হামিদুল ইসলাম সরকার
দেশের উত্তরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ নির্ভরযোগ্য করা, সিস্টেম লস কমানো এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাট কমাতে একটি প্রকল্পে খরচ ধরা হয়েছে ছয় হাজার ২০০ কোটি টাকা। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ২১টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি এলাকায় বিতরণ ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে নেয়া হচ্ছে এই মেগা প্রকল্প। কিন্তু প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যতটা প্রশ্ন নেই, পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) নথিতে ততটাই নজর পড়েছে খরচের হিসাব, পরামর্শক ব্যয় এবং স্ক্যাডা ব্যবস্থার যৌক্তিকতা নিয়ে। পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সাথে সাথে রাজশাহী-রংপুর অঞ্চলে আবাসিক, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, বাণিজ্যিক ও সেচ গ্রাহকের বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। বর্তমানে ওই অঞ্চলের ২১টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংশই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। হিসাবমাফিক ২০৩৫ সালের মধ্যে সক্ষমতার চাহিদা চার হাজার ৭৫ মেগাওয়াটে উন্নীত হওয়ার কথা। সেই চাহিদা সামাল দিতে উপকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ৯ হাজার ১২০ এমভিএ করার প্রয়োজন হবে। বর্তমানে বিতরণ সক্ষমতা প্রায় আট হাজার ৪০০ এমভিএ। অর্থাৎ চাহিদা মেটাতে অতিরিক্ত সক্ষমতার প্রয়োজন ৭২০ এমভিএ। তাই এই প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের ব্যয় ছয় হাজার ১৯৬ কোটি ৪৯ লাখ ২৪ হাজার টাকা। জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩১- পাঁচ বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বাপবিবো) হবে বাস্তবায়নকারী সংস্থা। অর্থায়নে উন্নয়ন সহযোগী এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের ৩৫ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তার কথা বলা হয়েছে। এআইআইবির প্রকল্প-তথ্যেও রাজশাহী ও রংপুরের বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্কের সক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ রয়েছে। প্রশ্নটা তাই শুধু নতুন লাইন বা উপকেন্দ্র তৈরির নয়। ছয় হাজার ২০০ কোটির টাকা খরচ করে শেষ পর্যন্ত গ্রাহক কতটা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাবেন, আর সেই ফল পেতে কোন খাতে কত টাকা লাগছে- পিইসি আলোচনাটি মূলত সেই হিসাবেই আটকে রয়েছে।
২১ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, বিস্তৃত এলাকা : নথির তথ্য বলছে, প্রকল্পের আওতায় রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ২১টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি রয়েছে। রাজশাহী অংশে বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, জয়পুরহাট, নাটোর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনা অঞ্চলের বিভিন্ন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এলাকা রয়েছে। রংপুর অংশে রংপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা প্রকল্পের আওতায় রয়েছে। কাজের পরিধিও তাই যথেষ্ট বিস্তৃত। এক দিকে ৮৪টি উপকেন্দ্র, অন্য দিকে ১২ হাজার ৮০০ কিলোমিটার লাইন- দুই বিভাগে বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্কের একটি বড় অংশকেই এই প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
চাহিদা বাড়ছে, পুরনো নেটওয়ার্কে চাপ : নথির তথ্য বলছে, এই ঘাটতি ৭২০ এমভিএ মেটানোর পাশাপাশি পুরনো লাইন, উপকেন্দ্র এবং বিতরণ নেটওয়ার্ক আধুনিকীকরণ করতেই প্রকল্পটি নেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পে রয়েছে মোট ৮৪ উপকেন্দ্র, ১২ হাজার ৮০০ কিলোমিটার লাইন নির্মাণ কাজ। প্রকল্পের সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে রয়েছে বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামো।
প্রস্তাব অনুযায়ী-৩৩/১১ কেভি নতুন উপকেন্দ্র নির্মাণ হবে ৮৪টি, যার মাধ্যমে এক হাজার ১৭৬ এমভিএ সক্ষমতা বাড়ানো, নতুন ও আপগ্রেডেশন মিলিয়ে ৩৩ কেভি এবং নিম্নতর ভোল্টেজের বিতরণ লাইন নির্মাণ হবে ছয় হাজার ৫৬৬ কিলোমিটার। এলটি থেকে এইচটি লাইনে রূপান্তর করা হবে তিন হাজার ৭০০ কিলোমিটার। এইচটি ১-ফেজ থেকে ৩-ফেজে রূপান্তর করা হবে দুই হাজার ২২০ কিলোমিটার। বন্যাপ্রবণ এলাকায় বিতরণ লাইন পুনর্বাসন হবে ৩১৪ কিলোমিটার। সব মিলিয়ে মোট লাইন নির্মাণ/পুনর্গঠন ও আধুনিকায়নের পরিমাণ দাঁড়াবে ১২ হাজার ৮০০ কিলোমিটার। নদী পারাপারের জন্য নির্মাণ করা হবে ৩ সেট রিভার ক্রসিং টাওয়ার। ১ সেট স্ক্যাডা সিস্টেম স্থাপন করা হবে, যার মধ্যে রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর ১০টি উপকেন্দ্রের কন্ট্রোল ইউনিট থাকবে। নেটওয়ার্কের ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত করতে আট হাজার ১১০ সেট ফলট লোকেটর স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পের যুক্তি শুধু নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া নয়, একই সাথে পুরনো বিতরণ ব্যবস্থা পুনর্গঠন, ভোল্টেজের মান উন্নয়ন এবং ত্রুটি শনাক্তকরণের সময় কমানো।
সিস্টেম লস ৯.৩৫ থেকে ৭.৯ শতাংশে নামানো : প্রকল্পের প্রস্তাবনা নথির তথ্য বলছে, প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার সিস্টেম লস কমানো। বর্তমান সিস্টেম লস ৯.৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭.৯ শতাংশে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্য দিকে, একজন গ্রাহক গড়ে কতক্ষণ বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের মুখে পড়ছেন- তা ১ হাজার ৪৮ মিনিট থেকে ৯৪৭ মিনিটে নামানোর লক্ষ্য রাখা হয়েছে। লক্ষ্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবশ্য নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের অবকাঠামো তৈরি। নতুন উপকেন্দ্র, লাইন পুনর্গঠন, স্ক্যাডা এবং ফলট লোকেটর- এই চারটি ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই লক্ষ্য পূরণের কথা বলা হয়েছে।
অর্থের বড় অংশ লাইন ও উপকেন্দ্রে : প্রকল্পের খরচের খাতগুলোও নজর পড়ার মতো। নথির প্রধান ব্যয় বিভাজনে দেখা যাচ্ছে, উপকেন্দ্র নির্মাণে প্রায় এক হাজার ৪৮৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা, আর ১২ হাজার ৮০০ কিলোমিটার বিতরণ লাইনের উপকরণ ক্রয়ে দুই হাজার ৮০৩ কোটি ১০ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। লাইনের সাথে সংশ্লিষ্ট সিডি, ভ্যাট ও ট্যাক্সে ধরা হয়েছে ৯৬৮ কোটি ৬২ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। এ ছাড়া রিভার ক্রসিং টাওয়ার নির্মাণে ২২ কোটি ৩৮ লাখ ৯৬ হাজার টাকা, স্ক্যাডা সিস্টেম স্থাপনে ৬৭ কোটি ৪৭ লাখ ৯৮ হাজার টাকা এবং ফলট লোকেটর স্থাপনে ৫৪ কোটি ৫৩ লাখ ১১ হাজার টাকা ব্যয়ের হিসাব দেয়া হয়েছে। আর পরামর্শক সেবা খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭০ কোটি ৪৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ‘অন্যান্য’ খাতে রয়েছে ১৭৪ কোটি ৯০ লাখ ৯৭ হাজার টাকা।
ডিপিপি পুনর্গঠনে ব্যয় হ্রাস-বৃদ্ধি : প্রকল্পের ডিপিপি পুনর্গঠনের সময় ও ব্যয়ের হিসাব বদলেছে। পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, পুনর্গঠিত ডিপিপিতে সাতটি অঙ্গে মোট ১১৭ কোটি ৬৮ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। আবার ১৩টি অঙ্গে ১০২ কোটি ২০ লাখ ৮২ হাজার টাকা ব্যয় কমানো হয়েছে। অর্থাৎ এক খাতের ব্যয় বাড়িয়ে অন্য খাতে কমানোর মধ্য দিয়ে সামগ্রিক ব্যয়কে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু কশিমন বলছে, এই পরিবর্তনের যৌক্তিকতা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হোক।
কিলোমিটার ধরে পরামর্শক খরচে আপত্তি পিইসির : পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগ বলছে, বিতরণ লাইন নির্মাণের ক্ষেত্রে কিলোমিটারকে একক ধরে পরামর্শক সেবার (ইলেকট্রিক্যাল) ব্যয় প্রাক্কলন সঠিক নয়। কমিশনের বক্তব্য, পরামর্শকের ব্যয় যৌক্তিকভাবে নির্ধারণের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন অন্যান্য সংস্থা বাস্তবায়িত বা বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পে একই ধরনের কাজের জন্য যে হারে পরামর্শক ব্যয় ধরা হয়েছে, তার সাথে তুলনা করা যেতে পারে। অর্থাৎ এখানে প্রশ্ন উঠেছে-১২ হাজার ৮০০ কিলোমিটার লাইন হচ্ছে বলেই পরামর্শক খরচ সেই অনুপাতে বাড়বে কি-না। ছয় হাজার ২০০ কোটি টাকার প্রকল্পে ছোট ছোট খরচের খাতও শেষ পর্যন্ত মোট ব্যয়ে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।





