বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্বস্তির বড় উৎস হয়ে উঠেছে প্রবাসী আয়। নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে জুলাই ১ থেকে সেপ্টেম্বর ২৮ পর্যন্ত বাংলাদেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৮৩৫ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৭৩৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৯৯ কোটি ২০ লাখ ডলার বা ১৩.৫ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে এ হিসাব পাওয়া গেছে।
শুধু সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৮ দিনেই প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ২৫৩ কোটি ২০ লাখ ডলার, যেখানে ২০২৫ সালের একই সময়ে এসেছিল ২৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এ হিসাবে সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৮ দিনে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২.৭ শতাংশ। ২৮ সেপ্টেম্বর এক দিনেই এসেছে প্রায় ৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এর আগে আগস্টে পুরো মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল প্রায় ২৯৬ কোটি ডলার, যা আগের বছরের আগস্টের তুলনায় প্রায় ২২.৫ শতাংশ বেশি। ফলে জুলাই-আগস্ট দুই মাসে প্রবাহ বেড়েছিল ১৮ শতাংশের বেশি।
অর্থাৎ এপ্রিল-জুন ২৫-২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্সের যে শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, নতুন অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেও তা অব্যাহত রয়েছে। তবে একই সময়ে শ্রম অভিবাসনের গতি কমে যাওয়ায় রেমিট্যান্স অর্থনীতির সামনে নতুন একটি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে- বিদেশে নতুন কর্মী কম গেলেও বর্তমান রেমিট্যান্স প্রবাহ কত দিন ধরে রাখা যাবে?
আগস্টে ২২.৫ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে গতি হ্রাস
বাংলাদেশ ব্যাংকের এপ্রিল-জুন ২৫-২৬ অর্থবছরের প্রান্তিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই তিন মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৯৩৮ কোটি ৪৯ লাখ ৩০ হাজার ডলার। আগের প্রান্তিকের তুলনায় তা ৫.৬২ শতাংশ কম হলেও এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছিল ৯.৮৪ শতাংশ।
এরপর নতুন অর্থবছরের শুরুতেই জুলাইয়ে আসে ২৮৫ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাসিক হিসাবে জুলাইয়ের এ প্রবাহ আগের বছরের জুলাইয়ের ২৪৭ কোটি ৭৯ লাখ ডলারের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি।
আগস্টে রেমিট্যান্স আরো বেড়ে প্রায় ২৯৬ কোটি ডলারে পৌঁছায়। সেপ্টেম্বরের ২৮ দিনেই আসে ২৫৩ কোটি ২০ লাখ ডলার। ফলে ঋণ ২৭-এর প্রথম তিন মাসে মোট প্রবাহ ৮.৩৫৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
সেপ্টেম্বরের প্রবাহের দিকে একটু গভীরভাবে তাকালে দেখা যায়, আগস্টের তুলনায় প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। আগস্টে বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ২২.৫ শতাংশ। সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৮ দিনে তা ২.৭ শতাংশে নেমেছে।
তবে এখানে মাসের পূর্ণ সময়ের সাথে অসম্পূর্ণ সময়ের তুলনা না করাই গুরুত্বপূর্ণ। সেপ্টেম্বরের ২৮ দিনের তথ্যকে পুরো মাসের সাথে তুলনা করা যাবে না। তাই সেপ্টেম্বরের পূর্ণ মাসের হিসাব প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত মাসিক প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না।
তবে জুলাই-সেপ্টেম্বরের সামগ্রিক হিসাবে ১৩.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রমাণ করে যে রেমিট্যান্স এখনো শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে।
রেকর্ডে অর্থবছরের শুরু : হুন্ডি থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ পেয়েছিল ৩ হাজার ৩২ কোটি ৮৮ লাখ ডলার রেমিট্যান্স। ২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ৩ হাজার ৫৫৯ কোটি ডলারে পৌঁছায়। অর্থাৎ এক বছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৭.৩৫ শতাংশ। এখন ২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের প্রবাহ সেই ঊর্ধ্বমুখী ধারাই অব্যাহত রেখেছে।
এখানে রেমিট্যান্সের অর্থনৈতিক গুরুত্ব শুধু বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণে সীমাবদ্ধ নয়। এটি রিজার্ভ, আমদানি পরিশোধ, ব্যাংকিং খাতের তারল্য, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য এবং প্রবাসী পরিবারের ভোগব্যয়ের সাথে সরাসরি যুক্ত।
রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পেছনে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের ব্যবহার বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এপ্রিল-জুন ঋণ ২৬ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বাজারের বিনিময় হারের ব্যবধান কমে আসায় ব্যাংকিং চ্যানেল প্রবাসীদের কাছে তুলনামূলক আকর্ষণীয় হয়েছে। এপ্রিল-জুন ২৫-২৬ অর্থবছরে মোট রেমিট্যান্সের ৭০.৯ শতাংশ এসেছিল বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের অংশ ছিল ১৭.০৯ শতাংশ এবং বিশেষায়িত ব্যাংকের ১১.৭২ শতাংশ।
ব্যাংকভিত্তিক হিসাবে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি ছিল সবচেয়ে বড় রেমিট্যান্স সংগ্রাহক। ওই প্রান্তিকে ব্যাংকটি পেয়েছিল ১৪৩ কোটি ৪২ লাখ ডলার, মোট প্রবাহের ১৫.২৮ শতাংশ। নতুন অর্থবছরেও বড় বেসরকারি ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্স সংগ্রহে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। আগস্টে ইসলামী ব্যাংক প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছে; বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক ও ট্রাস্ট ব্যাংকও উল্লেখযোগ্য প্রবাহ পেয়েছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ শ্রমবাজারে
রেমিট্যান্সের ইতিবাচক ধারার বিপরীতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ বিদেশে নতুন কর্মী যাওয়ার ক্ষেত্রে।
এপ্রিল-জুন ২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশে গিয়েছিলেন মাত্র ১ লাখ ৬০ হাজার ২৮৩ জন কর্মী। আগের প্রান্তিকে এ সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫ হাজার ৩৮৪ এবং এক বছর আগে একই প্রান্তিকে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৭১৯ জন। অর্থাৎ রেমিট্যান্স বাড়লেও নতুন শ্রম অভিবাসনের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এপ্রিল-জুন প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকে শ্রমবাজারের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী কর্মী থাকায় দীর্ঘস্থায়ী সঙ্ঘাত হলে নতুন নিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং অর্থ পাঠানোর ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক সংবাদপ্রবাহেও মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক শ্রমবাজারে মন্দার বিষয়টি উঠে এসেছে।
সৌদি আরব মূলকেন্দ্র : ইউরোপের ভূমিকা বাড়ছে
বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসন ও রেমিট্যান্স- দুই ক্ষেত্রেই সৌদি আরবের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এপ্রিল-জুন ২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশে যাওয়া ১ লাখ ৬০ হাজার ২৮৩ কর্মীর মধ্যে ৭৯ হাজার ৯১৬ জন, অর্থাৎ প্রায় অর্ধেকই সৌদি আরবে গেছেন। একই সময়ে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে এসেছে ১৬৩ কোটি ৯৩ লাখ ৯০ হাজার ডলার, যা মোট রেমিট্যান্সের ১৭.৪৭ শতাংশ।
এটি বাংলাদেশের জন্য একই সাথে শক্তি ও ঝুঁকি- দুই দিকই তৈরি করে। সৌদি আরবের শ্রমবাজার সক্রিয় থাকলে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী কর্মী থেকে আয় আসতে থাকে। কিন্তু সেখানে নিয়োগনীতি বা শ্রমবাজারে বড় পরিবর্তন হলে বাংলাদেশের ওপর তার প্রভাবও দ্রুত পড়ে।
রেমিট্যান্সের উৎসে অবশ্য কিছুটা বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে। এপ্রিল-জুন ২৫-২৬ অর্থবছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো থেকে এসেছে ২১১ কোটি ৬৮ লাখ ডলার, যা মোটের ২২.৫৬ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে এ অঞ্চলের রেমিট্যান্স বেড়েছে ৩৯.৩৪ শতাংশ। যুক্তরাজ্য থেকে একাই এসেছে ১৫৫ কোটি ৮৭ লাখ ডলার এবং ইতালি থেকে ৫১ কোটি ৮৮ লাখ ডলার। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের উৎসভিত্তিক ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে। তবে এর জন্য দক্ষ শ্রমিকের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান, উচ্চ আয়ের পেশা এবং নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
রেমিট্যান্স বনাম শ্রমিক- দু’টি বিপরীত সঙ্কেত
বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো- রেমিট্যান্স বাড়ছে, কিন্তু নতুন কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমছে। এর অর্থ, বর্তমান রেমিট্যান্স প্রবাহের বড় অংশ আসছে ইতোমধ্যে বিদেশে অবস্থানরত শ্রমিক ও প্রবাসীদের কাছ থেকে। নতুন কর্মী বিদেশে যাওয়ার সংখ্যা যদি দীর্ঘ সময় কম থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য বিদ্যমান কর্মীদের আয় বৃদ্ধি এবং নতুন উচ্চমূল্যের শ্রমবাজার সৃষ্টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এ কারণে শুধু কত ডলার রেমিট্যান্স এলো- এটি দিয়ে শ্রম অভিবাসন অর্থনীতির স্বাস্থ্য পুরোপুরি বোঝা যাবে না। একই সাথে দেখতে হবে- বছরে কতজন নতুন কর্মী বিদেশে যাচ্ছে; তাদের গড় আয় কত; কোন কোন দেশে কর্মসংস্থান হচ্ছে; দক্ষ ও অদক্ষ কর্মীর অনুপাত কী; নারী কর্মীর অংশগ্রহণ কত; অভিবাসন ব্যয় কত; এবং একজন কর্মী বিদেশে যাওয়ার পর দেশে কত বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাচ্ছেন।
সামনে কী?
বাংলাদেশ ব্যাংকের এপ্রিল-জুন ২৫-২৬ অর্থবছর মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সঙ্ঘাত দীর্ঘায়িত হলে নতুন শ্রম অভিবাসন এবং বিদ্যমান কর্মীদের কর্মসংস্থান- দুই ক্ষেত্রেই ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অন্তত এখন পর্যন্ত ভিন্ন একটি বার্তা দিচ্ছে। ২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রেমিট্যান্স ১৩.৫ শতাংশ বেড়েছে এবং প্রায় ৮.৩৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ রেমিট্যান্স এখনো বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি। কিন্তু এই প্রবাহকে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতায় রূপ দিতে হলে শুধু প্রণোদনা বা ব্যাংকিং চ্যানেল যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন শ্রমবাজারের বৈচিত্র্য, দক্ষতা উন্নয়ন, উচ্চআয়ের চাকরির বাজারে প্রবেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতা কমানো। কারণ বর্তমান পরিসংখ্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো- বাংলাদেশের প্রবাসী আয় এখন শক্তিশালী, কিন্তু ভবিষ্যৎ রেমিট্যান্সের ভিত্তি তৈরির শ্রমবাজারটি একই সময়ে চাপের মুখে।





