হামিদুল ইসলাম সরকার
* চতুর্থ সেক্টর প্রোগ্রাম চালু না থাকায় দাতা সংস্থার অর্থায়ন কমছে
* দাতা সংস্থার অর্থায়ন নিশ্চিতে সরকারের অর্থায়নের বাধ্যবাধকতা
* শর্ত পূরণ না হলে ৩০ শতাংশ অনুদান বাতিল
দেশের যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া ও এইচআইভি রোগ প্রতিরোধে সরকার চার হাজার ৩৯ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে প্রকল্প নিচ্ছে। রোগ নিয়ন্ত্রণের এ কর্মসূচিতে বিদেশী সহায়তা থাকলেও সিংহভাগ অর্থের দায়িত্ব সরকারের। শর্ত পূরণ করতে না পারলে দাতা সংস্থা জিসি-৮-এর বরাদ্দ হতে বাংলাদেশের জন্য অনুদান ৩০ শতাংশ কমে যাবে। গত জুলাই, ২০২৪ হতে ৪র্থ সেক্টর প্রোগ্রাম চালু না থাকায় এবং দাতা সংস্থার অর্থায়ন ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাওয়ায় অত্যাবশ্যকীয় সেবাসমূহ, অর্থাৎ মাঠ পর্যায়ের জনবল, ঔষধ ও রিএজেন্ট এর বৃহৎ অংশ বন্ধ হয়ে গেছে। উক্ত সেবাসমূহ অব্যাহত রাখাসহ অর্জনসমূহ অক্ষুণœ রাখতে এ মেগা প্রকল্প নেয়া হয়েছে বলে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের প্রকল্প দলিল থেকে জানা গেছে। কম অনুদান দিলেও দাতা সংস্থার অর্থায়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের ১৩.৪ কোটি ডলার সহ-অর্থায়নের শর্ত রয়েছে বলে সরকারি নথিতে বলা হয়েছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় আজ এ প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে।
হঠাৎ কেন এ মেগা প্রকল্প?
স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের প্রকল্প দলিলসূত্রে জানা গেছে, গত ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ‘৪র্থ সেক্টর প্রোগ্রাম’ চালু না থাকায় এবং আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার অর্থায়ন ক্রমাগত কমতে থাকায় চরম সঙ্কটে পড়েছিল দেশের স্বাস্থ্য খাত। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের প্রয়োজনীয় জনবল, জরুরি ওষুধপত্র ও ল্যাবরেটরি রিএজেন্টের বড় একটি অংশের জোগান কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে অচলাবস্থা কাটিয়ে সেবা চালু রাখা এবং বিগত বছরের অর্জনসমূহ অক্ষুণœ রাখতেই তড়িঘড়ি এ মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার।
প্রকল্পের মূল লক্ষ্য
প্রকল্প দলিলের তথ্য বলছে, স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে টেকসই করার মাধ্যমে তিন রোগের সংক্রমণ ও মৃত্যুহার কমানো। এখানে প্রকল্প মেয়াদে প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার ৭২৬ জন যক্ষ্মা রোগীকে শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনা। ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মা ধরতে রিফাম্পিসিনের সংবেদনশীলতা পরীক্ষা করা। নতুন ও পুনরায় নিবন্ধিত সব যক্ষ্মা রোগীর এইচআইভি স্ট্যাটাস জানা। ঝুঁঁকিপূর্ণ প্রায় ১৫ লাখ মানুষকে যক্ষ্মা প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা (টিপিটি) দেয়া।
এইচআইভি/এইডস’র চিকিৎসায় থাকা রোগীদের ৯০ শতাংশের বেশির ক্ষেত্রে ভাইরাল লোড দমন নিশ্চিত করা। শিশুসহ চার হাজার জন এইচআইভি সংক্রমিত মানুষ (পিএলএইচআইভি) এবং ৯৫০ জন ওপিওয়েড সাবস্টিটিউশন থেরাপি ও কি-পপুলেশনভুক্ত মানুষকে পুষ্টি সহায়তা দেয়া। আর ম্যালেরিয়ার ঝুঁঁকিপূর্ণ এলাকায় আক্রান্তের হার কমানো এবং ম্যালেরিয়াজনিত মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনা। এ ছাড়া মাতৃস্বাস্থ্যের প্রসবপূর্ব সেবা (এএনসি) নেয়া ম্যালেরিয়া-ঝুঁঁকিপূর্ণ এলাকার গর্ভবতী নারীদের মাল্টিপল মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সাপ্লিমেন্ট (এমএমএস) দেয়া। এ ছাড়া সমাজভিত্তিক সচেতনতা, বেসরকারি সংস্থা ও কমিউনিটির অংশগ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির সমন্বয় জোরদার করা। প্রকল্প এলাকা সারাদেশের আটটি বিভাগ ও ৬৪টি জেলা। দাবি করা হচ্ছে, প্রকল্পটি টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) স্বাস্থ্য-লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং নির্বাচনী ইশতেহার-২০২৬-এর অঙ্গীকারের সাথেও সঙ্গতিপূর্ণ।
অনুদান কমলো, সরকারের ঘাড়ে বাড়তি চাপ
নথির হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ‘দ্য গ্লোবাল ফান্ড’ (এঋঅঞগ) তাদের প্রস্তাবিত অনুদান এক হাজার ১৪১.৪৯ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৮৭০.১৭ কোটি টাকায় নামিয়ে এনেছে। অর্থাৎ এক ধাক্কায় ২৭১.৩ কোটি টাকা অনুদান কমে গেছে। ফলে দাতাদের সৃষ্টি করা এ ঘাটতি মেটাতে গিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে নিজস্ব তহবিল থেকে অতিরিক্ত প্রায় ৭১৩.৪ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দের ঝুঁঁকি নিতে হয়েছে। বর্তমানে মোট চার হাজার ৩৯ কোটি ছয় লাখ ৫৩ হাজার টাকার প্রকল্পে সরকার দেবে তিন হাজার ১৬৮.৮৮ কোটি টাকা (৭৮ শতাংশ), আর গ্লোবাল ফান্ডের অনুদান মাত্র ৮৭০.১৭ কোটি টাকা (২২ শতাংশ)।
শর্ত : খেলাপি হলেই ৩০ শতাংশ বরাদ্দ বাতিল!
নথির তথ্য বলছে, কম অনুদান দিলেও শর্তের বেড়াজাল কমায়নি দাতা সংস্থাটি। গ্লোবাল ফান্ডের অনুদান নিশ্চিত রাখতে হলে বাংলাদেশ সরকারকে বড় অঙ্কের ‘সহ-অর্থায়ন’ করতেই হবে। জিসি-৭ গ্রান্ট পিরিয়ড (২০২৪-২০২৬) : ১৬ কোটি ডলার অনুদানের বিপরীতে বাংলাদেশকে দিতে হবে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার। জিসি-৮ গ্রান্ট পিরিয়ড (২০২৭-২০২৯) : ১৩ কোটি ১০ লাখ ডলার অনুদানের বিপরীতে বাংলাদেশকে বাধ্যতামূলকভাবে ১৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার সহ-অর্থায়ন করতে হবে। সরকারি নথিতে স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছে, সরকার যদি এ সহ-অর্থায়নের শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়, তবে দাতা সংস্থা জিসি-৮ পর্বের মোট অনুদান থেকে সরাসরি ৩০ শতাংশ কেটে নেবে!
মূল লড়াই : ২৩ থেকে ৬৪ জেলায়
নথির তথ্যানুযায়ী, প্রকল্পটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন সম্ভবত এখানেই। আগের পরিকল্পনায় জাতীয় এইডস ও এসটিডি কর্মসূচির আওতা ছিল ২৩ জেলা। নতুন প্রস্তাবে তা ৬৪ জেলায় নেয়ার কথা বলা হয়েছে। কারণ গত ২০২৫ সালে দেশে এক হাজার ৮৯১ জন নতুন এইচআইভি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে। তাদের একটি অংশ পুরনো অগ্রাধিকার জেলার বাইরেও শনাক্ত হয়েছে। ফলে শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি জেলায় পরীক্ষা চালিয়ে গেলে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র ধরা পড়বে না-এ যুক্তিতে দেশব্যাপী পরীক্ষার পরিধি বাড়ানো হচ্ছে। প্রকল্পে আনুমানিক ১৭ হাজার সাতশ জন এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির (পিএলএইচআইভি) চিকিৎসা কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে। চিকিৎসার আওতায় থাকা রোগীদের ৮৫ শতাংশকে নির্ধারিত চিকিৎসা ব্যবস্থার মধ্যে আনার লক্ষ্য। পাশাপাশি ৯৩ শতাংশ ভাইরাল লোড দমনের লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
ম্যালেরিয়ার ভার পাহাড়ে
নথিতে দেখা যাচ্ছে, দেশের ম্যালেরিয়ার অধিকাংশ রোগীই চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে। ফলে প্রকল্পে পার্বত্য তিন জেলায় বিশেষ নজর দেয়ার পাশাপাশি ম্যালেরিয়া নির্মূলের লক্ষ্যে থাকা অন্য জেলাগুলোতেও নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। লক্ষ্য-ঝুঁঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ প্রতি এক হাজারে ১-এর নিচে নামিয়ে আনা। আর আরো বড় লক্ষ্য-২০২৯ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়াজনিত মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনা। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রেও আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত গর্ভবতীদের এএনসি এর সময় একাধিক মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট বা পুষ্টি উপাদানযুক্ত সম্পূরক দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
রোগীরা পাবে ৮২০ টাকা মাসিক পুষ্টি সহায়তা
প্রকল্প দলিল থেকে জানা গেছে, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী পুষ্টি সহায়তার জন্য কল্যাণ অনুদান অন্তর্ভুক্ত করা হযেছে। যার জন্য ৪১৬.৬৮ কোটি টাকা ব্যয় হবে, যা মোট প্রস্তাবিত বাজেটের ১০ শতাংশের বেশি। এখানে প্রায় ৮.৩৫ লাখ যক্ষ্মা, এইচআইডি ও ম্যালেরিয়া আক্রান্ত জনগোষ্ঠী পুষ্টি সহায়তা সেবায় অন্তর্ভুক্ত হবে। প্রকল্প চলাকালীন সময়ে আট লাখ ২৪ হাজার ৪৫০ জন যক্ষ্মা রোগীকে ছয় মাস মেয়াদে, ১৪ শ’ জন এইচআইভি/এইডস রোগীকে ১২ মাস এবং এক হাজার ৮৩০ জন ম্যালেরিয়া রোগীকে ১২ মাস মেয়াদে মাসিক ৮২০ টাকা হারে পুষ্টি সহায়তা প্রদান করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশন আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগ অভিমতে বলছে
প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে সংক্রমণ ব্যাধি রোগ বিশেষত যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া এবং এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত ও টেকসই ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। পর্যায়ক্রমে দাতা সংস্থার প্রতি নির্ভরতা হ্রাস পাবে। গত ৩০ বছর ধরে উক্ত তিনটি রোগ ব্যবস্থাপনা ভিন্নভাবে উন্নয়ন সহযোগীর সহায়তায় পরিচালিত হয়েছে। তিনটি রোগ বাস স্থাপনা সমন্বিতভাবে বাস্তবায়িত হলে তা ব্যয় সাশ্রয়ী হবে। উক্ত তিনটি রোগ ব্যবস্থাপনায় সমাজে কুসংস্কার, বিদ্যমান বৈষম্য, এ প্রকল্পের প্রতিরোধমূলক ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে নিরসন করা হবে। পাশাপাশি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য সেক্টর নয়, সংশ্লিষ্ট বিভাগ-মন্ত্রণালয়, বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, এনজিও, গণমাধ্যম ও কমিউনিটিসমূহের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পাবে, যা কর্মসূচিটিকে কার্যত টেকসই করতে সহায়তা করবে। প্রস্তাবিত প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় চার হাজার কোটি টাকার বেশি, যা ৫০ (পঞ্চাশ) কোটি টাকার ঊর্ধ্বে হওয়ায় ‘সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরুণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকা’র ৩.২.৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রকল্প প্রস্তাবটি একনেক কর্তৃক অনুমোদনযোগ্য।





