যুমনা সেতুর টোল আদায়
সরকারের ক্ষতি ২৬ কোটি টাকারও বেশি
যমুনা সেতুর টোল আদায়ের জন্য সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েও কাজ পায়নি দেশীয় কোম্পানি। বিগত দিনে যমুনা সেতুর টোল আদায়ে কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেও দেশীয় ওই কোম্পানির দরপত্রটি পর্যন্ত খুলে দেখা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই কোম্পানিকে বাদ দিয়ে কাজ দেয়া হয়েছে একটি বিদেশী কোম্পানিকে। এতে সরকারের ক্ষতি হয়েছে ২৬ কোটি টাকারও বেশি। দেশী ওই কোম্পানিটি ৫ বছরের জন্য আর্থিক প্রস্তাব দেয় ৫৫ কোটি টাকার অথচ ৬০ কোটি টাকায় কাজ পেয়েছে চীনা প্রতিষ্ঠানটি। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের আশীর্বাদপুষ্ট প্রতিষ্ঠান সিএনএসকে কাজ দেয়ার জন্য সব আয়োজন সম্পন্ন ছিল। কিন্তু গত ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তন হওয়ায় তড়িঘড়ি করে চীনা কোম্পানিকে কাজ দিয়েছে সেতু বিভাগ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, টোল আদায়ের কার্যক্রমের জন্য সেতু বিভাগ দরপত্র আহ্বান করলে ৫০টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র কেনে। এর মধ্যে ১০টি কোম্পানি দরপত্র জমা দেয়। ওই ১০টি কোম্পানির মধ্যে নিয়ম অনুযায়ী সিকিউরিটি মানি না থাকায় ২টি কোম্পানি প্রাথমিকভাবে বাদ পড়ে যায়। রয়ে যায় ৮টি কোম্পানি। নথি বলছে, ৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল দেশীয় কোম্পানি মার্গানেট ওয়ান লিমিটেড। তাদের আর্থিক প্রস্তাবনা ছিল ৫৫ কোটি ৩৬ লাখ ৮৫ হাজার ৩০৬ টাকা। আর টোল আদায়ের জন্য কাজ পাওয়া চীনা কোম্পানির আর্থিক প্রস্তাবনা ছিল ৬০ কোটি ৫৭ লাখ ৩৭ হাজার ১৬৪ টাকা। এমনকি সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েও মার্গানেট ওয়ান লিমিটেডের আর্থিক প্রস্তাবনাপত্রটি খুলেও দেখেনি দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি। ১৯৯৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত চারটি কোম্পানি যমুনা সেতুর টোল আদায়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এর মধ্যে ২০০৪ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সর্বনি¤œ দরদাতা ওই কোম্পানিটি যমুনা সেতুর টোল আদায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
মার্গানেট ওয়ান লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোবারক হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা জানতে পেরেছি, জমাকৃত টেন্ডারগুলোর মধ্যে ৫টি ওপেনই করা হয়নি। এতে বোঝা যায়, তাদের কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল। মূলত সিএনএসকে কাজ পাইয়ে দিতে তাদের সব আয়োজন ছিল। গত ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের কারণে সিএনএস ব্যাকফুটে চলে যায়। কাজ দেয়া হয় চায়না কোম্পানিকে। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো- আমরা অতীতে যুমনা সেতুর টোল আদায়ে ৫ বছর কাজ করেছি। টেন্ডার সাবমিটে কোনো ত্রুটি হয়নি, সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। অভিজ্ঞতা থাকার পরও আমাদের টেন্ডারটি ওপেনই করা হয়নি। অথচ আমরা সর্বনিম্ন দরদাতা ছিলাম।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, যমুনা সেতুতে টোল আদায়কারীর মেয়াদ শেষ হয় ২০১৬ সালে। পরবর্তী ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া সময়সাপেক্ষ হওয়ায় টোল আদায়ে কারিগরি সহায়তার জন্য ৬ মাসের জন্য সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের আশীর্বাদপুষ্ট কোম্পানি সিএনএসকে নিয়োগ দেয় সেতু বিভাগ। অন্য দিকে স্থায়ী ঠিকাদার নিয়োগের দরপত্র প্রক্রিয়াটির কার্যক্রমও চলতে থাকে। ওই প্রক্রিয়ায় স্থায়ী ঠিকাদার নিয়োগে উচ্চমূল্য হওয়ায় কাজ পাচ্ছে না বুঝতে পেরে রিট মামলার কৌশলের আশ্রয় নেয় সিএনএস। এতে ঠিকাদার নিয়োগ আটকে যায়। ঠিকাদার নিয়োগে মামলা সংক্রান্ত ওই জটিলতার কারণে ২০১৭ সালে উচ্চমূল্যে বিনাদরপত্রে ১০ মাসের জন্য সিএনএসের সাথে যমুনা সেতুর টোল আদায়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয় সেতু বিভাগ। ধাপে ধাপে ওই চুক্তি গিয়ে ঠেকে ৮৯ মাসে। সফটওয়্যার কারসাজিতে সরকারের ক্ষতি হয় প্রায় ৩৮ কোটি টাকা। গত ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তন না হলে সিএনএসের সাথে চুক্তি আরো বাড়ানো হতো।
সূত্র আরো বলছে, ২০২২ সালে মামলার রিট নিষ্পত্তি হলে দরপত্র আহ্বান করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আহ্বান করা ওই দরপত্রের কাজটি সেতু বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের আশীর্বাদপুষ্ট কোম্পানি সিএনএসকে দেয়ার জন্য সব প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্নই ছিল। কিন্তু ৫ আগস্টে সরকারের পরিবর্তনের কারণে তাদেরকে উচ্চদরে কাজ পাইয়ে দেয়া সম্ভব না হলেও কৌশলে বাদ দেয়া হয় দেশীয় কোম্পানিকে। এমনকি যমুনা সেতুর টোল আদায়ে আগের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও দেশীয় কোম্পানিটির দরপত্রটি পর্যন্ত কৌশলে ওপেনই করা হয়নি।
এ প্রসঙ্গে সেতু বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো: ফেরদৌস নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা টেকনিক্যাল ইভ্যালুয়েশনগুলো করি। টেকিনিক্যাল প্রোপোজালগুলো খুলে যারা রেসপন্সিভ হয় শুধু তাদের আর্থিক প্রস্তাবনাগুলো খোলা হয়। এর মধ্যে যারা সর্বনিম্ন দরদাতা হয় তাদের কাজ দেয়া হয়। সেতু বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো: তোফাজ্জেল হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, টোল আদায়ের সুবিধার্থে সিএনএসের সাথে ভাড়ায় চুক্তি করা হয়েছিল। এখন চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন কাজ পেয়েছে। ৫ বছরের জন্য তাদের সাথে চুক্তি করা হয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে তারা কাজ শুরু করেছে।





