কাওসার আজম
বাইরে তপ্ত রোদ। মাঠজুড়ে খাঁখাঁ অবস্থা। কোথাও পানির সঙ্কটে পড়ে থাকা জমি, কোথাও মৌসুমের অপেক্ষায় কৃষক। অথচ সেই একই অঞ্চলের আরেক প্রান্তে স্বচ্ছ পলিনেট হাউজের ভেতর থোকায় থোকায় আঙুর, ফুটছে জারবেরা, বেড়ে উঠছে ক্যাপসিকাম-টমেটোসহ নানা উচ্চমূল্যের ফসলের চারা। খোলা মাঠে আবার মালচিং পদ্ধতিতে ফলছে অফ সিজনের তরমুজ। আর সৌরবিদ্যুতের পাম্পে পানি উঠে সবুজ হয়ে উঠছে একসময়কার পতিত জমি। রাজশাহী, নাটোর ও নওগাঁর বরেন্দ্রভূমিতে প্রযুক্তির এমন বহুমুখী ব্যবহারে বদলাতে শুরু করেছে কৃষির চিরচেনা চিত্র। বদলাচ্ছে ফসলের মৌসুম, সেচের ধরন ও কৃষকের আয়-ব্যয়ের হিসাব। সম্প্রতি এসব এলাকা ঘুরে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
রাজশাহী সদর উপজেলার কৃষক মনিরুল ইসলামের ২০ শতকের পলিনেট হাউজ যেন সেই পরিবর্তনের জীবন্ত উদাহরণ। সারি সারি ট্রেতে বেড়ে উঠছে ক্যাপসিকাম, টমেটো, ব্রোকলি, স্কোয়াশ, স্ট্রবেরি, মেলন, শসা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রাসেলস স্প্রাউট, লেটুস ও চীনাশাকের চারা। আছে গোলাপ, জারবেরা, রজনীগন্ধা ও গাঁদার চারাও। বাইরে যখন প্রচণ্ড তাপ ও পোকামাকড়ের দাপট, তখন নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চলছে নতুন ফসলের জীবন তৈরির কাজ।
২০২৩ সালে ‘আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প’ থেকে বিনামূল্যে পলিনেট হাউজটি পান মনিরুল। প্রকল্পের প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু করেন বিভিন্ন সবজি ও ফুলের চারা উৎপাদন। মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘তিন বছরে চারা বিক্রি করে প্রায় ২৭ লাখ টাকা আয় হয়েছে। এই টাকা দিয়ে রাজশাহীর বিনোদপুরে একটি আধাপাকা বাড়ি করেছেন। পলিনেটের পাশে কয়েক বিঘা জমি লিজ নিয়ে গড়ে তুলেছেন লেবুর বাগান। লাগিয়েছেন ফলদ ও বনজ গাছও। শুধু রাজশাহী নয়, তার পলিনেট হাউজে উৎপাদিত চারা যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
পুঠিয়ার কৃষক মোমিন হোসেনও এবার পলিনেট হাউজে প্রথমবার জারবেরা ফুল চাষ করেছেন। তার ভাষায়, একেকটি জারবেরা ২০ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যায়। পলিনেটের মাধ্যমে সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করা যায় বলে ফুল উৎপাদন তুলনামূলক নিরাপদ।
তবে পলিনেট হাউজের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সাফল্যের গল্পটি রাজশাহীর দুর্গাপুরের অবসরপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোখলেছুর রহমানের। বছরখানেক আগে প্রকল্পের আওতায় পলিনেট হাউজ পেয়ে তিনি শুরু করেন আঙুর চাষ। মৌসুম শেষ হলেও সেখানে এখনো থোকায় থোকায় আঙুর ঝুলছে। গাছ থেকে আঙুর কিনতে যেমন মানুষ আসছেন, তেমনি বিক্রি হচ্ছে কলম চারা।
মোখলেছুর রহমান জানান, ইতোমধ্যে প্রায় দুই লাখ টাকার আঙুর এবং প্রায় তিন লাখ টাকার কলম চারা বিক্রি করেছেন। সব মিলিয়ে ছয় মাসে আয় হয়েছে পাঁচ লাখ টাকার বেশি। এক দফা আঙুর সংগ্রহের পর আবারো গাছে আঙুরের থোকা ধরেছে। ফলে সামনে আরো আয়ের প্রত্যাশা করছেন তিনি।
পলিনেট হাউজে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ তৈরি করা যায় বলে উচ্চমূল্যের ফসল ও চারা উৎপাদনে এর ব্যবহার বাড়ছে।
তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা ব্যবস্থাপনা, সূর্যের তীব্র রশ্মি নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষতিকর পোকার প্রবেশ ঠেকানোর সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী স্প্রিংকলার ও ড্রিপ সেচ ব্যবহার করায় পানির অপচয়ও কমানো যায়। ফলে কৃষক একই জমি ও অবকাঠামো ব্যবহার করে একাধিক ধরনের ফসল উৎপাদনের সুযোগ পাচ্ছেন।
রাজশাহীর মাঠে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির আরেক পরিবর্তনের নাম মালচিং। তপ্ত দুপুরে নিজের তরমুজ ক্ষেতে সেই পরিবর্তনের গল্প বলছিলেন রাজশাহী সরকারি কলেজের অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী মজিবুল হাসান রকি। পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষিকে ভবিষ্যৎ পেশা হিসেবে গড়ে তুলতে চান তিনি।
১৫ কাঠা জমিতে সারি সারি তরমুজের গাছ। লতাপাতার আড়ালে ঝুলছে দুই থেকে আড়াই কেজি ওজনের তরমুজ। এটি স্বাভাবিক মৌসুমের নয়; মালচিং পদ্ধতিতে অফ সিজনে উৎপাদিত।
রকি জানান, গত বছর রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনী পাওয়ার পর এবার নিজের অর্থে আট কাঠা জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। বর্তমানে প্রতি কেজি প্রায় ৬৫ টাকা অথবা প্রতি মণ দুই হাজার ৬০০ থেকে তিন হাজার টাকা দরে বিক্রি করছেন। গত বছর ১৫ কাঠা জমি থেকে আয় করেছিলেন দুই লাখ আট হাজার টাকা। চলতি বছর আট কাঠা জমি থেকেই আয় হয়েছে ৯২ হাজার টাকা। দুই বছরে মোট আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা।
প্রকল্পের মনিটরিং অফিসার মো: অনিক মাহফুজ বলেন, কৃষকদের মধ্যে মালচিং পদ্ধতির আগ্রহ বাড়ছে। প্রকল্প থেকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেয়া হচ্ছে। গত অর্থবছরে তরমুজ চাষে ছয়টি প্রদর্শনী দেয়া হয়েছিল। চলতি বছর এর প্রায় তিন গুণ কৃষক নিজস্ব অর্থায়নে এ পদ্ধতিতে চাষ করছেন। প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ এস এম হাসানুজ্জামান বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির কারণে একই জমিতে ফসলের সংখ্যা বাড়ছে। মালচিংসহ প্রযুক্তি ব্যবহারে আগে যেখানে বছরে তিনটি ফসল হতো, সেখানে অনেক জমিতে পাঁচটি পর্যন্ত ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রযুক্তির এই বিস্তারের আরেকটি বড় উদাহরণ নাটোর সদর উপজেলার খায়রুল আলম অন্তর। প্রায় ১৩০ বিঘা জমিতে পেয়ারা, আম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, গাজরসহ বিভিন্ন ফল ও সবজি উৎপাদন করছেন তিনি। প্রথমবারের মতো পলিনেট হাউজে চারা উৎপাদন করে সফলতা পেয়েছেন এই তরুণ উদ্যোক্তা। গত বছর শুধু ফুলকফির চারা বিক্রি করে আয় করেছেন প্রায় তিন লাখ টাকা। এ ছাড়া অন্যান্য চারা মিলে পাঁচ লক্ষাধিক টাকার সবজির চারা বিক্রি করেছেন। তার ক্ষেতে ফুলকপির একেকটির ওজন এক কেজি ২০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়েছে।
নাটোরের আরেক কৃষক মনির হোসেন ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রকল্পের আওতায় ক্যাপসিকাম, ফুলকপি ও পালংশাক চাষ করে প্রায় ১০ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেছেন। চলতি মৌসুমে তার পলিনেট হাউজে রয়েছে পালংশাক। মাত্র ৩৫ দিনে বিক্রির উপযোগী হবে। এ ফসল থেকে প্রায় ৫০ হাজার টাকা বিক্রির প্রত্যাশা করছেন তিনি।
বরেন্দ্রের কৃষির পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ। রাজশাহী, নওগাঁ ও নাটোরের অনেক এলাকায় ভূগর্ভের পানির স্তর নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপের সেচ এলাকা কমেছে। কোথাও বিদ্যুৎ নেই, কোথাও ডিজেলচালিত পাম্পে সেচ খরচ বেশি। ফলে বহু জমি বছরের বড় একটি সময় পড়ে থাকত। সৌর পাম্প সেই চিত্রে পরিবর্তন আনছে।
রাজশাহীর মোহনপুরের কৃষক আনারুল জানান, আগে ডিজেলচালিত পাম্পে দূরের পুকুর থেকে পাইপ দিয়ে পানি আনতে হতো। এখন সৌর পাম্পে রোদ উঠলেই পানি পাওয়া যায়। এতে প্রায় ২০ জন কৃষকের ৩০ থেকে ৩৫ বিঘা জমিতে সেচ দেয়া হচ্ছে।
কৃষক সুমনের ভাষায়, আগে এ অঞ্চলে বৃষ্টিনির্ভর আমন ধানের পাশাপাশি শীতকালীন সবজি ও ডালজাতীয় ফসল হতো। এখন আমনের সাথে বোরো ও আউশ ধান হচ্ছে। আগাম ফুলকপি, বাঁধাকপি ও টমেটোর চাষও করছেন কৃষকরা।
কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষকদের আধুনিক পদ্ধতির সাথে যুক্ত করতে রাজশাহী বিভাগে বাস্তবায়িত হচ্ছে ‘আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প (২য় সংশোধিত)’। এই প্রকল্প শেষ হচ্ছে আগামী জুনে। এই প্রকল্পের আওতায় গত দুই বছরে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ৩২টি সৌর সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়েছে বলে জানান প্রকল্প পরিচালক এস এম হাসানুজ্জামান। তিনি বলেন, সৌর পাম্পের কারণে বিদ্যুৎ বা ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমেছে এবং সেচ ব্যয় প্রায় শূন্যের কাছাকাছি এসেছে। বরেন্দ্রের পানিসঙ্কটপূর্ণ এলাকায় যেখানে অনেক জমিতে বছরে এক-দু’টির বেশি ফসল হতো না, সেখানে এখন তিনটি ধানসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। এতে ফসলের নিবিড়তা প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানান তিনি।
প্রকল্প পরিচালক জানান, প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত ১০২টি পলিনেট হাউজে উচ্চমূল্যের ফল, আঙুর, বিভিন্ন চারা ও নিরাপদ সবজি চাষ হচ্ছে। ইতোমধ্যে শস্য নিবিড়তা ৪ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি আধুনিক জাতের ব্যবহারে বোরো ধানের ফলন ১২.৫০ শতাংশ, গমের ১১.৮৮ শতাংশ, ভুট্টার ২০.৭৭ শতাংশ, মসুরের ১৩.১১ শতাংশ ও পেঁয়াজের গড় ফলন ১৭.৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি আরো জানান, প্রকল্পের আওতায় ২৮ হাজার প্রদর্শনীর পাশাপাশি কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। ৭০ শতাংশ ভর্তুকিতে ১০ হাজার ৭৩৩টি কৃষি যন্ত্রপাতি বিতরণ করা হয়েছে। এতে বিঘাপ্রতি আলু উত্তোলন, ভুট্টা মাড়াই ও নিড়ানি খরচ ৭০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। মালচিংয়ে অফ সিজন তরমুজ ও টপওয়ার্কিংয়ে বছরব্যাপী কাটিমন আম চাষ কৃষকদের আয় বহুগুণ বাড়িয়েছে।





