বিগত ২০১৯-২০ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ব্যয়বরাদ্দ পৌনে ৫ শতাংশ কমানোর পরও ৬ শতাংশের বেশি অবাস্তবায়িত থেকে গেছে। এ সময়ে অর্থের অভাবে মূল বাজেট বরাদ্দের তুলনায় সাড়ে ১০ শতাংশের বেশি ব্যয় করা যায়নি। মূলত রাজস্ব খাতে ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণে বিবেচ্য সময়ে উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন উভয় খাতে বরাদ্দের অর্থ খরচের রাস টেনে ধরতে হয়েছে। ফলে ২০১৮-১৯ বাজেটের প্রকৃত ব্যয় যেখানে জিডিপির ১৫.৩ শতাংশ ছিল তা বিগত অর্থবছরে ১৪.৮ শতাংশে নেমে এসেছে। একইভাবে কমেছে জিডিপির তুলনায় রাজস্ব অনুপাতও। এ সময়ে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ রাজস্ব ঘাটতি থেকে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির চূড়ান্ত লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়িয়েছে ৪৫.২ শতাংশ। অথচ চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশ রাজস্ব আদায় বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২০১৯-২০ অর্থবছরের চূড়ান্ত বাজেট বাস্তবায়ন রিপোর্ট থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। করোনা পরিস্থিতির কারণে রাজস্ব হিসাব চূড়ান্ত করতে অতিরিক্ত সময় লেগে যায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকগণ চলতি অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা এবং বাজেটের গুণগত মান বজায় রেখে বাস্তবায়ন মূল চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, করোনা পরিস্থিতির কারণে অর্থনীতিকে মূল ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য বাস্তবায়নের পাশাপাশি ৪৫ শতাংশের বেশি রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন অনেকখানি অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ ব্যাপারে ভেবে চিন্তে অর্থনীতির চাকাকে সচল করার উদ্যোগ নিতে হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট বাস্তবায়ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজেটের মোট ব্যয়ের চার লাখ ৪২ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বাস্তবে ব্যয় হয়েছে চার লাখ ১৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা। এটি আগের অর্থবছরের তুলনায় মাত্র ৬ শতাংশ বেশি। মূল্যস্ফীতিকে হিসাবে আনা হলে স্থিরমূল্যে বাজেটের ব্যয় এ সময় কমে গেছে। জিডিপির অনুপাতে বাজেট ব্যয় আগের বছরের তুলনায় ০.৬ শতাংশ কমে ১৪.৮ শতাংশে নেমেছে। অন্য দিকে বিগত অর্থবছরে রাজস্ব ও উন্নয়ন উভয় খাতেই কম ব্যয় বৃদ্ধির রেকর্ড স্থাপিত হয়েছে এবার। আগের বছরের তুলনায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ব্যয় বেড়েছে মাত্র ৪.৬ শতাংশ আর অনুন্নয়ন ব্যয় বেড়েছে মাত্র ৬.৯ শতাংশ। সাধারণভাবে ৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি এবং ৭-৮ শতাংশ অর্থনীতির বিকাশের মোট হার ১৩-১৪ শতাংশ বাজেট ব্যয় বৃদ্ধি পেলে জিডিপির তুলনায় বাজেট ব্যয়ের অনুপাত স্থির থাকে।
বাজেটের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে রাজস্ব আদায় না হওয়ার কারণে এবার বাজেট ঘাটতির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাও পার হয়ে গেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪.৮ শতাংশ। বাস্তবে এটি দাঁড়িয়েছে ৫.৩৮ শতাংশে। বাজেটের আয়ের তুলনায় ব্যয়ের ব্যবধান ঘুচাতে এক লাখ ৫০ হাজার ১৮০ কোটি টাকা দেশী-বিদেশী উৎস থেকে ঋণ নিয়ে জোগান দিতে হয়েছে। এর বড় অংশটাই নেয়া হয় ব্যাংকিং খাত থেকে। বাকিটা সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে নেয়া হয়েছে। এর বাইরে বিদেশী ঋণ ও অনুদান ঘাটতি অর্থায়ন মেটাতে কাজে লাগানো হয়েছে।
বাজেটের ঘাটতি অর্থায়নে অতিরিক্ত ব্যাংকনির্ভরতার কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে যেখানে মাত্র ৮.৬ শতাংশ ঋণের স্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে সেখানে সরকারি খাতের ব্যাংকঋণ বেড়েছে ৫৪ শতাংশ। সঞ্চয়পত্র খাতে নিট অর্থপ্রাপ্তি আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭১ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির কারণে সরকারকে বাজেট বাস্তবায়নের জন্য অধিকভাবে ব্যাংকঋণনির্ভর হতে হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বেসরকারি খাতের জন্য তহবিলপ্রাপ্তি কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৯-২০ অর্থবছরের সবচেয়ে দুর্বল দিক হলো রাজস্ব আয়। চূড়ান্ত হিসাবে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তিন লাখ ২০ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকার বিপরীতে দুই লাখ ৬৩ হাজার ৬২ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। এতে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৭.৯ শতাংশ এবং মূল বাজেট লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৩.৪ শতাংশ রাজস্ব ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। রাজস্ব আদায়ে সবচেয়ে বেশি ব্যর্থ হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বোর্ডের রাজস্ব আদায় আগের বছরের চেয়ে পৌনে ২ শতাংশ হ্রাস পেয়ে দুই লাখ ১৪ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকায় নেমেছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সংরক্ষিত তহবিল থেকে মুনাফা হিসাবে নিয়ে চূড়ান্তভাবে চলতি মূল্যে রাজস্বের ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি ঠেকানো হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে যেখানে করবহির্ভূত রাজস্ব খাত থেকে ২৫ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা আদায় হয়েছিল সেখানে করোনায় আক্রান্ত বিগত বছরে এ খাতের রাজস্বকে ৪২ হাজার ২৮২ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এতে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বিপুল রাজস্ব ঘাটতি হলেও ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির দুর্নাম থেকে রেহাই পাওয়া গেছে।
বিগত অর্থবছরের রাজস্ব দুরবস্থার কারণে চলতি অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ১৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু চলতি অর্থবছরে প্রথম পাঁচ মাস পার হওয়ার পর যে চিত্র তাতে এ খাতের দুরবস্থা কাটার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুসারে, জুলাই থেকে অক্টোবর ’২০ পর্যন্ত চার মাসে মাত্র ৩.৫৩ শতাংশ রাজস্ব আদায় বেড়েছে। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসের পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না বলে বোর্ড সূত্র থেকে জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুসারে, বৈদেশিক খাতের অবস্থাও মোটেই ভালো নয়। বিগত অর্থবছরে ১৬.৯ শতাংশ রফতানি কমে যায়। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়ে রফতানি ঋণাত্মক ধারা থেকে ধনাত্মক ধারায় এসেছে। তবে প্রবৃদ্ধি রয়ে গেছে ১ শতাংশের নিচে। আমদানি খাতের অবস্থাও নৈরাশ্যজনকই রয়ে গেছে। বিগত অর্থবছরে আমদানি ১১ শতাংশ কমেছে। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে কমেছে ১৩ শতাংশের মতো। এই আমদানি কমার প্রবণতার নেতিবাচক প্রভাব রাজস্ব আদায়ের ওপর পড়বে বলে রাজস্ব কর্মকর্তাদের আশঙ্কা।
অর্থনীতির সর্বক্ষেত্রে দুরবস্থার মধ্যেও রেমিট্যান্সের নিকটবাদ্য বেশ আশাব্যঞ্জক। বিগত অর্থবছরে রেমিট্যান্স ১০.৮৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আর চলমান অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে বেড়েছে ৪১.১৮ শতাংশ। ঘটিবাটি বিক্রি করে কর্ম হারিয়ে ফিরে আসা প্রবাসকর্মীদের আয়ে এই প্রবৃদ্ধি না হলে প্রবাস আয় বিপদ থেকে বৈদেশিক খাতকে রক্ষা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমদের মতে, বতর্মান সার্বিক পরিস্থিতি ও গত অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের অবস্থার প্রেক্ষিতে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। করোনা পরিস্থিতির কারণে দেশের অর্থনীতি এখন কোনো ক্ষেত্রেই ভালো নেই। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছর সরকার রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল তা ছিল উচ্চাভিলাষী। এটা অর্জন করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। কারণ আমদানি শুল্ক অনেক কমে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যেও বেশ ধীরগতি নেমেছে। শিল্পের উৎপাদন কমে গেছে। আয়ের উৎস কমেছে। বিভিন্ন ফিও কম হবে। রাজস্ব কোথা থেকে পাবে? সরকারের উচিত হবে ব্যয়কে যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা।
ড. সালেহউদ্দিন আহমদ নয়া দিগন্তকে আরো বলেন, ইতোমধ্যে সরকার অবশ্য ব্যয়কে টেনে ধরেছে। বড় প্রকল্প, বিশেষ করে মেগা প্রকল্পের প্রতি নজর দিয়েছে। সেগুলোকেই বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে। যার কারণে অন্যান্য প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি কম। ব্যাংকঋণও সরকার কম নিচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষ সরকারি ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল। এখন সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মন্থর হবে। সম্প্রতি বড় শিল্পগুলো উঠে দাঁড়াবার একটু চেষ্টা করছিল। কিন্তু এখন আবার খারাপ অবস্থা। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতেও রয়েছে ধীরগতি।
ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে ড. সালেহউদ্দিন আহমদের পরামর্শ হলো, এখন সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বিশেষ নজর দিয়ে এই খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সরকারি যে প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে সেটার বাস্তবায়ন ভালো হচ্ছে না। এ ব্যাপারে বিশেষ নজর দিতে হবে। ত্বরান্বিত করতে হবে প্যাকেজ বাস্তবায়নের কার্যক্রম।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, করোনা পরিস্থিতিই সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতিকে কাবু করেছে। তবে করোনার শুরুতে বাংলাদেশের অর্থনীতির যতটা খারাপ অবস্থা ছিল, এখন তার চেয়ে কিছুটা হলেও ভালো। গত অর্থবছর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়ার পেছনে করোনাভাইরাস পরিস্থিতিই মূল কারণ ছিল।
তিনি বলেন, এখনো আমরা সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। তবে লকডাউনের চেয়ে এখন বেটার আছি। এখনো চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে অর্থনীতি। অভ্যন্তরীণ সঙ্কট যেমন আছে, আন্তর্জাতিক সঙ্কটও আছে। তবে ভাইরাসের ব্যাপারে সরকার বেশ ভালো পদক্ষেপ নিয়েছিল।
নাজনীন আহমেদ বলেন, সরকার যে প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সেগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে পরিস্থিতি আরো ভালো হতো। বিশেষ করে এখন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের দিকে এই প্যাকেজের সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দিতে হবে। সার্বিকভাবে আমরা এখনো চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, সেখানে অর্জনের এখনো ছয় মাস সময় বাকি আছে। আর আমরা এখন আগের বছরের তুলনায় একটু বেশি ধরেই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করি। যাতে করে অর্জনটা ভালো হয়। এই অর্থবছরে অর্জন কতটা হবে তা এখনো বলা সম্ভব না। কারণ ছয় মাস এখনো পড়ে আছে। সঠিক পদক্ষেপে অর্থনীতি অনেক ভালো অবস্থানেও ফিরতে পারে। কারণ এই পরিস্থিতিতেও অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ ভালো আছে।
রাজস্ব বিপর্যয়ে অবাস্তবায়িত থেকে গেল ৬ শতাংশ বাজেট
জিডিপি অনুপাতে সরকারের আয়-ব্যয় দু’টিই কমলো
বিগত ২০১৯-২০ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ব্যয়বরাদ্দ পৌনে ৫ শতাংশ কমানোর পরও ৬ শতাংশের বেশি অবাস্তবায়িত থেকে গেছে। এ সময়ে অর্থের অভাবে মূল বাজেট বরাদ্দের তুলনায়...





