নিজস্ব প্রতিবেদক

আওয়ামী লীগ শাসনামলে ঘটে যাওয়া শতাধিক গুম ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও র‌্যাবের সাবেক শীর্ষ কমান্ডার মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসানের বিচারিক প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। আসামির বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা তিনটি সুনির্দিষ্ট অপরাধের প্রতিটি অভিযোগই ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত’ হয়েছে বলে দাবি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।
গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে এ মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে ১৫তম সাক্ষী তথা তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) মো: রফিকুল ইসলামের জবানবন্দী উপস্থাপন শুরু হয়। তদন্ত কর্মকর্তার জবানবন্দী আংশিক গৃহীত হওয়ায় অবশিষ্ট জবানবন্দী গ্রহণের জন্য আগামী ৪ অক্টোবর দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। এর আগে গতকাল সকালে প্রথাগত আইনি ও নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আসামি জিয়াউল আহসানকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। দিনভর মামলার ১৪তম সাক্ষী এবং আলামত জব্দ তালিকার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী কামরুল ইসলামকে দীর্ঘ জেরা করেন আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী সাহিদুর রহমান। একই সাথে গত ২৭ সেপ্টেম্বর ১৩তম সাক্ষী হিসেবে র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তা মেজর (অব:) সাব্বির রহমানের সাক্ষ্যদান ও জেরা শেষ হয় যাকে প্রসিকিউশন তাদের ‘সর্বশেষ চাক্ষুষ সাক্ষী’ হিসেবে অভিহিত করেছে। 
বিচারিক কার্যক্রম শেষে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম জানান, রাষ্ট্রপক্ষ তাদের ১৫ জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর জবানবন্দী ও নথিপত্রের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালের সামনে আসামি জিয়াউল আহসানের সরাসরি অপরাধমূলক সম্পৃক্ততা ও কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি শতভাগ প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, তদন্ত কর্মকর্তা তার জবানবন্দীতে কিভাবে দেশজুড়ে সুসংগঠিত তদন্ত পরিচালনা করেছেন, কার কার সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন এবং কিভাবে ডিজিটাল ও ভৌত আলামত সংগৃহীত হয়েছে তা বিস্তারিত তুলে ধরছেন। এই মামলায় দেশের সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়াসহ সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে ঐতিহাসিক সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের সাক্ষ্যে তৎকালীন র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) ভেতরে আইনি কাঠামো ভেঙে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের অপসংস্কৃতি কিভাবে গড়ে উঠেছিল এবং তৎকালীন ঊর্ধ্বতন পদে আসীন থেকে জিয়াউল আহসান কিভাবে এক ভয়ঙ্কর ভূমিকা পালন করেছিলেন, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ উঠে এসেছে।
অন্য দিকে বিচার চলাকালে আসামিপক্ষের আইনজীবী সাহিদুর রহমান জব্দ তালিকার সাক্ষী কামরুল ইসলামকে জেরার মাধ্যমে প্রসিকিউশনের সংগৃহীত আলামতের আইনি বৈধতা, স্থানিক ধারাবাহিকতা এবং আলামত সংগ্রহের সময়ানুক্রমিক শৃঙ্খলা  নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আসামিপক্ষের দাবি, যেসব আলামত ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়েছে, তা আইনি মানদণ্ডে আসামির সরাসরি অপরাধমূলক অভিপ্রায়ের সাথে বস্তুনিষ্ঠ সংযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং আসামি বিচারে পূর্ণ খালাস পাওয়ার যোগ্য।
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ (২০২৪ সালের সংশোধনীসহ)-এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী আসামির বিরুদ্ধে মূল তিনটি সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধের চার্জ গঠন করা হয়েছে। প্রথম অভিযোগে ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাতে গাজীপুর সদর থানার পুবাইলে সড়কের পাশে আসামির সরাসরি উপস্থিতিতে সজলসহ তিনজনকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয় অভিযোগে ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী খালঘেঁষা বলেশ্বর নদীর মোহনায় সাবেক র‌্যাব কর্মকর্তা হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নজরুল ও মল্লিকসহ ৫০ জন মানুষকে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে গুম ও হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। তৃতীয় অভিযোগে একই সময়কালে বরগুনার বলেশ্বর নদী ও বাগেরহাটের শরণখোলায় সুন্দরবনের বিস্তৃত অঞ্চলে তথাকথিত ‘বনদস্যু দমন’ অভিযানের আড়ালে মাসুদসহ আরও ৫০ জন নিরপরাধ ব্যক্তির পরিকল্পিত প্রাণহানির দায় যুক্ত রয়েছে।
বিগত সরকারের আমলে সংঘটিত এই সুসংগঠিত অপরাধগুলোর বিচারে আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল কোর্টের (আইসিসি) রোম সংবিধির ৭ অনুচ্ছেদে বর্ণিত বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ব্যাপক ও পরিকল্পিত আক্রমণ-এর আইনি নীতি অনুসৃত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিচারিক মানদণ্ড ও দেশীয় আইনের সমন্বয়ে ট্রাইব্যুনাল প্রতিটি সাক্ষ্য ও জেরার আইনি শুদ্ধতা নিশ্চিত করছেন।
আগামী ৪ অক্টোবর তদন্ত কর্মকর্তার জবানবন্দী উপস্থাপন শেষ হলে প্রসিকিউশন পক্ষ তাদের সাক্ষ্যগ্রহণ আনুষ্ঠানিক ও চূড়ান্তভাবে সমাপ্ত ঘোষণা করবে। এরপর আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের প্রাসঙ্গিক ধারা অনুযায়ী আসামিপক্ষকে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের জন্য ‘সাফাই সাক্ষী’ উপস্থাপনের সুযোগ দেয়া হবে। আসামিপক্ষের সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণ বা তাদের সিদ্ধান্তের পর উভয় পক্ষের সমাপনী যুক্তিতর্ক শুরু হবে। প্রসিকিউশন আশা প্রকাশ করেছে, সব আইনি প্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করে অক্টোবর মাসের মধ্যেই এই ঐতিহাসিক মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার সার্বিক বিচারিক রায় ঘোষণা করা সম্ভব হবে, যার মাধ্যমে আইন অনুযায়ী পরবর্তী উচ্চতর আপিল প্রক্রিয়ার পথ উন্মুক্ত থাকবে।