বিশেষ সংবাদদাতা
ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদেশগামী ও প্রত্যাগত শ্রমিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার বেশির ভাগ যাত্রীই প্রতিনিয়ত কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও চিহ্নিত দালালদের হাতে হয়রানি ও প্রতারিত হচ্ছেন। এসবের মধ্যেও দেশের আন্তর্জাতিক মানের প্রধান এই বিমানবন্দরে যাত্রীদের সার্বক্ষণিক সেবা দেয়া হচ্ছে ভাঙ্গা ও লক্করঝক্কর মার্কা অচল ট্রলি দিয়েই।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনিক অবহেলা ও গাফিলতির কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক অপরাধের পাশাপাশি স্বর্ণ, ডলার চোরাচালান যেমন বাড়ছে, তেমনি গত দেড় বছরে এই বিমানবন্দর দিয়ে মানবপাচাসহ অনেক চাঞ্চল্যকর অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাও ঘটেছে। যদিও টার্মিনালকেন্দ্রিক অপরাধ বাড়লেও এ বিষয়ে প্রধান কর্তাব্যক্তিসহ সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে পারেনি বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় তথা সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর। ফলে প্রতিনিয়ত দেশের এই প্রধান বিমানবন্দরকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি, মানবপাচার, প্রতারণা আর জাল-জালিয়াতির ঘটনা ছাড়াও যাত্রী হয়রানি ও ভোগান্তির মাত্রা দিন দিন উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মদিনা থেকে ছেড়ে আসা একটি ফ্লাইটের ওমরা যাত্রীদের বেশির ভাগই শাহজালাল বিমানবন্দরে নেমে ট্রলি ও ব্যাগেজ নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন। এ ঘটনার পর বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদের সাথে এক যাত্রীর প্রকাশ্যে তর্কবিতর্ক হয়, যা মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে বিমানবন্দরেই ঘটে যায় লঙ্কাকাণ্ড। একই ফ্লাইটের যাত্রীকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসে লাগেজবেল্টে চরম অব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরে যাত্রীসেবা নিয়ে চরম ক্ষোভ করতে দেখা যায়। এই ঘটনার পরদিন সকালে বিমানবন্দর নিরাপত্তা বিভাগের পক্ষ থেকে ওই ফ্লাইটের যাত্রী মেজর (অব:) আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা ও মারধরের হুমকির অভিযোগে বিমানবন্দর থানায় মামলা করা হয়। এরপর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) একটি দল ওই দিন বিকেলে তাকে নিজ বাসা থেকে গ্রেফতার করে বিমানবন্দর থানায় হস্তান্তর করে।
এ দিকে মেজর (অব:) আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা ও গ্রেফতারের প্রতিবাদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল করেছে।
গতকাল শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে দীর্ঘদিন ব্যবসা করা এক ব্যবসায়ী নাম-পরিচয় গোপন রাখার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, এখনকার এয়ারপোর্ট টার্মিনালটি ‘অপরাধের আখড়ায়’ পরিণত হয়েছে। যাত্রীরা সেবার পরিবর্তে প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়ছেন। বলতে গেলে এয়ারপোর্টে এখন বিশৃঙ্খল পরিবেশ বিরাজ করছে। এরমধ্যে অধিকাংশ সময়ই যাত্রীদের লাগেজ পেতে সমস্যা হয় বলে শুনি। বিদেশগামীদের লাইন বেঁধে ইমিগ্রেশন করতে হয়। কখনো এই লাইন ইমিগ্রেশনের বাইরেও পর্যন্ত চলে যায়। আবার অনেক সময় যাত্রীরা এসে নিজেদের কাক্সিক্ষত মালামাল খুঁজে পান না। মোটকথা যাত্রীসেবার অনেকটাই হয়রানি ও দালাল দিয়ে ঘেরা থাকে।
ওই ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে আরো বলেন, বিমানবন্দর টার্মিনালে ভাড়ার গাড়িচালকরা এখন সেখানে লাখ লাখ ডলার আর রিয়ালের ব্যবসা করছেন। তারা এই কাজে সিভিল এভিয়েশন থেকে দেয়া গাড়ির কাউন্টারের পাস ব্যবহার করছেন।
গতকাল সন্ধ্যার পর হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দীর্ঘদিন ধরে বহির্গমন টার্মিনালে স্বচ্ছতার সাথে ব্যবসা করা একজন নয়া দিগন্তকে বলেন, বিমানবন্দর টার্মিনাল নিয়ে সিভিল এভিয়েশন অথোরিটি রিলেটেড কোনো ব্যবসায়ী, কর্মচারী-কর্মকর্তা নেতিবাচক মন্তব্য করলে তাদের ইজারা বাতিল করাসহ কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেয়ার নিদের্শনা দেয়া রয়েছে। যার কারণে বিমানবন্দরে চোখের সামনে শত শত সমস্যা তারা নিজ চোখে দেখলেও তা প্রকাশ করতে ভয় পাচ্ছেন।
এর মধ্যে চিহ্নিত চক্র প্রতিদিন এয়ারপোর্টের বিভিন্ন সংস্থাকে ব্যবহার করে মানবপাচারের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ভুরিভুরি অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে জনশক্তি কর্মসংস্থান ব্যুরোর বহির্গমন শাখা থেকে বিদেশগামী যেসব কর্মীর ছাড়পত্র দেয়া হচ্ছে না তাদের কন্ট্রাক্ট্রে ইমিগ্রেশন পার হওয়ার সুযোগ দেয়া হচ্ছে- এমন অভিযোগ করছেন এজেন্সির মালিকরা।
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে দুবাই, আমেরিকা, সৌদি আরবে যাতায়াত করছেন এমন এক ব্যবসায়ী দম্পতি গতকাল নয়া দিগন্তকে এখানে যাত্রী হয়রানি ও ব্যবস্থাপানার গাফিলতির চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, বিমানবন্দরে এত এত অনিয়ম, যাত্রী ভোগান্তি হচ্ছে এর মধ্যে আমরা কোনটা বলব? তারা এ প্রতিবেদককে বলেন, মেজর (অব:) আখতারুজ্জামান তো বেশি কথা কইছে, তাই তাকে ঢুকাইয়্যা দিছে। কিন্তু এই বিমানবন্দরের যাত্রীসেবা নিয়ে প্যাসেঞ্জারদের দুর্ভোগ অনেক- সেটা কমবেশি সবাই জানে। এর মধ্য অন্যতম সমস্যা হচ্ছে সময়মতো ট্রলি না পাওয়া। কখনো ব্যাগেজ আসতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টাও লাগছে। ট্রলি না পাওয়ায় অনেক যাত্রী মাথায় ব্যাগেজ নিয়ে বের হয়ে যান। তবে এখন মাথায় লাগেজ নিয়ে বের হওয়ার ঘটনা কমেছে। এককথায় বিমানবন্দরে যাত্রীরা কোনো ভালো সার্ভিসই পাচ্ছেন না কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। এ ধরনের যাত্রীসেবার বিষয়টি সিভিল এভিয়েশন অথোরিটির হাতে রাখার কোনো মানেই নেই। কারণ বিমানবন্দরের টয়লেটে গেলে টিস্যু ও পর্যাপ্ত পানি মেলে না। ময়লা পড়ে থাকে।
ওই দম্পতির অভিযোগ, পৃথিবীর কোনো দেশ, এমনকি ভারতের আগরতলা বিমানবন্দরেও এখন উড়োজাহাজে সিঁড়ি লাগিয়ে যাত্রীদের নামিয়ে আনা হয় না। অথচ আমাদের দেশেই কেবল এখনো যাত্রীদের সিঁড়ি দিয়ে ট্যাক্সিওয়েতে নামিয়ে বাসে তুলে টার্মিনালে আনা হয়। এটা কোনো সার্ভিস হলো? পৃথিবীর সব দেশের এয়ারপোর্টে ট্রলি অ্যাভাইলেবেল, শুধু ব্যতিক্রম আমাদের ঢাকার শাহজালাল এয়ারপোর্ট। এখানে যেসব এয়ারক্রাফট বোর্ডিং ব্রিজে থামে সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি বিদেশী এয়ারলাইন্সকে বেশি সুবিধা দেয়া হয়। বিনিময়ে সিভিল এভিয়েশনের কিছু ব্যক্তি ওইসব এয়ারলাইন্স থেকে ফ্রি টিকেট, দামি গিফটসহ বছরে অন্যান্য সুবিধা পেয়ে থাকেন। এমনিতেও এয়ারপোর্টে যাত্রীদের ভালো যাত্রীসেবা পেতে হলে ঘুষ ছাড়া বিকল্প নেই। ঘুষ দিলে সেবা মেলে। প্রতি মুহূর্তেই সেখানে ঘুষ আর ঘুষ। পাস ছাড়া যাত্রীর লোকজনের এয়ারপোর্টের ভেতরে ঢোকার নিয়ম না থাকলেও হরহামেশা টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে তা ঘটছে। এসব দেখার দায়িত্ব যার সেই বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক বা তার অধিনস্ত কারো বিরুদ্ধে অদ্যাবধি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানতে পারেনি ভুক্তভোগী যাত্রীরা।
এদিক নির্বাহী পরিচালকের দফতর থেকে পাওয়া তথ্য জানা গেছে, বর্তমানে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মোট ৩ হাজার ৯৯০টি ট্রলি আছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩০০টি ট্রলি সচল রয়েছে। এছাড়া অচল ট্রলিগুলো নিয়মিতভাবে মেরামত করে ব্যবহার উপযোগী করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের হিসাবে বর্তমানে ৬৯০টি ট্রলি অচল রয়েছে এখানে। এই অচল ভাঙা ট্রলি দিয়েই দেশী-বিদেশী যাত্রীদের প্রতিনিয়ত সেবা দেয়া হচ্ছে। অথচ ট্রলি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে নিয়োগ পেয়েছিলেন নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ। তার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে অদ্যাবধি বিমানবন্দর দিয়ে যাত্রীরা খুব একটা সেবা পাননি বলে একাধিকবার খবরের শিরোনাম হয়েছেন। এর মধ্যে এই এয়ারপোর্ট ব্যবহার করেই স্ক্যানিং মেশিন ফাঁকি দিয়ে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া ও অশিয়ান সিটির চেয়ারম্যানের দেশ ত্যাগের ঘটানাও ওই সময় আলোচিত হয়েছিল। তারা দু’জনই গুলিভর্তি ব্যাগ নিয়ে এয়ারপোর্টের নিরাপত্তা স্ক্যানিং তল্লাশি অতিক্রম করেছিলেন। এই দু’টি ঘটনা প্রকাশ্যে নজরে এলেও এমন আরো কয়টি ঘটনা এখনো অজানা রয়েছে তা নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। এমন প্রশ্ন জাগছে সাধারণ যাত্রীদের মনে।
সূত্র জানিয়েছে, বিমানবন্দরের বর্তমান সার্বিক বিষয় নিয়ে আজ (রোববার) দুপুরের পর সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ একটি সংবাদ সম্মেলন করার চিন্তা করছেন।
ট্রলি সঙ্কট, যাত্রী হয়রানিসহ সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে গতকাল রাত ৭টা ২৪ মিনিটে শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি কল রিসিভ করেননি।





