২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীরসহ ৪৪ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয় বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী রেহান আহসানের মা ইফ্ফাত আরা এই অভিযোগ দায়ের করেন। এ সময় তার সাথে ছিলেন রেহানের বোন ফারিয়া সরণী ও তাদের আইনজীবী এস এম তাসমিরুল ইসলাম।

অন্য যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে, তারা হলেন- আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আব্দুল লতিফ সিদ্দীকি, মাহবুবুল আলম হানিফ, বাহাউদ্দিন নাছিম, ড. আব্দুর রাজ্জাক, ড. হাসান মাহমুদ, মৃনাল কান্তি দাস, তৎকালীন আইজিপি হাসান মাহমুদ খোন্দকার, এআইজি শহীদুল ইসলাম, ডিএমপি কমিশনার বেনজির, বিজিবির তৎকালীন প্রধান, র‌্যাবের ডিজি, র‌্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের কমান্ডার তৎকালীন লে: কর্নেল জিয়াউল আহসান, তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি সেক্রেটারি, যুবলীগের সভাপতি সেক্রেটারিসহ ৪৪ জন।

ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করার পর রেহান আহসানের মা ইফ্ফাত আরা বলেন, রেহান হত্যার ঘটনার বিষয়ে বিগত সরকারের সময় আমি মুখ খুলতে পারিনি। থানা বা আদালতে মামলা করার সাহস পাইনি। ছেলের লাশ পাওয়ার পর আমাকে প্রশাসন চাপ দেয়া হয়েছিল তাড়াতাড়ি দাফন করার জন্য। তিনি রেহানের মতো একটি মেধাবী ছেলেকে হারিয়ে আমি পারিবারিকভাবে নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। আমি সন্তান হারিয়েছি। দেশও তার একটি অমূল্য সম্পদ হারিয়েছে। রেহান (২৩) বুয়েটের কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি বলেন, আমার ছেলে কোনো রাজনীতির সাথে ছিল না, সে ছিল মূলত ধর্মভীরু। তিনি আরো বলেন, আমার ছেলে ছিল ও বাবার কলিজার টুকরা। ওর বাবা এই শোক সামাল দিতে পারেনি। পরের বছর ওর বাবা মারা যায়। সন্তানের শোক সামাল দেয়ার আগে আমি আমার স্বামীকে হারিয়েছি। এই ১১টা বছর আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম আমি আর দাঁড়াতে পারব না। ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানের পর আমরা বাকস্বাধীনতা পেলাম। সেই সাহসে সাহসী হয়ে আজ রেহানের হত্যার অভিযোগ দায়ের করলাম। আশা করি প্রশাসন আমাকে সহায়তা করবেন। আমি যেন সঠিক বিচার পাই। আমার মতো মা যেন কখনো সন্তান না হারায়। আমরা ছেলে হেফাজতের আন্দোলনে মারা গেছে, এ কথা আমি বলতে পারিনি। আজ আমি বলতে পারছি।

অভিযোগে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আব্দুল লতিফ সিদ্দীকি, মাহবুবুল আলম হানিফ, বাহাউদ্দিন নাছিম, ড. আব্দুর রাজ্জাক, ড. হাসান মাহমুদ, মৃনাল কান্তি দাস গণভবনে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করেন এবং হেফাজতের কর্মসূচিকে নির্মমভাবে দমন করার নির্দেশনাপ্রাপ্ত হয়ে আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর ধানমণ্ডির কার্যালয়ে বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করেন এবং হেফাজতের নেতা-কর্মীদের রাজাকার, আলবদর, আলসামস ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং হেফাজতের নেতা-কর্মীদের বিএনপি-জামায়াতের দোসর হিসেবে আখ্যায়িত করে ঘোষণা দেন হেফাজতের নেতাকর্মীদের দমনের জন্য আওয়ামী লীগই যথেষ্ট এবং হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীদের ঢাকা ছাড়ার জন্য কড়া হুশিয়ারি প্রদান করেন।

অভিযোগে বাদি ইফ্ফাতআরা উল্লেখ করেন ২০১৩ সালের ৫ মে সারা দেশ থেকে আলেম-ওলামা, সাধারণ ছাত্র-জনতা ও সব শ্রেণী পেশার ইসলামপ্রিয় তৌহিদী জনতার সাথে আমার ছেলে রেহান আহসান তার অন্যান্য বন্ধুবান্ধবসহ ঢাকার শাপলা চত্বর অভিমুখে যাত্রা করলে বিভিন্ন স্থানে পুলিশ, বিজিবি-র্যাব, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও সরকারের অন্যান্য শরিক দলের নেতাকর্মীরা তৌহিদী জনতাকে বাধা প্রদান করে হামলা চালায় এবং ঢাকা-শহরসহ সারা দেশে বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের আহত ও নিহত করে।

আমার ছেলে রেহান আহসান ও তার বন্ধুরা সকাল থেকে ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক একাধিক স্থানে হামলার শিকার হয়ে আহত ও বিধ্বস্ত অবস্থায় বিকেলে মতিঝিল শাপলা চত্বর এলাকায় পৌঁছায়। ওই স্থানে থাকাবস্থায় সন্ধ্যার পর শাপলা চত্বরের দক্ষিণ পার্শ্বস্থ দৈনিক বাংলা অভিমুখী সড়কে শাপলা চত্বর থেকে সামান্য দূরে রাস্তায় পুলিশ-যৌথ বাহিনী, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরা গোলাগুলি করে আকস্মিক হামলা করলে আমার ছেলেসহ তার বন্ধুরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় আমার ছেলেসহ আরো কয়েকজন রাস্তার পার্শ্বস্থ একটি গলিতে ঢুকে আশ্রয় নেয়। ওই গলিতে আশ্রয় গ্রহণ করার পর আনুমানিক ৭ সাড়ে ৮টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে ওই গলির দিকে পুলিশ-যৌথ বাহিনী, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরা সমন্বিতভাবে গুলি করতে করতে আগাতে থাকলে একটি গুলি আমার ছেলে রেহান আহসানের মুখমণ্ডলে লাগে। এতে সে নিহত হয়।