নয়া দিগন্ত ডেস্ক
বারংবার সামরিক আক্রমণের মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বজায় রাখা কূটনৈতিক আলোচনার পথ থেকে ইরান কখনোই পিছু হটবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি উদ্যোক্তাদের এক বিশেষ সমাবেশে ভাষণদানকালে পেজেশকিয়ান পুনর্ব্যক্ত করেন যে, তেহরানের বর্তমান প্রশাসন বাণিজ্য খাতের সার্বিক জটিলতা ও বাধা নিরসনে আন্তরিকতা প্রদর্শন করছে। ইরানি প্রেসিডেন্ট বলেন, ওয়াশিংটন একের পর এক তিনবার হামলা চালিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলেও ইরান কখনোই আলোচনার পথ ত্যাগ করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না। দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতিটি স্তরে বর্তমানে সমন্বয় ও ঐক্য বজায় রয়েছে এবং ঘাটতিগুলো কাটিয়ে উঠতে যৌথ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে। তিনি আরো উল্লেখ করেন, সমুদ্রপথে আরোপিত নানা বিধিনিষেধ সত্ত্বেও আঞ্চলিক অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে পাকিস্তান, ইরাক, তুর্কমেনিস্তান ও আজারবাইজানের সাথে স্থলপথে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের উদ্ধৃতি দিয়ে তাসনিম বার্তা সংস্থা জানিয়েছে যে, আলোচনার সময় তিনবার হামলার শিকার হওয়া সত্ত্বেও ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সংলাপের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ অবসানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ঘিরে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়ার মধ্যেই এই মন্তব্যগুলো এলো। যদিও কাতার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরো আলোচনার পথ সুগম করেছে, তবুও রয়টার্সের খবর অনুযায়ী ইরানি কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, কূটনৈতিক সমাধানের সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম।
রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, এর পরিবর্তে তেহরান আরো ব্যাপক ও জোরালো পাল্টা পদপে নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেÑ যদি যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় বড় আকারের সামরিক হামলা শুরু করে। বার্তা সংস্থাটি সরকারের উচ্চপদস্থ সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে আরো জানায় যে, ইরানি কর্মকর্তারা সম্ভাব্য নতুন যেসব ল্যবস্তু বিবেচনা করছেন, সেগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও হতে পারে।
এ দিকে চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয় যে, ইরান তার সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাড়া পেয়েছে। ওই প্রস্তাবে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া এবং অন্যান্য শর্ত পূরণের বিনিময়ে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান এখন ওয়াশিংটনের সেই প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করছে।
বার্তা সংস্থাটি ইরানি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, ওয়াশিংটন চায় ইরান যেন আলোচনায় তার পারমাণবিক সমতার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করে; কিন্তু তেহরান অনড় অবস্থানে রয়েছে যে, যুদ্ধবিরতির অন্যান্য শর্ত পূরণ হওয়ার পরই কেবল পারমাণবিক বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার পরিকল্পনা বেছে নিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে অবরোধ ও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ। এসব পদেেপর প্রভাব ইরানের অর্থনীতির ওপর পড়তে শুরু করেছে বলে মনে হচ্ছে; কারণ এই সপ্তাহে দেশটির মুদ্রার মান রেকর্ড সর্বনিম্নে নেমে গেছে।
কূটনীতি এবং উত্তেজনা বৃদ্ধি
তবে তেহরান একটি বৃহত্তর যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলেও আলোচনার পথ খোলা রাখছে। ইরানের এই হিসাবের পেছনে দ্বিতীয় একটি উদ্বেগ রয়েছে : যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের অধীনে দীর্ঘস্থায়ী সঙ্ঘাত তার অর্থনীতি সহ্য করতে পারবে কি না। এই অবরোধ দেশটির আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস তেল রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক দুর্দশা ইতোমধ্যে সাধারণ ইরানিদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করেছে।
গত সপ্তাহে নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসঙ্ঘের সাধারণ অধিবেশনে, তেহরান কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে একটি প্রস্তাব পেশ করেছে। প্রস্তাবটি গৃহীত হলে, সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়া এবং অঞ্চলজুড়ে সঙ্ঘাত বন্ধ করা সম্ভব হবে। ইরানি কর্তৃপ জানিয়েছে, এই প্রস্তাবে যুদ্ধ বন্ধ করা, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ তুলে নেয়া, ইরানের জব্দকৃত কমপে ১২ বিলিয়ন ডলার তহবিল ছাড় করা এবং তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার কথা বলা হয়েছে। শনিবার ট্রাম্প বলেছেন, তিনি প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, মঙ্গলবার কাতারের মাধ্যমে তেহরানের কাছে একটি মার্কিন জবাব পাঠানো হয়েছে এবং সেটি এখন পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। ইরানি সূত্র জানিয়েছে, ওয়াশিংটন চায় ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত হোক; কিন্তু তেহরান জোর দিয়ে বলছে যে, তাদের সাতটি শর্ত পূরণ হওয়ার পরেই কেবল পারমাণবিক আলোচনা শুরু হতে পারে, তার আগে নয়।
‘এমনকি ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া জবাবটি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান না-ও করে এবং পরো আলোচনা চলতে থাকে, তবুও উভয় পরে মধ্যে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা খুবই কম,’ বলেছেন একজন কর্মকর্তা। ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান কর্মসূচির পরিচালক অ্যালেক্স ভাটানকা বলেছেন, কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনা সীমিতই রয়ে গেছে।
ভাটানকা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অব্যাহত রাখার ধকল ইরান সইতে পারবে না; কারণ এটি পরিস্থিতি আমূল বদলে দিতে পারে এবং কার্যত দেশটির শাসনব্যবস্থার শ্বাস রোধ করে ফেলতে পারে... এই পর্যায়ে সঙ্ঘাত আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
আরেকটি যুদ্ধের মাশুল
সঙ্ঘাত শুরুর পর থেকে কখনো বিরতি আবার কখনো নতুন করে হামলাÑ এভাবেই পরিস্থিতি চলেছে; এতে হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছে, ইরানের সামরিক সমতা হ্রাস পেয়েছে এবং দেশটির আগে থেকেই ভঙ্গুর অর্থনীতি তিগ্রস্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের েেত্র, ট্রাম্পের পরিবর্তনশীল ল্যগুলো অর্জনে এই যুদ্ধ ব্যর্থ হয়েছে এবং একই সাথে পেন্টাগনের পেণাস্ত্রের মজুদও ফুরিয়ে এসেছে। ইরান ও তার মিত্ররা পুরো অঞ্চলে সঙ্ঘাত ছড়িয়ে দিয়ে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল সরবরাহ ব্যাহত করে এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারের ঝুঁকি বাড়িয়ে ওয়াশিংটনের জন্য যুদ্ধের খরচ বা মাশুল বাড়িয়ে তোলার চেষ্টা করেছে।
ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর ড্রোন ও পেণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, আর ইয়েমেনে তাদের মিত্র হাউছিরা সৌদি স্বার্থকে ল্যবস্তু করেছে। বাবুল-মান্দেব প্রণালীর দিকে হাউছিদের অগ্রযাত্রা বিশ্ব জ্বালানি রুটে চাপের আরেকটি কেন্দ্র তৈরি করেছে, যার ফলে লোহিত সাগরের দণি প্রবেশপথের ওপর ইরান-ঘনিষ্ঠ এই গোষ্ঠীটি বাড়তি সুবিধা বা নিয়ন্ত্রণ লাভ করেছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, সামরিক চাপ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার যৌথ প্রভাব সামলানো ইরানের ধর্মীয় শাসকদের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।





