ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১ অক্টোবরের ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। মদিনা থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে দেশে ফেরার পর লাগেজ ও জমজমের পানি পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা না পাওয়া এবং পরবর্তী সময়ে সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব:) আখতারুজ্জামানের সাথে বিমানবন্দর কর্মকর্তাদের বাগি¦তণ্ডা- সবমিলিয়ে ঘটনাটি নতুন করে বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছে।
ঘটনার পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অন্য দিকে মেজর (অব:) আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে।
সেদিন কী ঘটেছিল, কেন পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলো এবং এ ঘটনার মধ্য দিয়ে বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক অধিকারের কোন প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে- তা নিয়ে দৈনিক নয়া দিগন্তের সাথে কথা বলেছেন শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো: রাশেদুল ইসলাম রাশেদ। তিনি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও অন্যতম ভুক্তভোগী।
প্রশ্ন : ১ অক্টোবরের ঘটনাটি নিয়ে এত আলোচনা হচ্ছে। শুরুতেই জানতে চাই- সেদিন আসলে কী ঘটেছিল?
রাশেদুল ইসলাম : আমরা মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন ও সৌদি আরব সফর শেষে ১ অক্টোবর দেশে ফিরছিলাম। পুরো সফরে মোট ৯টি ফ্লাইটে ভ্রমণ করেছি। চারটি দেশের বিমানবন্দরেই যথাযথ ব্যবস্থাপনা পেয়েছি। ফ্লাইট ডিলেসংক্রান্ত দু-একটি ঘটনা ছাড়া কোথাও বড় ধরনের বিড়ম্বনার মুখোমুখি হতে হয়নি।
কিন্তু নিজের মাতৃভূমিতে ফিরে ঢাকার বিমানবন্দরে নেমেই একের পর এক সমস্যার মুখোমুখি হতে হলো। সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে মদিনা থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটে ঢাকায় অবতরণ করি। কিন্তু কোনো বোর্ডিং ব্রিজ দেয়া হলো না। যাত্রীদের টার্মিনালে নেয়ার বাস সার্ভিসও ছিল অত্যন্ত নাজুক।
এরপর লাগেজের জন্য ট্রলির সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় প্রায় ৩০ মিনিট। সবমিলিয়ে লাগেজ পেতে প্রায় আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে।
প্রশ্ন : দীর্ঘ অপেক্ষার পরও কি সমস্যা শেষ হয়নি?
রাশেদুল ইসলাম : না। আসল বিড়ম্বনা তখনো বাকি ছিল। আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষার পর জানা গেল- জমজমের পানি মদিনাতেই!
একজন যাত্রী দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে দেশে ফিরে যদি আড়াই-তিন ঘণ্টা লাগেজের জন্য অপেক্ষা করেন, বিষয়টি কতটা কষ্টকর, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সাথে পরিবার, শিশু কিংবা বয়স্ক মানুষ থাকলে ভোগান্তি আরো বেড়ে যায়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো- একটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের লাগেজ কোথায় আছে, এই তথ্য জানতে যাত্রীদের প্রায় তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে কেন?
প্রশ্ন : এরপর আপনারা কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন?
রাশেদুল ইসলাম : হ্যাঁ। প্রায় তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর আমরা কর্তৃপক্ষকে ডেকে বিষয়টির ব্যাখ্যা চাই। তখন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এবং সিভিল অ্যাভিয়েশনের কর্মকর্তারা মদিনায় দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের সাথে লাউড স্পিকারে কথা বলেন।
সেখানেই জানা যায়, জমজমের পানির কনটেইনার মদিনায় রয়ে গেছে। এখানে খুব সাধারণ কয়েকটি প্রশ্ন আছে। কনটেইনার যদি সত্যিই মদিনায় থেকে গিয়ে থাকে, তাহলে ঢাকায় বিমান অবতরণের পরপরই বিষয়টি শনাক্ত হলো না কেন? আর যদি সেটি অন্য কোথাও থেকে থাকে, তাহলে যাত্রীদের এতক্ষণ অপেক্ষা করানো হলো কেন?
এটি অপারেশনাল ভুল হতে পারে, দায়িত্ব পালনে গাফিলতি হতে পারে। কিন্তু যেটাই হোক, এর জবাবদিহি প্রয়োজন।
প্রশ্ন : বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ কি তখন ঘটনাস্থলে এসেছিল?
রাশেদুল ইসলাম : একপর্যায়ে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদও আসেন। কিন্তু তখনও যাত্রীদের সামনে এমন কোনো পরিষ্কার সমাধান দেয়া সম্ভব হয়নি, যাতে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়।
স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভ তৈরি হয়। আমাদের সফরসঙ্গী সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব:) আখতারুজ্জামানও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার বক্তব্যের একটি অংশ পরবর্তীতে মামলার বিষয় হয়েছে।
প্রশ্ন : কর্তৃপক্ষ স্টকে থাকা অন্য জমজমের পানি দিয়ে তাৎক্ষণিক সমাধানের চেষ্টা করেছিল বলে জানা গেছে। আপনারা সেটি নেননি কেন?
রাশেদুল ইসলাম : আমাদের বলা হয়েছিল স্টকে থাকা পানি দিয়ে সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান করা হবে। কিন্তু আমরা নিজেদের ট্যাগ নম্বরের পানি ছাড়া অন্য কারও পানি নিতে রাজি হইনি।
কারণ ওই পানির মালিক অন্য কোনো যাত্রী হতে পারেন। অন্যের জিনিস নিজের নামে গ্রহণ করা অন্যায়। আমরা এমন কিছু করতে চাইনি।
প্রশ্ন : শেষ পর্যন্ত কতক্ষণ পর জমজমের পানির কনটেইনারের সন্ধান পাওয়া যায়?
রাশেদুল ইসলাম : প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর কর্তৃপক্ষ জানায়- জমজমের পানির কনটেইনার পাওয়া গেছে।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়। যদি কনটেইনার মদিনায় থেকে গিয়ে থাকে, তাহলে পাঁচ ঘণ্টা পর সেটি পাওয়া গেল কিভাবে? আর যদি সেটি বিমানবন্দরেই কোথাও থেকে থাকে, তাহলে যাত্রীদের এতক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো কেন?
আমি কারও বিরুদ্ধে আগাম কোনো রায় দিতে চাই না। কিন্তু প্রশ্নগুলোর উত্তর অবশ্যই চাই।
প্রশ্ন : এরপর কী করেছিলেন আপনারা?
রাশেদুল ইসলাম : সবাই বিমানবন্দর ছেড়ে যাওয়ার পরও আমি আরো চারজন সংসদ সদস্যের সাথে ভিআইপি লাউঞ্জে থেকে যাই। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল লিখিত অভিযোগ দেয়া।
কিন্তু সেখানেও নতুন বিড়ম্বনা। নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ফরম নেই। শেষ পর্যন্ত বিমানের সাধারণ প্যাডে অভিযোগ লিখে চারজন সংসদ সদস্যের স্বাক্ষরসহ সেটি জমা দিতে হয়।
একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের অভিযোগ জানানোর জন্য নির্দিষ্ট কার্যকর ব্যবস্থা থাকবে না- এটি নিজেই একটি প্রশ্ন।
প্রশ্ন : ঘটনার পর দুই বিমান কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন। আপনি এটিকে কিভাবে দেখছেন?
রাশেদুল ইসলাম : এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ এর মাধ্যমে অন্তত এটুকু বোঝা যায় যে কর্তৃপক্ষও ঘটনাটিকে নিছক যাত্রীদের অসন্তোষ হিসেবে উড়িয়ে দেয়নি।
তবে শুধু দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। কোন পর্যায়ে ভুল হয়েছে? মদিনা থেকে ঢাকায় কনটেইনার পৌঁছানোর দায়িত্ব কার ছিল? ঢাকায় পৌঁছানোর পর সেটি গ্রহণের দায়িত্ব কার? যাত্রীদের কেন তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হলো? ভবিষ্যতে একই ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে- এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
প্রশ্ন : কিন্তু এর মধ্যেই মেজর (অব:) আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বিষয়টি কিভাবে দেখছেন?
রাশেদুল ইসলাম : মামলায় সরকারি কাজে বাধা, হুমকি, নিরাপত্তাকর্মীকে হেনস্তাসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে। কারণ সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে, আশপাশের যাত্রীরাও পুরো ঘটনার বিভিন্ন অংশ মোবাইলে ধারণ করেছেন।
তবে একই সাথে আরেকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ- কেন পরিস্থিতি এতটা উত্তপ্ত হলো? একজনের আচরণের বিচার করতে গিয়ে ঘটনার পেছনের প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে যেন আমরা ভুলে না যাই। একটি ঘটনার শেষ কয়েক মিনিট দিয়ে পুরো ঘটনা বিচার করা যায় না।
ঘটনার শুরু হয়েছিল যাত্রীদের দীর্ঘ অপেক্ষা দিয়ে। এরপর একের পর এক অস্পষ্টতা। তারপর ক্ষোভ, প্রতিবাদ এবং শেষ পর্যন্ত মামলা। পুরো ধারাবাহিকতাটি না দেখলে বিচার অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
প্রশ্ন : তাহলে কি আপনি বলতে চাইছেন, প্রতিবাদের অধিকার সঙ্কুচিত হচ্ছে?
রাশেদুল ইসলাম : একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিক প্রশ্ন করবে- এটাই স্বাভাবিক। সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে জবাব চাইবে- এটাই স্বাভাবিক। অভিযোগ করবে- এটাও স্বাভাবিক।
অবশ্যই প্রতিবাদেরও আইনগত সীমা আছে। কেউ যদি সরকারি কর্মকর্তা বা নিরাপত্তাকর্মীকে হুমকি দিয়ে থাকেন কিংবা আইন ভঙ্গ করে থাকেন, তাহলে তার জবাবদিহি থাকবে। কিন্তু সেই আইনি প্রশ্নের পাশাপাশি নাগরিকের প্রশ্ন করার অধিকারও থাকতে হবে।
সমস্যা হয় তখন, যখন প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলাটাই যেন সমস্যায় পরিণত হয়।
কর্তৃপক্ষের কাছে জবাব চাওয়া মানেই সরকারি কাজে বাধা নয়। সমালোচনা মানেই ষড়যন্ত্র নয়। রাষ্ট্রের শক্তি হলো- সে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, সমালোচনা সহ্য করতে পারে এবং নিজের ভুল স্বীকার করে সংশোধন করতে পারে।
প্রশ্ন : মেজর (অব:) আখতারুজ্জামানের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। বিষয়টি কি প্রাসঙ্গিক?
রাশেদুল ইসলাম : রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্নটি একেবারে এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই। তিনি দীর্ঘদিন বিএনপির সাথে রাজনীতি করেছেন। পরবর্তীতে বিএনপি থেকে বেরিয়ে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন।
কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন- এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের কোনো প্রভাব কি তার সাথে রাষ্ট্রীয় আচরণে পড়েছে?
তবে আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই- তিনি জামায়াতে যোগ দেয়ার কারণেই তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ আমার হাতে নেই। তাই এটিকে সত্য হিসেবে ঘোষণা করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন উঠলে সেটিও স্বচ্ছভাবে দেখা উচিত। কারণ আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় কোনো বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত নয়।
তিনি বিএনপি করুন, জামায়াত করুন, অন্য কোনো দল করুন কিংবা কোনো দলই না করুন- আইন তার জন্য একই হতে হবে। অপরাধ করে থাকলে রাজনৈতিক পরিচয় তাকে দায়মুক্তি দিতে পারে না। আবার রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন অবস্থানে থাকার কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তার সাথে ভিন্ন আচরণ করবে- এটিও গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রশ্ন : আপনি বলছেন সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রেও একই ধরনের জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকা উচিত?
রাশেদুল ইসলাম : অবশ্যই। আমরা সংসদ সদস্য ছিলাম বলে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করতে পেরেছি। কর্তৃপক্ষকে ডেকেছি। ব্যাখ্যা চেয়েছি। লিখিত অভিযোগ করেছি। কিন্তু একজন সাধারণ যাত্রী কী করবেন?
তিনি যদি তিন ঘণ্টা লাগেজের জন্য দাঁড়িয়ে থাকেন? তার লাগেজ না আসে? তার সাথে দুর্ব্যবহার করা হয়? তিনি অভিযোগ করতে চান? কোথায় যাবেন, কাকে বলবেন? অভিযোগ করার জন্য যদি নির্দিষ্ট ব্যবস্থাই না থাকে, তাহলে তার অবস্থাটা কী?
একজন সাধারণ নাগরিকের হাতে ক্ষমতা কম। তাই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব আরো বেশি।
প্রশ্ন : বিমানবন্দরের ঘটনাকে আপনি কি শুধু একটি ব্যবস্থাপনার ত্রুটি হিসেবে দেখছেন?
রাশেদুল ইসলাম : না। বিমানবন্দর শুধু যাত্রী ওঠানামার জায়গা নয়। একজন প্রবাসী যখন বহুদিন পর দেশে ফেরেন, তখন বিমানবন্দরেই রাষ্ট্রের সাথে তার প্রথম সাক্ষাৎ হয়।
সেই সাক্ষাৎ যদি হয় দীর্ঘ অপেক্ষা, অব্যবস্থাপনা, অস্পষ্ট জবাব এবং অভিযোগ জানানোর দুর্বল ব্যবস্থার মাধ্যমে, তাহলে রাষ্ট্র সম্পর্কে তার ধারণা কী হবে?
প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। পরিবার চালান, দেশের সাথে সম্পর্ক ধরে রাখেন। তাদের দেশে ফেরার প্রথম অভিজ্ঞতা যদি হয় হয়রানি, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
প্রশ্ন : আপনার মতে বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন?
রাশেদুল ইসলাম : প্রথমত, প্রতিটি লাগেজের কার্যকর ট্র্যাকিং ব্যবস্থা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, জমজমের পানি বা অন্য বিশেষ পণ্য পরিবহনের দায়িত্ব কার- তা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকতে হবে।
কোন কনটেইনার কোথায় আছে, সেটি রিয়েল টাইমে জানা যায় কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। যাত্রীর অভিযোগ গ্রহণের জন্য ২৪ ঘণ্টার কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগের নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে হবে।
স্টাফদের আচরণ নিয়েও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এসবই আসল সংস্কার। শুধু একজনকে সাময়িক বরখাস্ত বা আরেকজনকে গ্রেফতার করলে প্রতিষ্ঠান বদলায় না। প্রতিষ্ঠান বদলায় যখন নিয়ম বদলায়, জবাবদিহি নিশ্চিত হয় এবং একই ভুলের পুনরাবৃত্তি বন্ধ হয়।
প্রশ্ন : শুক্রবার বিমানমন্ত্রী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেছেন, সেখানে খুব সুন্দর লাগেজ ম্যানেজমেন্ট হচ্ছে। অথচ ঘটনার পর দুই কর্মকর্তা বরখাস্ত হয়েছেন। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
রাশেদুল ইসলাম : এখানেই তো প্রশ্নটা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। যদি এখন সত্যিই খুব সুন্দর লাগেজ ম্যানেজমেন্ট হয়ে থাকে, তাহলে আগে কী সমস্যা ছিল?
আর যদি সবকিছু সুন্দরভাবেই চলছিল, তাহলে দুই কর্মকর্তাকে কেন সাময়িক বরখাস্ত করা হলো?
দু’টি বক্তব্যের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া দরকার- কোথায় ত্রুটি ছিল, কার দায় ছিল এবং কী পরিবর্তন করা হয়েছে।
প্রশ্ন : তাহলে ১ অক্টোবরের ঘটনাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
রাশেদুল ইসলাম : আমার কাছে এটি কেবল ৩৪ জন সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের বিমানবন্দর বিড়ম্বনার ঘটনা নয়।
এটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে- রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার দায় কে নেবে? নাগরিকের অভিযোগ শোনার কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়? প্রতিবাদের আইনগত সীমা কোথায়? আইন প্রয়োগে রাজনৈতিক পরিচয়ের কোনো প্রভাব আছে কি না? এবং সবচেয়ে বড় কথা- রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে জবাব চাইলে সেই জবাব কি প্রতিষ্ঠান দেবে, নাকি প্রশ্নকারীই জবাবদিহির মুখোমুখি হবে?
মেজর (অব:) আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা আদালত নির্ধারণ করবে। তার আচরণ আইনসঙ্গত ছিল কি না, সেটিও বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হওয়া উচিত।
কিন্তু একই সাথে বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা নিয়েও পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। একজনের বিরুদ্ধে মামলা হওয়া আর একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার জবাবদিহি- দু’টি আলাদা বিষয়। এক টিকে সামনে এনে অন্য টিকে চাপা দেয়া উচিত নয়।
রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্নটিও একইভাবে পরিষ্কার হওয়া দরকার। কেউ অপরাধ করলে রাজনৈতিক পরিচয় তাকে রক্ষা করবে না। আবার কেউ রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমত পোষণ করলেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তার প্রতি ভিন্ন আচরণ করবে- এটিও গ্রহণযোগ্য নয়।
আইন সবার জন্য সমান- এই কথাটি শুধু সংবিধানের পাতায় থাকলে হবে না; নাগরিকের অভিজ্ঞতাতেও তার প্রমাণ থাকতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত বিষয়টি শুধু একটি জমজমের কনটেইনারের নয়। বিষয়টি আস্থার, জবাবদিহির এবং নাগরিকের মর্যাদার।
আর সবচেয়ে বড় কথা- রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন করার অধিকার আমরা কতটা নিরাপদ রাখতে পারছি, সেটিই একটি গণতান্ত্রিক সমাজের আসল পরীক্ষা।





