কাওসার আজম
বার্ড ফ্লু (এভিয়েন ইনফ্লুয়েন্সার) ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) প্রতিটি শেডে। গবেষণার কোয়েল শেড থেকে শুরু হওয়া প্রাণঘাতি মারাত্মক এই ছোঁয়াচে ভাইরাস থাবা মেরেছে হাঁস, টার্কি ও বিদেশি মুরগির জাত পিওর লাইনের শুভ্রা-স্বর্ণা শেডে। আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বিএলআরআই-এর অন্যান্য জাতের পোল্ট্রি শেডেও ছড়িয়ে পড়ার।
গত বৃহস্পতিবার দৈনিক নয়া দিগন্তে ‘বিএলআরআইয়ে বার্ড ফ্লুতে আক্রান্ত কোয়েল পাখির মৃত্যুর তথ্য গোপন করেছেন ডিজি’ শীর্ষক খবর প্রকাশিত হয়। তবে, বার্ড ফ্লু নিয়ে অনেকটাই নির্বিকার ভূমিকায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা শীর্ষ ব্যক্তিরা। অভিযোগ রয়েছে, আগের মতোই কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহণ না করে প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাময়িক দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাপরিচালক (ডিজি) ড. শাকিলা ফারুক বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার মিশনে ব্যস্ত। যদিও তিনি আজ শনিবার দুপুরে দাবি করেছেন কোয়েলসহ অন্যান্য প্রাণির মৃত্যুর কারণ বার্ড ফ্লু নয়। তিনি বলেন, আমাদের কাছে তো টেস্ট রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে, এটা বার্ড ফ্লু না।
কোয়েল থেকে শুরু হয়েছিল, এরপর হাঁস, মুরগি, টার্কিও মারা গেল। তাহলে এতোগুলো প্রাণি কীভাবে মারা গেলো? জানতে চাইলে ডিজি বলেন, ৫-১০ শতাংশ মারা যেতেই পারে। আমাদের তো প্রতি শেডে বিভিন্ন জাতের দুই হাজারের মতো করে থাকে। সেখান থেকে দুই চারটা করে মারা যেতেই পারে। আপনি আসেন, সার্বিক পরিস্থিতি দেখেন।
জানা যায়, প্রায় তিন সপ্তাহ আগে কোয়েল পাখির শেডে প্রথমে বার্ড ফ্লু ভাইরাসের উপস্থিতি দেখা যায়। এতে কয়েক দিনে গবেষণার কাজে ব্যবহৃত শতাধিক এডাল্ট কোয়েল মারা যায়। যদিও বিভিন্ন সূত্র জানায়, এ সংখ্যা হাজারের ঘরে। পোল্ট্রি উৎপাদন গবেষণা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. শাকিলা ফারুক ডিজির সাময়িক দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বিষয়টি ধামা চাপা দেয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ। এমন কি মন্ত্রণালয়কেও বিষয়টি অবহিত করেননি। পোলট্রি বিভাগের বিজ্ঞানীদের সাথে মিটিং কিংবা তাদের এ বিষয়ে সতর্ক বার্তাও দেননি। যদিও তা গত সপ্তাহে সরেজমিনে গিয়ে ডিজিকে এ বিষয়ে জানতে চান মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম সচিব।
নাম না প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তার সাথে আলাপ করে জানা যায়, বার্ড ফ্লু বা এভিয়েন ইনফ্লুয়েন্সর ভাইরাস বা কী কারণে এটা মারা গেল তা নিয়ে ডিজি শাকিলা ফারুক কোনো মিটিং করেননি। ভাইরাস যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সে বিষয়ে কোনো সতর্ক বার্তা বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেননি। বার্ড ফ্লুর আক্রান্তের তথ্য পোলট্রি বিভাগেরই অনেকের অজানা ছিল। এরই মধ্যে কোয়েল পাখির শেড থেকে বার্ড ফ্লু’র জীবানু প্রথমে হাঁসের শেডে,তারপর জাপানি জাতের মুরগি পিওর লাইনের শুভ্রা-স্বর্ণা জাতটিও আক্রান্ত। গবেষণার ১৫০টি জাপানি জাতের শুভ্রা-স্বর্ণার মধ্যে ১৩০টিই মারা গেছে। বাকী ৩০টি কার্ল করা হয়েছে বলে জানা যায়।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সাজেদুল করিম সরকারের সাথে। গবেষণার টার্কি শেডের দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তা বলেন, কোয়েল থেকে সংক্রমণ শুরু হয়েছে। ৪০-৪৫টি টার্কি মারা গেছে। ট্রিটমেন্টও চলছে। বিভাগীয় প্রধান ও ডিজিকে জানানো হয়েছে। প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. কামরুন নাহার মনিরা এ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হননি। তবে, তিনি স্বীকার করেন, পিওর লাইনের শুভ্রা-স্বর্ণা জাতের কিছু মুরগি মারা গেছে। ডিজির পারমিশন নিয়ে কিছু কার্ল করা হয়েছে। জানা যায়, গবেষণার হাঁসও মারা গেছে। তবে,ঠিক কতটি মারা গেছে, সেই তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ নিয়ে গত বৃহস্পতিবার দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, প্রায় তিন সপ্তাহ আগে বিএলআরআই-এর কোয়েল পাখির গবেষণা শেডে প্রাণির প্রাণঘাতি ভাইরাস বার্ড ফ্লু আক্রান্ত হলেও বিএলআরআই-এর সাময়িক দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাপরিচালক (ডিজি) ড. শাকিলা ফারুক এ তথ্য গোপন করার চেষ্টা করে আসছেন। বিষয়টি উর্ধ্বতন মহলকে অবহিত না করে কিংবা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিয়ে ডিজি সবাইকে চুপ থাকার মিশনে নামেন। এমন কী এ নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা বললেও কাদের নিয়ে তা করেছেন, সেটার অবস্থা কী? তা স্পষ্ট নয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ২০০৭ সালে বাংলাদেশে বার্ড ফ্লু ভাইরাসের ভয়াবহতা দেখেছে বাংলাদেশ। ভাইরাসটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বলেন, আমাদের পোলট্রি বিভাগ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত গবেষণার ফল ছিল ৪-৫টি জাত। প্রাপ্ত বয়স্ক প্রায় দেড় হাজার কোয়েল পাখির ডিম থেকে বাচ্চা হয়। অ্যাডাল্ট ও বাচ্চাগুলো আলাদা শেডে রাখা হয়। কিন্তু ভাইরাস অ্যাটাক করে অ্যাডাল্ট শেডে। যার বেশির ভাগই মারা যায়। ঠিকমতো ভ্যাকসিনেশন বা বায়োসিকিউরিটি মেইনটেইন না করার ফলে বার্ড ফ্লুর মতো ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। পোলট্রি উৎপাদন গবেষণা বিভাগের প্রধান ও প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে বিএলআরআই জুড়ে বার্ড ফ্লু ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পেছনে ড. শাকিলা ফারুকের উদাসীনতাকেই দায়ী করছেন অনেকে।
এ বিষয়ে আজ শনিবার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রাণিসম্পদ অনুবিভাগ) আমেনা বেগমকে ফোন দিলেও রিসিভ করেননি।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার সকালে নয়া দিগন্তকে বলেন, কী কারণে এই এটা (বার্ড ফ্লু) হয়েছে, এর কারণ আমরা এখনো খুঁজে পাইনি। এটা বের করার চেষ্টা করছি।
তিন সপ্তাহ আগে বিএলআরআইতে বার্ড ফ্লু ছড়িয়ে পড়লেও তা গোপন করা হয়েছে। এ বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, বিষয়টি দেখা হচ্ছে।





