হামিদুল ইসলাম সরকার

 

  •  ওয়াকওয়ে প্রকল্পেও ৯ কোটি টাকার পরামর্শক
  •  প্রকল্পে খরচ বাড়ছে ৪২৭.৪ কোটি টাকা

কোনো উন্নয়ন প্রকল্পই নির্ধারিত মেয়াদে শেষ হয় না। মেয়াদ বাড়ে তো তার চেয়ে বেশি বেগে খরচ বাড়ে। ঢাকা শহরের চার পাশের চার নদীর পাড় দখলমুক্ত রাখতে ওয়াকওয়ে, তীররক্ষা, জেটি ও আলোর ব্যবস্থার প্রকল্পটি চলছে আট বছর ধরে। লক্ষ্য ছিল পাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালুর তীরকে দখল-দূষণ থেকে রক্ষা করা; কিন্তু প্রকল্পের কাজ যত এগিয়েছে, ততই বেড়েছে তার ব্যয় ও সময়। চার বছরে শেষ হওয়ার কথা ছিল যে প্রকল্পের, সেটিই এখন নবম বছরে গড়াচ্ছে। ব্যয় দাঁড়াচ্ছে এক হাজার ২৭৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। খরচ বাড়ছে মোট ৪২৭ কোটি টাকা। আর কাজের সামগ্রিক অগ্রগতি এখনো ৮৩.৩২ শতাংশের মতো বলে সরকারি নথি থেকে জানা গেছে। 
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবনার নথির তথ্য বলছে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিøউটিএ) বাস্তবায়নাধীন ‘বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর তীরভূমিতে পিলারের স্থাপন, তীররক্ষা, ওয়াকওয়ে ও জেটি-সহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়)’ প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) এখন পরিকল্পনা কমিশনে। প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৮৪৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধনে সেই ব্যয় বেড়ে হয় এক হাজার ১৮১ কোটি ১০ লাখ ৩১ হাজার টাকা। এবার দ্বিতীয় সংশোধনের প্রস্তাবে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ২৭৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ, মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় প্রস্তাবিত ব্যয় বাড়ছে প্রায় ৪২৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৫০ শতাংশ। আর প্রথম সংশোধিত ব্যয়ের তুলনায় দ্বিতীয় সংশোধনে বাড়ছে প্রায় ৯৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৮.০৩ শতাংশ।
২২ সালে শেষ হওয়ার কথা, গড়াচ্ছে ২০২৭-এ
নথির তথ্য বলছে, গত ২০১৮ সালের ১ জুলাই থেকে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২২ সালের ৩০ জুনের মধ্যেই কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। প্রথম সংশোধনে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৩ সালের ৩০ জুন করা হয়। পরে ব্যয় না বাড়িয়ে সময় আরো এক দফা বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়; কিন্তু তাতেও কাজ শেষ হয়নি। দ্বিতীয় সংশোধনে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। একই সাথে সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় প্রকল্পটির সামগ্রিক কার্যক্রম ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত গড়ানোর বিষয়টিও সামনে এসেছে প্রস্তাবনায়। অর্থাৎ, চার বছরে শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটির অগ্রগতি প্রায় ৮৩.৩২ শতাংশ।
৫২ কিলোমিটারের বেশি ওয়াকওয়ে : প্রকল্পের নথির তথ্য থেকে জানা গেছে, প্রকল্পের সবচেয়ে বড় অংশ ওয়াকওয়ে নির্মাণ। নদীর তীরকে দখলমুক্ত রাখা এবং সাধারণ মানুষের চলাচলের উপযোগী পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে নদীতীর ও পিলারের ওপর মিলিয়ে মোট ৫৩ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে- নদীর তীরে ওয়াকওয়ে : ৩১.৮৭৩ কিলোমিটার এবং কলামের ওপর ওয়াকওয়ে : ২১.৩১৮ কিলোমিটার। দুই অংশ মিলিয়ে ওয়াকওয়ের দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ৫৩.১৯১ কিলোমিটার, অর্থাৎ প্রায় ৫৩.১৯ কিলোমিটার। এ ছাড়া নদীর তীর সুরক্ষায় ২২.৮৫০ কিলোমিটার তীররক্ষা কাজ এবং ৯.০৯৪ কিলোমিটার কি-ওয়াল/আরসিসি সীমানা প্রাচীর নির্মাণের সংস্থান রয়েছে। নদীতীরের এই অবকাঠামোর সাথে থাকছে ৮০টি জেটি ও সিঁড়ি, সীমানা পিলার রক্ষার জন্য ১০০টি বোলার্ড এবং ওয়াকওয়ের নিরাপত্তা ও ব্যবহারযোগ্যতা বাড়াতে ২২৯টি স্ট্রিট লাইট। 
পরামর্শক খাতেও ৯ কোটির বেশি
প্রকল্পের একটি উল্লেখযোগ্য ব্যয় পরামর্শক সেবায়। প্রকল্প প্রস্তাবের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন দরপত্র প্যাকেজ এবং একটি সেবা খাতের আওতায় পরামর্শক নিয়োগ করা হয়েছে। এ খাতে ৯ কোটি দুই লাখ ৯৩ হাজার টাকা ব্যয়ের সংস্থান রাখা হয়েছে। 
পাঁচ জেলায় নদীতীর, রাজধানীর ঘনবসতিও আওতায়
তথ্য বলছে, প্রকল্পটির ভৌগোলিক বিস্তারও কম নয়। ঢাকা বিভাগের ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী ও মুন্সীগঞ্জ জেলার বিভিন্ন নদীতীর এর আওতায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ সদর, বন্দর, সোনারগাঁও, রূপগঞ্জ, গাজীপুর সদর-সহ বিভিন্ন এলাকা। ঢাকা মহানগরের সদরঘাট, উত্তরাঞ্চল, তুরাগ, মোহাম্মদপুর, কামরাঙ্গীরচর, কোতোয়ালি ও মিরপুরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও জটিল এলাকাও প্রকল্পের আওতাভুক্ত।