‘স্টুডেন্ট ফার্স্ট বাংলাদেশ ফার্স্ট’ স্লোগানকে সামনে রেখে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন (বৈছাআ) প্লাটফর্ম থেকে বেরিয়ে শিগগিরই নতুন ছাত্রসংগঠন গঠন করতে যাচ্ছে জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রদের একাংশ। সংগঠনটি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বাইরে এসে নিজেদের কর্মসূচি অনুযায়ী সংগঠন পরিচালনা করবে জানিয়েছে। তা ছাড়া সংগঠনটি কোনো লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি চর্চা করবে না এবং গণতান্ত্রিক চর্চার মাধ্যমে দলটির নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে।
গতকাল সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মধুর ক্যান্টিনে ‘জুলাই অভ্যুত্থানের শক্তি থেকে নতুন রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠন গঠনের প্রক্রিয়া’ নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তথ্য জানানো হয়। তবে নবগঠিতব্য ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্বে কারা আসবে এবং কবে নাগাদ সংগঠনটি আত্মপ্রকাশ করবে তা জানানো হয়নি। শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে শিগগিরই ছাত্রসংগঠনটির আত্মপ্রকাশের তারিখ জানিয়ে দেয়া হবে বলে জানান নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আব্দুল কাদের এবং আবু বাকের মজুমদার।
এ সময় জানানো হয়, নতুন ছাত্রসংগঠন তৈরির লক্ষ্যে সোমবার ও মঙ্গলবার (১৭ ও ১৮ ফেব্রুয়ারি) সারা দেশে শিক্ষার্থীদের মতামতের প্রেক্ষিতে জনমত জরিপ ও সদস্য সংগ্রহ করা হবে। অনলাইন ও অফলাইনে ঢাবির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান, জাবি, জবি, রাবি, চবিসহ দেশের সব পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, সম্ভাব্য সব কলেজ, স্কুল ও মাদরাসায় এ প্রচারণা চালানো হবে।
সংগঠনটির প্রস্তাবনাগুলো উল্লেখ করে আবু বাকের মজুমদার জানান, আদর্শিক বাইনারির কালচারাল দ্বন্দ্বের বাইরে গিয়ে মধ্যমপন্থী ছাত্ররাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা করা। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে অন্তর্ভুুক্তিমূলক ছাত্ররাজনীতি তৈরি করা (যেখানে পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে অবমূল্যায়ন করা হবে না)। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ভিত্তিতে সবার অংশগ্রহণে গঠিত হতে যাওয়া নতুন রাজনৈতিক দলই আমাদের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণ করবে।
এ ছাড়াও, মূলধারার রাজনৈতিক পরিসরে নারীদের যে অনুপস্থিতি রয়েছে সেটিকে অ্যাড্রেস করে নারীর রাজনৈতিক মানস বিনির্মাণ, রাজনৈতিক চর্চার পরিবেশ তৈরি এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে নারীবান্ধব করে তোলার মাধ্যমে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য সমান সুযোগের সৃষ্টি করার প্রস্তাবনাও উল্লেখ করেন আবু বাকের মজুমদার।
প্রস্তাবনায় আরো উল্লেখ করা হয়, শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে আপসহীন ছাত্র রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দেয়া হবে। বাংলাদশের সংগ্রাম ও স্বাধীনতার ইতিহাসকে স্বীকার করে এবং ৪৭-এর দেশভাগ, ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬-এর ছয়দফা আন্দোলন, ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ২০২৪-এর সব গণ-আন্দোলন এবং ছাত্র-জনতার সংগ্রামী চেতনাকে ভিত্তি করে ছাত্ররাজনীতি সক্রিয় থাকবে।
তিনি বলেন, আমাদের জুলাই আন্দোলনে যখন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন প্লাটফর্ম ঘোষণা করি, তখন মূলত কোটা বৈষম্য নিরসনে আন্দোলনটি শুরু হয়। সেই আন্দোলন ৯ দফার পর এক দফায় রূপান্তরিত হয়, শেখ হাসিনার পতন হয়। এই সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বিভিন্ন মতাদর্শের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন এবং তারা এই প্লাটফর্মে ছিলেন, এখনো আছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি, বাম ছাত্রসংগঠনসহ আরো ইসলামী ছাত্রসংগঠনের সদস্যরা ছিলেন। কিন্তু আমরা মনে করছি, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের যে অঙ্গীকার ফ্যাসিবাদী সিস্টেমের সম্পূর্ণ বিলোপ এবং নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, এই দু’টি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কার্যক্রম সমাপ্ত হবে। একইসঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থীসহ যারা একই মতাদর্শের, যারা জুলাই অভ্যুত্থান থেকে আরো বেশি সফিস্টিকেটিভভাবে ভিশনারি পলিটিক্স করতে চান, তারা এই নতুন ছাত্রসংগঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। কবে নাগাদ নতুন দল আত্মপ্রকাশ করবে সে প্রশ্নে আবু বাকের বলেন, আমাদের সদস্য সংগ্রহ ও জনমত গঠন শেষ হলে আপনাদের নতুন দলের নাম জানিয়ে দিবো।
সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক আব্দুল কাদের বলেন, আন্দোলন চলাকালীন সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, বাম ছাত্রসংগঠনসহ একাধিক ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা এসে যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে সবাই তাদের নিজস্ব সংগঠনে ফিরে গেছেন। তবে এর বাইরে একটা বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থী এসেছিলেন, যারা কোনো সংগঠনের নয়। তাদের তো এখন যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। সেই দিকটা বিবেচনা করেই আমরা একটা ছাত্রসংগঠন প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে এখানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিভাজন হয়নি বা এখানে অনুমতি নেয়ার তেমন কিছু নেই।
সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক রিফাত রশিদ বলেন, আমাদের এই ছাত্রসংগঠন একটি আলাদা উদ্যোগ। আশা করি বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষার্থী ছাত্র রাজনীতি নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করবে, নতুন ছাত্রসংগঠন গড়ে তুলবে। এটা তেমনই একটি উদ্যোগ। এর সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি নির্দিষ্ট অরগানোগ্রাম আছে। সেখানে আহ্বায়ক, সদস্যসচিবরা তাদের মতো করে পরিচালনা করবেন। তারা তাদের মতো করে চলবেন। এটি একটি স্বতন্ত্র উদ্যোগ, এখানে নিজস্ব গঠনতন্ত্র এবং যে পলিসি, সে অনুযায়ী বাস্তবায়িত হবে।





