নিজস্ব প্রতিবেদক
- শর্টসার্কিটে মসজিদ মার্কেটে আগুন থেকে ঘটনার সূত্রপাত
- সাংবাদিক ও পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা
- সিটি করপোরেশনের ৩টি গাড়িতে আগুনসহ একাধিক গাড়ি ভাঙচুর সমন্বয়ের অভাব বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে হকারদের সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষ চলাকালে সিটি করপোরেশনের তিনটি ময়লার গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, পুলিশের গাড়ি ও একটি ভেকু মেশিনসহ কয়েকটি বাস ভাঙচুর করেছে ফুটপাথ দখল করে ব্যবসা করা হকাররা। তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে মিরপুর ১০ নম্বর হকারদের দখলমুক্ত রাখার ঘোষণা দেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। পরে ২য় বারের চেষ্টায় হোপ মার্কেট থেকে মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বর পর্যন্ত ফুটপাথ দখলমুক্ত করা হয়।
গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ৯টায় দিকে উচ্ছেদ অভিযান শুরুর কিছু সময় পরই ভেকু মেশিনে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে একটি মসজিদ মার্কেটে আগুন লাগা কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষ একপর্যায়ে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
সংঘর্ষে পুলিশ, কয়েকজন হকার ও গণমাধ্যমকর্মী আহত হয়েছেন। ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ৩০ জন হকারকে আটক করেছে পুলিশ। জানা গেছে এ ঘটনায় মিরপুর মডেল থানায় পৃথক দুইটি মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং আটক হকারদের ওই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হবে।
গতকাল মিরপুর-১০ এলাকা থেকে ১৩-১৪ নম্বরমুখী সড়কে মিরপুর আইডিয়াল স্কুল সংলগ্ন হোপ মার্কেট এলাকার বাইতুল কুদ্দুস জামে মসজিদ মার্কেটের নিচে থাকা কয়েকটি কাপড়ের দোকান, জুতা-স্যান্ডেল ও কসমেটিকসের দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এ ছাড়া এর আশপাশ এলাকার ফুটপাথে উচ্ছেদ চালানোর ফলে সড়কজুড়ে ভাঙচুর হওয়া কাচের টুকরা ও ভাঙা ইটের টুকরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। এ ছাড়া সড়কের মাঝে পুড়িয়ে দেয়া সিটি করপোরেশনের গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগে জড়িত ফ্যাসিজমের দোসরা : মিরপুরে ফুটপাথ উচ্ছেদ অভিযানে হামলা-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের পরে ঘটনাস্থলে আসে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা পরিকল্পিত। ফ্যাসিজমের দোসররা এই ঘটনা ঘটিয়েছে।
প্রশাসক শফিকুল ইসলাম বলেন, নগরবাসীর নির্বিঘেœ চলাচল নিশ্চিত করতে ফুটপাথ দখলমুক্ত করার অভিযান অব্যাহত থাকবে। দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাথ দখল করে রেখেছিল যারা, তারা ও তাদের ইন্ধনে সিটি করপোরেশনের পরিবহন, সাংবাদিকসহ কিছু পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা হয়েছে। পরে স্থানীয় সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের মুখে হামলাকারীরা সরে যেতে বাধ্য হন। হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে উল্লেখ করে ডিএনসিসির প্রশাসক বলেন, যারা এই অরাজকতার সাথে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মামলা হবে। তদন্ত করে তাদের অবিলম্বে গ্রেফতার করতে হবে। অবৈধভাবে কাউকে এখানে ফুটপাথ দখল করতে দেয়া হবে না।
পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটের সমন্বয়ের অভাবে সংঘর্ষ : উচ্ছেদ অভিযানে হামলা, গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ সংক্রন্ত এক প্রশ্নের জব্বাবে গতকাল দুপুরে সচিবলায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটের সমন্বয়ের অভাব ছিল। আমি জেনেছি এখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত যিনি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন, তারা সঠিকভাবে পুলিশের সাথে যোগাযোগ করেননি। এটা একটা সমন্বয়ের অভাব ছিল বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। তারপরও আমরা তদন্ত করতে দিয়েছি।
সিটি করপোরেশনের ৩ গাড়িতে আগুন : গতকাল সকাল ১০টায় উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে হকারদের সাথে পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের কর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় সিটি করপোরেশনের তিনটি গাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে বলে জানায় পুলিশ। উচ্ছেদ অভিযানে মালামাল জব্দ করা সিটি করপোরেশনের দুইটি ট্রাক ও একটি ভেকুতে আগুনে দেয় হকাররা। পরে ফায়ার সার্ভিসের দুইটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে নেয়। এ সময় পুলিশ ও সাংবাদিকের গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার বলেন, ‘পুলিশের একটি গাড়ির গ্লাস ভাঙচুর করা হয়। সেই সাথে সিটি করপোরেশনের গাড়িতে আগুনের ঘটনাও আছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের অর্ধশতাধিক সদস্য মোতায়ন করা হয়েছিলো।
‘ভিডিও করছে’ বলেই সাংবাদিকদের ওপরে হামলা : অভিযানকালে হকাররা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলে এবং একপর্যায়ে সাংবাদিকার ভিডিও ধারণ করলে তাদের ওপরে হামলা চালানো হয়। একাধিক আহত সাংবাদিক জানিয়েছেন, ‘ওই সময় হকাররা বলে- এক দিকে আমাগো সব শেষ, অন্য দিকে আপনারা ভিডিও করছেন, এই বলেই সাংবাদিকদের ওপরে হামলা চালানো হয়।’
বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘একাত্তরের সাংবাদিক তানভীর সুমন বলেন, ‘আমাকে দীর্ঘ সময় ঘিরে রেখেছিল। তবে হকারদের একটি অংশের সহায়তাতেই সেখান থেকে বের হতে পারি। তবে যমুনা টেলিভিশনের গাড়ি ভাঙচুর করেন হকাররা; তারা সময় টিভির রিপোর্টার এবং ক্যামেরাম্যানকে ধাওয়া দেয়, একপর্যায়ে দুইজনকে মারধরও করা হয়। প্রথম আলোর ফটো সাংবাদিকের ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয়, পরে অবশ্য ফেরতও দেয়।’ এ দিকে হামলায় সাংবাদিকেরা আহত হওয়ায় তাদের পাশে থাকার কথা জানিয়ে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের অনেকে ইতোমধ্যে চিহ্নিত হয়েছে। পুলিশ তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।
সংঘর্ষের পর আবার উচ্ছেদ : ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর গতকাল দুপুর ২টা ২০ মিনিটে আবার শুরু হয় উচ্ছেদ অভিযান। চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। এ সময় পুলিশ, এসআরবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি দেখা গেছে। মিরপুর ১০ নম্বর চত্বরের পাশের সকল ফুটপাথ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। তবে সেখানকার সব ফুটপাথে দোকানিরা আগে থেকে তাদের মালামাল সরিয়ে নিয়ে যায়। পুরনো কাঠের চকি ছাড়া সবই আগেভাগে সরিয়ে ফেলা হয়।
উচ্ছেদের জায়গা পরিণত হয়েছে অটোরিকশা স্ট্যান্ড : উচ্ছেদের পরই খালি জায়গায় শত শত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা জমা হতে দেখা যায়। মিরপুর সরকারি গার্লস স্কুলের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সজল বলেন, ‘৫ লাইনের এই সড়কে ফুটপাথের দোকান এমনভাবে বসত একটি গাড়িও যেতে পারত না। এমনও দেখা যায় রাস্তা বন্ধ করে দোকান বসিয়ে দিত। এখন রাস্তাটা কত সুন্দর লাগছে। উচ্ছেদ না হলে এখানে এত বড় রাস্তা ছিল তা বুঝতেই পারতাম না। কিন্তু এখন আবার অটোরিকশায় রাস্তার দুই পাশ মনে হচ্ছে এটা কোনো স্টেশন।’ উচ্ছেদ অভিযানের পাশেই দাঁড়িয়ে স্থানীয় বাসিন্দা মারুফ হোসাইন বলেন, ‘হকাররা ফুটপাথ ছাড়িয়ে রাস্তার মাঝে দোকান বসাত। ফলে এই জায়গাটা সবসময় যানজট লেগে থাকত। মানুষের ভোগান্তির কোনো শেষ ছিল না। উচ্ছেদের পর জায়গাটা সুন্দর লাগছে। রাস্তা দেখে মনে প্রশান্তি লাগছে।’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরো বলেন, এই ফুটপাথ মুক্ত জায়গাটি এক সপ্তাহও ফাঁকা থাকবে না। আবার দখল হয়ে যাবে। সব সময় যদি এমন খোলামেলা থাকত তাহলে কতই না ভালো হতো।
ফুটপাথের জব্দকৃত মালামাল লুট : ফুটপাথের জুতার দোকানি ইসমাইল জানান, ‘গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে মিরপুরে উচ্ছেদ অভিযান হচ্ছে। উচ্ছেদের নামে সিটি করপোরেশনের লোকেরা মালামাল জব্দ করেন। পরে সেই মালামাল ফের নিলামে আমাদের কাছেই বিক্রি করেন। তাহলে এটাকে উচ্ছেদ না বলে গরিবদের মাল লুট করা হচ্ছে বলতে পারি।’ একই কথা বলেন মেয়েদের কাপড় বিক্রয়কর্মী খাদিজাও।





