নিজস্ব প্রতিবেদক

১০ মাসের ফুটফুটে সন্তানকে কোলে নেয়ার অদম্য আকুতি আর ছুটির আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন হাফিজুর রহমান (৩৫); কিন্তু ঘাতক ছিনতাইকারীদের নিষ্ঠুরতায় সেই সন্তানকে আর স্পর্শ করা হলো না বাবার। চলন্ত ট্রেনের ছাদে ব্যবহৃত একটি আইফোন ও সামান্য কিছু টাকার জন্য ছিনতাইকারীদের ধস্তাধস্তির শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে হলো এই যুবককে। ছিনতাইকারীরা চলন্ত ট্রেন থেকে নিচে ফেলে দিলে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
নিহত হাফিজুর রহমান বাগেরহাট জেলার চিতলমারী থানার চিঙ্গরী গ্রামের মৃত আব্দুর রহমানের ছেলে। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তিনি গাজীপুরের সালনা এলাকার একটি রিসোর্ট কোম্পানিতে চাকরি করতেন। 
নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ১০ মাসের শিশু সন্তানকে দেখার উদ্দেশ্যে বুধবার কর্মস্থল থেকে দুই দিনের ছুটি পান হাফিজুর। বিকেলে গাজীপুরের জয়দেবপুর স্টেশন থেকে ট্রেনের ভেতর জায়গা না পেয়ে কমলাপুর আসার উদ্দেশ্যে ট্রেনের ছাদে ওঠেন তিনি। পরিকল্পনা ছিল ঢাকা এসে টিকিট কেটে বাড়ি যাবেন; কিন্তু সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ট্রেনটি ক্যান্টনমেন্ট এলাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের বিপরীত পাশে পৌঁছালে চলন্ত ট্রেনের ছাদে ওঁৎ পেতে থাকা ছিনতাইকারীরা তার ওপর চড়াও হয়। তারা হাফিজুরের কাছে থাকা টাকা ও তার ব্যবহৃত আইফোনটি জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। হাফিজুর নিজের শখের মোবাইল ও টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ছিনতাইকারীদের সাথে চরম ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে ছিনতাইকারীরা তাকে নির্মমভাবে চলন্ত ট্রেনের ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেয়।
ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত অবস্থায় হাফিজকে রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখে ফয়েজ ও ফাহাদ নামের দুই পথচারী তাকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকদের পরামর্শে রাত সাড়ে ৯টার দিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ইমারজেন্সি সেন্টারে (ওসেকে) ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন হাফিজুর।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এসে ভাই হোসাইন শেখ লাশের পরিচয় শনাক্ত করেন। ভাইয়ের নিথর দেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, ‘আমার ভাইয়ের ১০ মাসের একটা বাচ্চা রয়েছে। মূলত ওই বাচ্চার মুখটা দেখার জন্যই ছুটি নিয়ে বাড়ি যাওয়ার জন্য গাজীপুর থেকে ঢাকা আসছিল। ট্রেনের ছাদে ওঠায় এই আইফোনটাই আমার ভাইয়ের জন্য কাল হলো, আইফোনের জন্যই ওকে মেরে ফেলা হলো।’
ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ হাবিবুর রহমান মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী চলন্ত ট্রেনে ছিনতাইকারীদের ধস্তাধস্তিতে ট্রেন থেকে ফেলে দেয়ায় ওই যুবকের মৃত্যু হয়েছে। সিআইডি ক্রাইম সিনকে খবর দেয়া হয়েছে এবং লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢামেকের মর্গে রাখা হয়েছে। সম্পূর্ণ ঘটনাটি ঢাকা রেলওয়ে থানাকে জানানো হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এ দিকে গত বুধবার রাজধানী শেরেবাংলা থানার আগারগাঁও বিজ্ঞান জাদুঘরের সামনে খেলার সময় প্রাইভেট কারের ধাক্কায় জিসান (৪) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে তাকে ওয়ান স্টপ ইমারজেন্সি সেন্টারে (ওসেকে) ভর্তি করা হয়। পড়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল বৃহস্পতিবার তার মৃত্যু হয়।
নিহত শিশুর দূর সম্পর্কের ফুফু রোনা জানান, দুপুরে আগারগাঁও বিজ্ঞান জাদুঘরের সামনে খেলার সময় অজ্ঞাত দ্রুতগতির একটি প্রাইভেট কার জিসানকে ধাক্কা দিলে  সে গুরুতর আহত হয়।