নিজস্ব প্রতিবেদক 

জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আল্লাহর ওহির ওপর হাত দেয়ার এখতিয়ার কোনো মাখলুকের থাকতে পারে না। যখনই আল্লাহর ওহির ওপর হাত দেয়া হয়েছে, তখনই দুনিয়া হেদায়েত ও সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে। তিনি বলেন,  একমাত্র কিতাব, যার দাড়ি-কমা বা হরফ-হরকত, কোনো কিছুর সামান্য কোনো পরিবর্তন হয় নাই এবং ইনশাআল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত হবে না। 
গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর আইডিবি মুক্তিযোদ্ধা মিলনায়তলে কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ও মুফাসসির সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে কুরআন ও সুন্নাহবিরোধী আইন করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আলেমদের মুসলিম উম্মাহর অধিকার আদায়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ দেশের আইন রচনা, পরিমার্জন, পরিবর্তন ও কর্তনের কাজ করে। জাতীয় সংসদের যেকোনো বিষয় পাস করার অধিকার রয়েছে। আল্লাহর ওহির ওপর হাত দেয়ার এখতিয়ার কোনো মাখলুকের থাকতে পারে না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ ভালো নেই, দেশের মানুষও ভালো নেই। সামাজিক ও ব্যক্তিগতভাবে জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে মানুষ শঙ্কিত। তিনি বলেন, আলেমদের শুধু মিম্বারের দায়িত্ব নিলেই চলবে না। নামাজের ইমামতির পাশাপাশি আলেমদের সমাজের ইমামতির দায়িত্ব নিতে হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দুই-একজনের ভুলের কারণে পুরো আলেম সমাজের ভাব মর্যাদা যেন নষ্ট না হয়, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন,  যাদের চরিত্র কালো, ওখান থেকে খুঁজে পাবেন না কিছুই আপনি ভালো। কিন্তু যার চরিত্র ভালো, ওখানে একটু হালকা দাগ লাগলেই দেখা যাবে কালো। কেয়ারফুল হতে হবে এই জায়গাটায়।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় জন্মভূমি। দেশ মোটেই ভালো নেই। মানুষ বড় কষ্টে আছে। শুধু খাওয়া-পরার দিক থেকেই নয়, ইজ্জত ও জীবনের নিরাপত্তার দিক থেকেও মানুষ কষ্টে রয়েছে। কে কখন কোথায় হারিয়ে যাবে কিংবা কাকে কখন অপমান করা হবে, তার কোনো ঠিকানা নেই।
তিনি বলেন, যুগে যুগে জাতি যখন পথ হারিয়েছে, তখন উলামায়ে কেরাম জাতিকে পথ দেখিয়েছেন। তাদের সেই রাহবারের দায়িত্ব পালন করতে হবে। জাতিকে তিরস্কার করে নয়, বুকের উষ্ণ ভালোবাসা দিয়ে ইসলামের দিকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ইলমের চর্চা ও আমলের মাধ্যমে মানুষকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, প্রিয় নবী (সা:) পথভোলা মানুষকে বড় মেহেরবানী, দরদ ও দায়িত্ব নিয়ে তাওহীদের দিকে দাওয়াত দিয়েছেন। রেসালতের সত্যতা এবং আখিরাতের পরিণতির কথাও মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, নবী করিম (সা:) জন্ম থেকে ওফাত পর্যন্ত কখনো দুনিয়ার শান্তি ভোগ করেননি। বরং আল্লাহর আলমের শান্তির জন্য নিজের শান্তি উপহার দিয়েছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সমস্ত সৃষ্টির রব এবং নবী (সা:) ছিলেন সবার প্রতি দরদী। সেখান থেকে শিক্ষা নেয়ার আহ্বান জানান তিনি। 
মাওলানা আব্দুল হালিম তার বক্তব্যে বলেন অনেক ত্যাগ ও তিতিক্ষার বিনিময়ে এই মাজলিসের যাত্রা শুরু হয়েছে। জাতীয় কাউন্সিল ও সম্মেলন আজ প্রকাশ্যে অনুষ্ঠিত হলো, যা আমরা ৫ আগস্ট এর পূর্বে করতে পারিনি। মুফাসসিরদের ময়দানে কথা বলার সময় উম্মাহ, ঐক্য, দেশের সার্বভৌমত্ব এবং হেদায়েতের পথে চলার পথ নির্দেশনা দিতে হবে। ব্যক্তি, দল, গোষ্ঠী কাউকে আঘাত করে কথা বলা যাবেনা। সত্য ও সঠিক বিষয়টি হিকমা ও যুক্তির মাধ্যমে উপস্থাপন করতে হবে। 
বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীনের নব নির্বাচিত সভাপতি ও  সংসদ সদস্য অধ্যাপক মাওলানা নুরুল আমিনের সভাপতিত্বে এবং নব নিযুক্ত সেক্রেটারি মাওলানা নাসির উদ্দিন হেলালীর পরিচালনায় সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উলামা বিভাগীয় কমিটির সভাপতি মাওলানা আব্দুল হালিম, তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. খলিলুর রহমান মাদানী, কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির সদস্য ড. মাওলানা ছামিউল হক ফারুকী, মুফাসসিরে কুরআন মুফতি  ড. আবুল কালাম আজাদ বাশার, বিশিষ্ট আলেম মাওলানা কেএম আবদুস সোবাহান, ড. বিএম মফিজুর রহমান আজহারী, ড. ফয়জুল হক।
বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীনের জাতীয় কাউন্সিল বিদায়ী সভাপতি অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল হামিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে আগামী তিন বছরের জন্য (২০২৬-২০২৮) সংসদ সদস্য অধ্যাপক মাওলানা নুরুল আমিনকে সভাপতি, সাবেক ছাত্রনেতা ও মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা নাসির উদ্দিন হেলালীকে সেক্রেটারি এবং সাভারের ঐতিহ্যবাহী ইলাহ মাওলানা আবুল কালাম আজাদ আযহারীকে সাংগঠনিক সেক্রেটারি করে ২৫ সদস্যের কার্যকরী পরিষদ ও ১০১ জন সমন্বয়ে জাতীয় পরিষদ গঠন করা হয়। উল্লেখ্য যে, জাতীয় কাউন্সিলের কার্যক্রম পরিচালনা করেন যথাক্রমে ড. মাওলানা ছামিউল হক ফারুকী, অধ্যক্ষ মাওলানা মোশারফ হোসাঈন ও ড. মীম আতিকুল্লাহ। 
এ ছাড়া সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মাওলানা কামরুল ইসলাম সাঈদ আনসারী, মাওলানা আব্দুস সালাম আল মাদানী সিলেট, ড. সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ আবু নোমান চট্টগ্রাম, মিরসরাইয়ের পীর মাওলানা আব্দুল মোমেন নাসেরী, মুহাদ্দিস মাওলানা হাফেজ আবু বকর সিদ্দীক, সহকারি সেক্রেটারিদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন মাওলানা ফখরুদ্দিন আহমাদ, মাওলানা রুহুল আমিন রাজশাহী, মাওলানা মোস্তাক ফয়েজী কুমিল্লা, হাফেজ মুফতি নুরুজ্জামান নোমানী, মাওলানা মাহমুদুর রহমান দেলাওয়ার ও মাওলানা আব্দুল মান্নান আনসারী, মাওলানা এএইচএম আবুল কালাম আজাদসহ অন্যান্য উলামায়ে কেরাম। 
কাউন্সিল ও সম্মেলনে সারা দেশ থেকে আগত ৫ শতাধিক দেশবরেণ্য মুফাসসির বিভিন্ন মাদরাসার মুহাদ্দিস, মুফতি, অধ্যক্ষসহ দেশের শীর্ষ উলামা কেরাম উপস্থিত ছিলেন।