একযুগ ধরে পথ চেয়ে আছেন মুন্নার মা। ছেলে আসবে বলে। এর মধ্যে স্বামীকে হারিয়েছেন। নানা রোগ বাসা বেঁধেছে নিজের শরীরে। বলতে গেলে একেবারেই শয্যাশায়ী। তার পরেও এক মুহূর্তও ভুলতে পারেন না ছেলেকে। একবার হলেও ছেলের মুখ দেখতে চান তিনি।
নিখোঁজ ছেলের সন্ধান চেয়ে মুন্নার বাবা শামসুদ্দিন এক সময় দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াতেন। পত্রিকার অফিসে ছুটে যেতেন একটি নিউজ করানোর জন্য। কেউ হয়তো নিউজ করতো, আবার অনেকে হায়ানার ভয়ে এড়িয়ে যেতো। ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন। গুম-খুনের বিরুদ্ধে আয়োজিত সভা-সমাবেশে গিয়ে ছেলের সন্ধান চেয়ে বক্তৃতা করতেন। ২০১৬ সালে পুত্রশোকে মারা যান শামসুদ্দিন। শামসুদ্দিন মারা যাওয়ার পর মুন্নার সন্ধানে তেমন আর কেউ কথা বলেননি। গতকাল হঠাৎ করেই মুন্নার মা ফোন করেন এই প্রতিবেদককে। পরিচয় দেন, ‘আমি মুন্নার মা, চিনতে পেরেছেন?’ এক মুহূর্তও চিনতে কষ্ট হয়নি ময়ূরী বেগমকে। ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, ‘বাবা আমি অসুস্থ। একটিবার হলেও আমি আমার সন্তানের মুখটি দেখতে চাই। ১২ বছর হয়ে গেলেও আমার ছেলেটি আর ফিরে আসলো না।’
২০১৩ সালের ৬ ডিসেম্বরের ঘটনা। রাজধানীর দক্ষিণখানের প্রেম বাগান এলাকা থেকে অপহৃত হন ছাত্রদল নেতা নিজাম উদ্দিন মুন্না (২৪)। একদল অস্ত্রধারী নিজেদেরকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে মুন্নাকে তুলে নিয়ে যায়। সে থেকেই মুন্না নিখোঁজ। সঙ্গে তার এক বন্ধুকেও তুলে নেয়া হয়। তাদের বাসা দক্ষিণখানের আশকোনার মোল্লারটেকে। প্রেম বাগানে তাদের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল। মাঝে মধ্যে ওই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বসতো মুন্না। টঙ্গি কলেজ থেকে সে বিবিএ শেষ করেছিল। বিমান বন্দর থানা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিল সে। ৬ ডিসেম্বর রাত ১০টার দিকে দোকান বন্ধ করে বাসায় যাওয়ার পথে তাকে তুলে নেয়া হয়। ছেলের পেছনে পেছনে বাসায় যাচ্ছিলেন শামসুদ্দিন। ঘটনার পর শামসুদ্দিন বলেছিলেন, ‘একটি সাদা রঙের মাইক্রোবাস থেকে কয়েকজন অস্ত্রধারী নেমে মুন্নাকে ঘিরে ধরে। টানা-হেঁচড়া দেখে আমি ঘটনাস্থলে এগিয়ে যাই। আমি জানতে চাই মুন্নাকে কেন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সাদা পোশাকের ওই লোকগুলো নিজেদেরকে ডিবি পুলিশ বলে পরিচয় দেয়। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে ছিল আগ্নেয়াস্ত্র। কয়েক মিনিটের মধ্যে অস্ত্রধারীরা মুন্নাকে নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।’
ঘটনার পর শামসুদ্দিনসহ পরিবারের সদস্যরা দক্ষিণ খান থানা ও ডিবি কার্যালয়ে খোঁজ নেন। কিন্তু তারা মুন্নাকে আটকের বিষয়টি অস্বীকার করেন। র্যাব কার্যালয় থেকেও মুন্নাকে আটকের বিষয়টি অস্বীকার করা হয়। সেই থেকেই নিখোঁজ রয়েছেন মুন্না। দেশের এমন কোনো থানা নেই যেখানে মুন্নার খোঁজ নেয়নি পরিবারটি। কিন্তু কেউ তার ছেলের সন্ধান দিতে পারেনি। ঘটনার পর মুন্নার বাবা শামসুদ্দিন বলেছিলেন, ‘দুই ছেলে এক মেয়ের লেখাপড়ার জন্যই পরিবার নিয়ে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন।’ তাদের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীতে। তিনি একটি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকতা ছেড়ে ছেলে-মেয়েদের মানুষ করবেন বলে ঢাকায় এসেছিলেন শামসুদ্দিন। তিনি বলেছিলেন, ‘যদি কোনো দিন বুঝতাম এই ঢাকায় এসে সন্তান হারাতে হবে, তবে ঢাকায় আসতাম না।’
ছেলেকে উদ্ধার করে দেয়ার কথা বলে মুন্নার বাবার সঙ্গে অনেকে প্রতারণাও করেছে। হাতিয়ে নিয়েছে অর্থকড়ি। কিন্তু তার পরেও হাল ছাড়েননি এই পিতা। হায়েনাদের সাথে যুদ্ধ করে ২০১৬ সালে মারা যান গুম হওয়া মুন্নার পিতা শামসুদ্দিন।
গতকাল বিকেলে ফোন করে মুন্নার মা ময়ূরী বেগম বলেন, তিনিও এখন শয্যাশায়ী। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্য ভুলতে পারছেন না ছেলের মুখটা। তিনি আশাবাদী, হয়তো দুর্বৃত্তদের ক্ষমতা অবসানের পর তার ছেলে ফিরে আসবে। একটিবারের জন্য হলেও দেখতে পাবেন গুম হওয়া ছেলেকে।





