্রার প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দেয়া হয়েছে এবং তারা মারাত্মক প্রাণহানির শিকার হয়েছে। পিছু হটার সময় পাহাড়ি অঞ্চলে তাদের বহু যোদ্ধার লাশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা গেছে। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ২০১৫ সালে সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী হাউছি রাজধানী সানা দখল করে নেয়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মনসুর আবদ-আল হাদি সৌদিতে আশ্রয় নিলে তাকে আবার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ক্ষমতায় বসাতে ইয়েমেনি ও সৌদি জোট সামরিক অভিযান শুরু করে। বর্তমানে সানা, লোহিত সাগর উপকূল এবং উত্তর ইয়েমেনের অর্ধেকেরও বেশি ভূখণ্ড হাউছিদের দখলে রয়েছে; বিপরীতে দক্ষিণাঞ্চল পরিচালনা করছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল সরকার। দখলকৃত উত্তর ইয়েমেনকে হাউছিমুক্ত করতে গত জুলাই থেকে ইয়েমেনি বাহিনী ব্যাপক সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
আক্রমণ প্রতিরোধে যৌথ প্রতিরক্ষা বৈঠকের আহ্বান
এ দিকে সৌদি আরবের সীমান্ত ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে হাউছিদের সাম্প্রতিক দফায় দফায় হামলা এবং নতুন করে হামলার হুমকির মুখে রিয়াদে তিন দেশের সেনাপ্রধানদের একটি জরুরি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত শুক্রবার রিয়াদে অনুষ্ঠিত এই তিনপক্ষীয় বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন সৌদি আরবের সেনাপ্রধান জেনারেল ফায়াদ বিন হামাদ বিন রুয়ালি, তুরস্কের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল সেলকুক বায়রাক্তারগলু এবং পাকিস্তানের সেনাবাহিনী প্রধান ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনির। মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের অংশীদার এই তিন দেশের শীর্ষ সামরিক অধিনায়কদের বৈঠকটিকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ  বলে মনে করা হচ্ছে। রিয়াদের প্রতিরক্ষা নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা নিরসনে তারা পারস্পরিক সহযোগিতর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। সাধারণ জনগণকে অস্ত্র তুলে নেয়ার ডাক ইয়েমেনি রাষ্ট্রপতির হাউছি সশস্ত্র বিদ্রোহীদের তীব্র আগ্রাসন প্রতিহত করতে দেশের সর্বস্তরের সাধারণ জনগণকে জাতীয় সামরিক বাহিনীতে যোগ দিয়ে অস্ত্র হাতে তুলে নেয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের প্রেসিডেন্ট রাশিদ আল-আলিমি। এক বিশেষ ভিডিও বার্তায় জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে ইয়েমেনি প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন যে, গতকাল থেকে যেসব হাউছি সদস্য কিংবা তাদের সহযোগী যোদ্ধা বিদ্রোহ পথ ত্যাগ করে আত্মসমর্পণ করবে, তাদের জন্য পূর্ণ সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন করা হবে। প্রেসিডেন্ট রাশিদ আল-আলিমি বর্তমানে সৌদি আরবে অবস্থান করে সরকার পরিচালনা করছেন। এমন এক সময়ে তার এই বার্তাটি এলো যখন মাঠপর্যায়ে সরকারি বাহিনী ও হাউছিদের মধ্যে প্রাণঘাতী লড়াই অব্যাহত রয়েছে এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত লক্ষ্যবস্তুগুলোতে ক্রমাগত বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।