নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম 

চট্টগ্রাম বন্দরের সর্ববৃহৎ কনটেইনার টার্মিনাল এনসিটি (নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল) ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে যাচ্ছে তা অনেকটাই নিশ্চিত হওয়ার পর এবার বন্দরের সিসিটি (চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল) নিয়ে টানা-হেঁচড়া শুরু হয়েছে। এক দিকে ডিপি ওয়ার্ল্ড যেমনি সিসিটি কব্জায় নিতে চায়, তেমনি সৌদি (!) আরএসজিটিআই-ও সিসিটি নিতে চায়। আরএসজিটিআই শুধু সিসিটি নয়, বন্দরের জিসিবি (জেনারেল কার্গো বার্থ) ও বে-টার্মিনালের মাল্টিপারপাস টার্মিনালও পিপিপির আওতায় নিতে আগ্রহী। তবে এই আরএসজিটিআই মূল সৌদি আরএসজিটি কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে মেরিটাইম সংশ্লিষ্টদের কাছে। ফলে শ্রমবাজার ইস্যুকে ব্যবহার করে ভারত প্রভাবাধীন মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোকে দিয়ে দেশের কৌশলগত স্থাপনায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে কি না সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক টার্মিনাল অপারেটরগুলোর শীর্ষপদে এমনিতেই আমাদের প্রতিবেশী দেশের কর্মকর্তাদের প্রাধান্য। তাই এই তিন টার্মিনালের মাধ্যমে প্রকারান্তরে আমাদের কৌশলগত স্থাপনার ওপর প্রতিবেশী দেশটির নজরদারির সুযোগ অবারিত হচ্ছে কি না সে প্রশ্ন আসছে। তা ছাড়া অর্থনৈতিক লাভালাভকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় কৌশলগত স্থাপনার নিরাপত্তাকে খাটো করে দেখা হচ্ছে কি না- এমন প্রশ্নও উঠছে। 
গত ২৮ সেপ্টেম্বর ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কাছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় একটি চিঠি পাঠায়। এতে বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে- চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ‘সিসিটি অ্যান্ড জেনারেল কার্গো বার্থস’ ও ‘দ্য বে পোর্ট-মাল্টিপারপাস টার্মিনাল’ প্রকল্পগুলো পিপিপি পদ্ধতিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনালের (আরএসজিটিআই) আগ্রহ ব্যক্তকরণ বিষয়সংক্রান্ত। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব ফারজানা হোসেন স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে- ‘চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে আরএসজিটিআই কর্তৃক চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনালের (সিসিটি) জন্য অপারেটর হিসেবে নিয়োগের পত্রটি প্রক্রিয়াকরণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’ 
সূত্র জানিয়েছে, এর আগে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ৮ এপ্রিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে চতুর্থ বাংলাদেশ দুবাই জয়েন্ট পিপিপি প্ল্যাটফর্ম মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় বাংলাদেশের পক্ষে আশিক চৌধুরী এবং দুবাই সরকারের পোর্টস কাস্টমস অ্যান্ড ফ্রি জোনস করপোরেশনের সিইও নাছের আবদুল্লাহ আল নিয়াদি নিজ নিজ পক্ষে নেতৃত্ব দেন। ডিপি ওয়ার্ল্ডের গ্রুপ সিইও যুবরাজ নারায়ণসহ ডিপি ওয়ার্ল্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা ওই সভায় যোগ দেন। 
ওই সভায় ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটি টার্মিনালকে একটি অবিচ্ছিন্ন টার্মিনালে পরিণত করতে এর সংলগ্ন সিসিটি টার্মিনালকে আধুনিকীকরণ ও পরিচালনায় আগ্রহ প্রকাশ করে। বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশ দুবাই যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্ম-এ সিসিটি অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করতে এবং প্ল্যাটফর্মের ভবিষ্যৎ সভাগুলোতে এটিকে একটি পৃথক প্রকল্প হিসেবে আলোচনা করতে সম্মত হয় বলেও সূত্র জানায়। 
আর এবার আরএসজিটিআই সিসিটি, জিসিবি ও বে-টার্মিনালের মাল্টিপারপাস টার্মিনালে বিনিয়োগে আনুষ্ঠানিক আগ্রহ দেখাচ্ছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় আরএসজিটিআইর আগ্রহকে আমলে নিয়ে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ইতোমধ্যে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিক পত্রও দিয়েছে। শিপিং সংশ্লিষ্টদের মতে শ্রমবাজারের ইস্যু সামনে রেখে দেশ দু’টি এনসিটি-পিসিটির পাশাপাশি সিসিটিও নিতে চায়, যা রীতিমতো উদ্বেগজনক। 
শিপিং সংশ্লিষ্টরা বলছেন- এনসিটির বার্ষিক হ্যান্ডলিং ক্ষমতা ১৫ লাখ টিইইউএস। সিসিটির ক্যাপাসিটি সাত লাখ টিইইউএস। আর আরএসজিটিআইকে  ইজারা দেয়া পিসিটির ক্যাপাসিটি পাঁচ লাখ টিইইউএস। সিসিটি ও পিসিটি একক প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দিলে তাদের হাতেই চলে যাবে ১২ লাখ টিইইউএস হ্যান্ডলিংয়ের কর্তৃত্ব; যা বন্দরের বিদ্যমান কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের এক-তৃতীয়াংশের বেশি। আর ডিপি ওয়ার্ডের হাতে যাচ্ছে এনসিটির ১৫ লাখ টিইইউএস। ফলে বন্দর কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে কনটেইনার হ্যান্ডলিং বলতে কার্যত জিসিবির সামান্য অংশই থাকছে।  
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা কথা বলতে রাজি হননি। তবে একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের (পিসিটি) চুক্তিতে আরএসজিটির সাথে দেশের স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তা ছাড়া যেই প্রতিষ্ঠানের সাথে এমওইউ সই হয়েছিল সেই প্রতিষ্ঠানের সাথে শেষ পর্যন্ত চুক্তি হয়নি। চুক্তি হয়েছে নবগঠিত একটি অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের সাথে। ফলে নতুন করে কোনো উদ্যোগের ক্ষেত্রে এসব বিবেচনায় নেয়া জরুরি। 
আরএসজিটি ও আরএসজিটিআই বিতর্ক 
বন্দর সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, সরকার পিপিপির (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ) আওতায় চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনালকে (আরএসজিটিআই) একটি কনসেশন চুক্তির আওতায় পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর ইকুইপ-অপারেট অ্যান্ড ট্রান্সফার ভিত্তিতে ২২ বছরের একটি কনসেশন চুক্তির আওতায় পিসিটি পরিচালনা করছে আরএসজিটি বাংলাদেশ। চুক্তির পর ২০২৪ সালের ১০ জুন টার্মিনালটির অপারেশন কার্যক্রম শুরু করে আরএসজিটি বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানটি সৌদি আরবভিত্তিক বলা হলেও চট্টগ্রাম বন্দরে এই প্রতিষ্ঠান নিয়োজিত হয় অনেক কাটখড় পুড়িয়ে। 
শিপিং সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, পিসিটির টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগে প্রতিবেশী বৃহৎ রাষ্ট্রটির সরাসরি হস্তক্ষেপ ছিল। সূত্র মতে, সৌদি সরকারের মিনিস্ট্রি অব ইনভেস্টমেন্টের সাথে বাংলাদেশ সরকারের জি টু জি চুক্তির ভিত্তিতে পিপিপির আওতায় প্রাইভেট কোম্পানি রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালকে (আরএসজিটি) মনোনীত করা হয়। ২০১৯ সালের ৩১ জুলাই আরএসজিটির সাথে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এমওইউ সই হয়। 
জানা গেছে, আরএসজিটির মূল কোম্পানি হলো আরএসপিডিআই (রেড সি পোর্টস ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি)। তাদের ইনভেস্টমেন্ট উইং হলো আরএসজিটি যার ৮০ শতাংশ শেয়ার সৌদি কোম্পানি জেনেল ইন্ডাস্ট্রিজ ও সৌদি ইন্ডাাস্ট্রিয়াল সার্ভিস কোম্পানির স্টক লিস্টেড। ২০ শতাংশ শেয়ার মালয়েশিয়ান মাইনিং কোম্পানির (এমএমসি)। এমএমসির ওই শেয়ার চায়নার কোম্পানি কসকো উন করত জানিয়ে সূত্র দাবি করেছে এতে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রটির পক্ষ হতে সে সময় আরএসজিটিকে কাজ দিতে মানা করা হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নতুন করে লন্ডনভিত্তিক নতুন একটি কোম্পানি গঠন করে যার নাম দেয় আরএসজিটিআই (রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল)। 
জি টু জি ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি হয় সৌদি সরকারের মিনিস্ট্রি অব ইনভেস্টমেন্টের নমিনেটেড প্রাইভেট কোম্পানি রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল- আরএসজিটির সাথে। কিন্তু পিসিটি পরিচালনার জন্য আরএফপি (রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল) জমা দেয় আরএসজিটিআই। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়ে আরএফপি সাবমিটের মাত্র অল্প দিন আগেই কোম্পানিটি লন্ডনে তালিকাভুক্ত হয়।  
সূত্র আরো জানায়, আরএসজিটিআই লিড করে আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশীর কর্মকর্তারা। তা ছাড়া ২০০৯ সালে আরএসজিটি গঠিত হলেও আরএসজিটিআই গঠিত হয় ২০২২ সালের জুলাইয়ে। আর লন্ডনে তালিকাভুক্ত হয় ২০২৩ সালে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির টার্মিনাল পরিচালনার অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। জি টু জি ফ্রেম ওয়ার্ক চুক্তির সময় যে প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই ছিল না এমন প্রতিষ্ঠানকে টার্মিনাল তুলে দিতে হয়েছে প্রতিবেশী দেশের হস্তক্ষেপে- এমন অভিযোগ রয়েছে।  
অভিযোগ রয়েছে আরএসজিটিআই বিদেশ থেকে ডলার এনে এখানে বিনিয়োগ করবে সেই আশায় ডলার সঙ্কট কাটাতে তড়িঘড়ি করে একটি অসম চুক্তি সই হয়েছিল। কিন্তু চুক্তি মূল্য ২০ মিলিয়ন ডলার ছাড়া ইকুইপমেন্ট আমদানিতে আইডিবির পাশাপাশি আমাদের দেশীয় ব্যাংক এবং সরকারের ফাইন্যান্সিং উইং থেকেই অর্থসংস্থান করেছে। তা অনেকটা বাংলাদেশ থেকেই ডলার সংগ্রহ করে ইকুইপমেন্ট এনে লাভের টাকা ডলারে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার মতো বলেও সূত্র জানায়। সূত্র মতে, প্রতিষ্ঠানটি এখন অনেকটা কইয়ের তেলে কই ভাজছে।  
তা ছাড়া পুরনো এমওইউর আওতায় যেসব বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্দরের টার্মিনালগুলো ইজারা দেয়া হচ্ছে, সেসব প্র্রতিষ্ঠানের সাথে পতিত সরকারের রাঘববোয়ালদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে- এমন অভিযোগও রয়েছে।