নিজস্ব প্রতিবেদক

পুঁজিবাজারকে তার সত্যিকার চরিত্রে দেখতে চাইলে এটিকে খুচরা বিনিয়োগকারী নয় বরং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগনির্ভর করে গড়ে তুলতে হবে বলে মত প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সাথে পুঁজিবাজারের প্রতিটি স্তরে শতভাগ অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশন করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) সুবর্ণজয়ন্তী (৫০ বছর পূর্তি) ও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান, অর্থসচিব মো: খায়েরুজ্জামান মজুমদার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা  মোবারক। এতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৬ সালে অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইসিবি প্রতিষ্ঠার মূল ল্য ছিল  দেশে মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বাজারভিত্তিক পুঁজিবাজার গড়ে তোলা। সাধারণ মানুষের সঞ্চয় আইসিবির মাধ্যমে মূলধন বাজারে এনে জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ নিশ্চিত করাই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত রিটেইল বা খুচরা বিনিয়োগকারী নির্ভর। অথচ বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের ক্যাপিটাল মার্কেট বা পুঁজিবাজার প্রধানত ইনস্টিটিউশনাল বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তাই বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে রিটেইল-বেসড বা খুচরাভিত্তিক অবস্থা  থেকে ইনস্টিটিউশনাল-বেসড বা প্রাতিষ্ঠানিকভিত্তিক বাজারে রূপান্তরে আইসিবিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনসহ (এসইসি) আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পদে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়াই নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। সরকারের নীতিগত অবস্থান অনুযায়ী,  কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া হবে না।
পুঁজিবাজারের ডিজিটাল রূপান্তরের বিষয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এসইসি, স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্রোকারেজ হাউজ এবং আইসিবিসহ পুঁজিবাজারের প্রতিটি স্তরে শতভাগ অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশন বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। ‘নো পেপার ট্রানজেকশন, নাথিং  পেপার’ নীতি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, এখন থেকে লিস্টিং আবেদন, অনুমোদন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন করতে হবে।
সম্প্রতি নিউ ইয়র্কে ওয়াল স্ট্রিটে বিশ্বের বড় ১৫টি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর প্রাতঃরাশ বৈঠকের প্রসঙ্গ তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ও অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়ে আস্থা প্রকাশ করেছেন। প্রাইভেট ফান্ড, কাইমেট ফান্ডিং ও ডেরিভেটিভস পণ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশে বৈশ্বিক পুঁজি আনার পরিবেশ  তৈরি হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, একসময় আইসিবির তেমন  কোনো প্রতিযোগী ছিল না। কিন্তু এখন অনেক প্রতিষ্ঠান হয়ে গেছে। প্রতিযোগিতা  বেড়েছে। এমন অবস্থায় টিকে থাকতে তাদের আরো পেশাদার হতে হবে। বিশেষ করে দু’টি বিষয়ে তাদের গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। প্রথমত পোর্টফোলিও রিব্যালেন্সিং করা খুবই জরুরি।  পোর্টফোলিওতে অনেক শেয়ার আছে,  যেগুলোর দাম অনেক কমে গেছে এবং আপাপত বাড়ার সম্ভাবনা কম। সেগুলো বিক্রি করে সম্ভাবনাময় শেয়ারে বিনিয়োগ করতে হবে, নইলে অনেক সুযোগ হয়তো হাতছাড়া হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ও প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে।
অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, দেশের পুঁজিবাজার, শিল্পায়ন ও অর্থনীতিতে আইসিবির অনেক ভূমিকা আছে। পুঁজিবাজারে অনেক পণ্য ও সেবা আইসিবির হাত ধরে চালু হয়েছে। মাঝখানে কয়েক বছর কিছু ভুল সিদ্ধান্ত ও অনিয়মের কারণে এক সময়ের শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানটি বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি যত টাকা পরিচালন মুনাফা করে, তার দ্বিগুণ সুদ গুনতে হয়। তাই প্রতি বছর নিট লোকসান গুনতে হবে। এ অবস্থার উত্তরণে মূলধন পুনর্গঠন ও বিশেষ তহবিল জরুরি। তিনি বলেন,  দেশের পুঁজিবাজার ও অর্থনীতির স্বার্থে আইসিবির মতো প্রতিষ্ঠানের বেঁচে থাকা প্রয়োজন। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার এ বাস্তবতায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।