যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ার বেনগাজি থেকে আড়াই শ’ কিলোমিটার দূরের ব্রেগা নামক এলাকার সমুদ্রতীর থেকে উদ্ধার হওয়া ২৩টি লাশ ওই দেশের সরকারের অনুমতি নিয়ে দাফন হয়েছে তিন দিন আগেই। তবে এসব লাশ বাংলাদেশী নাগরিকদের না-কি অন্য কোনো দেশের সেটি গতকাল সোমবার পর্যন্ত লিবিয়ার ত্রিপোলির বাংলাদেশ দূতাবাস নিশ্চিত হতে পারেনি।
তবে দূতাবাসের কর্মকর্তারা এসব লাশের বেশির ভাগ বাংলাদেশীদের বলে ধারণা করছেন। সেই লক্ষ্য পরিচয় শনাক্তে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে একটি প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থলে পাঠাতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি দেয়া হয়েছে। গতকাল রাত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে এ ব্যাপারে দূতাবাস টিমকে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়নি। তবে লিবিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে সাগরপথে অথবা অন্যভাবে মারা যাওয়া লাশ পাঠানোর সাথে জড়িত একটি কোম্পানিকে এসব লাশ শনাক্তে দূতাবাস থেকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে।
গতকাল রাতে লিবিয়ার ত্রিপোলির বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সেলর গাজী আসাদুজ্জামান কবীরের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, লিবিয়ার বেনগাজি থেকে আনুমানিক আড়াই শ’ কিলোমিটার দূরের ব্রেগা নামক এলাকার সাগরপাড় থেকে ২৩টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পরবর্তীতে ওই লাশগুলো পাবলিক প্রসিকিউশনের অনুমতি নিয়ে আজদাবিয়া নামক এলাকায় দাফন করা হয়েছে। এই লাশগুলো বাংলাদেশীদের কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা বিভিন্ন ভাবে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি সমুদ্রে যে ট্রলারডুবির ঘটনাটি ঘটেছিল সেই ট্রলারে অধিকাংশ বাংলাদেশী ছিলেন। যদিও আমরা এখনো কোনো লাশ দেখতে পাইনি। লাশগুলো সাগরপাড়ে ভেসে এসেছে।
এক প্রশ্নের উত্তরে শ্রম কাউন্সেলর নয়া দিগন্তকে বলেন, আসলে লাশগুলো কার সেগুলো শনাক্তের জন্য আমাদের দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি মো: রাসেল ও কন্সুলেট মো: ফেরদৌসের নেতৃত্বে একটি টিমকে ঘটনাস্থলে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত রেখেছি। সেই লক্ষ্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখে যাওয়ার (খারিদিয়া) অনুমতি চেয়েছি। কিন্তু এখনো আমাদেরকে সরকারিভাবে সেখানে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, যে এলাকায় ঘটনাটি ঘটেছে সেটি প্যারালাল গভর্নমেন্টের মধ্যে পড়েছে। এর মধ্যে বেনগাজি হচ্ছে বিদ্রোহী সরকারের নিয়ন্ত্রণে। আর আমরা রয়েছি জাতিসঙ্ঘ সমর্থিত এলাকায়। দু’টির মাঝামাঝি এলাকায় পড়েছে ঘটনাস্থল। যার কারণে অনুমতি মিলছে না বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, অনুমতি না পাওয়া গেলেও আমরা লাশগুলো শনাক্ত করার জন্য দার আল তৌহিদ নামের একটি কোম্পানির সাথে চুক্তি করেছি। এই কোম্পানি লিবিয়াতে সাগরে ডুবে অথবা অন্য কোনোভাবে যারাই মারা গেলে সেই লাশগুলো বিশ্বের যেকোনো জায়গায় তারা পাঠিয়ে থাকে। তাদের মাধ্যমে এসব লাশের পরিচয় পাওয়া গেলে তো ভালো। এর জন্য তাদেরকে আমরা দূতাবাস থেকে নিয়োগ দিয়েছি।
উল্লেখ্য, গত তিন দিন আগে লিবিয়ার ত্রিপোলির বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে জানানো হয়, লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলে ভূমধ্যসাগরের উপকূলবর্তী ব্রেগা তীর থেকে গত দুই দিনে বেশ কয়েকজন অভিবাসীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে বাংলাদেশ দূতাবাস বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছে। স্থানীয় উদ্ধারকারী কর্তৃপক্ষের মতে, অভিবাসনপ্রত্যাশীদের একটি নৌকা ভূমধ্যসাগরে ডুবে যাওয়ার পর এসব লাশ ব্রেগা তীরে ভেসে এসেছে। এ ছাড়া উদ্ধার হওয়া লাশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশী নাগরিক থাকার আশঙ্কার কথা বিভিন্ন সূত্রে জানা গেলেও, এই বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি। তবে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্য দূতাবাস স্থানীয় কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সবার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যোগাযোগ রক্ষা করছে। এই প্রেক্ষিতে ওই দুর্ঘটনায় নিহত, আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশী নাগরিকদের বিষয়ে যেকোনো তথ্য জানানোর জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনুরোধ জানানো হয়। একই সাথে তথ্য জানাতে ফেসবুক কমেন্টে অথবা দূতাবাসের নিম্নোক্ত দাফতরিক মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ +২১৮৯১৬৯৯৪২০২ এবং +২১৮৯১৬৯৯৪২০৭ যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হয়।
এদিকে বাংলাদেশ থেকে দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে দুবাই থেকে লিবিয়া হয়ে ইউরোপের দেশ ইতালি যাওয়ার হার আবারো বেড়েছে বলে মনে করছেন লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস। তবে ২০২৪ সালে কী পরিমাণ লোক লিবিয়ার সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে সলিল সমাধি ঘটেছে সেই পরিসংখ্যান বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সেলর জানাতে পারেননি।
লিবিয়া প্রবাসী নজরুল ইসলাম তার পোস্টে লেখেন, মো: আব্দুর রহমান নামের এক প্রবাসী গত তিন বছর আগে লিবিয়ায় পাড়ি জমান। তার বাবার নাম আবদুর রহিম। গ্রাম সুন্দলপুর, কালামুন্সি বাজার, কবিরহাট নোয়াখালী। ১০ দিন আগে মাফিয়াদের হাতে আটক হন। মাফিয়া চক্র অডিও এবং ভিডিও কল দিয়ে তার ওপর অমানবিক নির্যাতন ও অত্যাচার চালাচ্ছে। এখন মাফিয়া চক্র মুক্তিপণ হিসেবে তার পরিবারের কাছে ২৬ লাখ টাকা দাবি করছে। যা তার পরিবারের পক্ষে দেয়া কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। এবং তার পরিবারের উপার্জন করার মতো আর কোনো উৎস নেই। টাকা না দেযায় তার ওপর অমানবিক নির্যাতন ও মারধর আরো বেশি চালানো হচ্ছে। ফলে তার মা-বাবাসহ তার পরিবারের সব সদস্য মানসিক চাপ ও হতাশায় জীবন-যাপন করছে। এমতাবস্থায় তাকে উদ্ধারে প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
এ প্রসঙ্গে লেবার কাউন্সেলর গাজী আসাদুজ্জামান কবীর নয়া দিগন্তকে বলেন, আজকে এমন একটি ঘটনার কথা জানতে পেরেছি। আমরা জানার চেষ্টা করছি। এটি কোথায় ঘটেছে। জানতে পারলে আমরা তাকে উদ্ধারে সবধরনের চেষ্টা চালাবো। এরপর তিনি বলেন, লিবিয়া থেকে অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে কেউ যাতে না আসে সেজন্য তিনি জনগণকে সচেতন করার ওপর জোর দেয়ার অনুরোধ জানান। কারণ এই পথ অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। বিভিন্ন এলাকায় আটককৃতদের নির্যাতন করা হয়। সাগরে নৌকাডুবির ঘটনা ঘটছে অহরহ। তাই দূতাবাসের পক্ষ থেকে দেশবাসীর কাছে এসব পথে না যাওয়ার জন্য বাংলাদেশীদের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে। উল্লেখ্য দূতাবাসের একটি প্রতিনিধিদল বেনগাজীর গানফুদা ডিটেনশন সেন্টারে ১৭৯ জন এবং ত্রিপোলির তাজুরা ডিটেনশন সেন্টারে ৫২ জন আটক বাংলাদেশী নাগরিক কেমন আছেন তার খোঁজ নিতে যান। তাদেরকে দেশে ফেরাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে বলে জানানো হয়। এসব বাংলাদেশী মাফিয়াদের হাতে আটক হয়ে দিনের পর দিন নির্যাতিত হচ্ছেন।





