জোটগত নয়, যুগপৎ আন্দোলনে আগ্রহী দেশের নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ৩৭ রাজনৈতিক দল। গত কয়েক দিনে এসব রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথে কথা হলে তারা বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যুগপৎ আন্দোলন করতে আগ্রহী বলে নয়া দিগন্তকে জানান। তারা জানান, এই সরকার সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে দেশকে ও দেশের মানুষকে অনিশ্চিত আগামীর দিকে ঠেলে দিয়েছে। আমরা এ অবস্থার পরিবর্তন চাই। আর এ পরিবর্তনের জন্য দরকার একটি যুগপৎ গণ-আন্দোলন। সব বিরোধী রাজনৈতিক দল যদি নব্বইয়ের স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনের মতো একটি কার্যকর যুগপৎ আন্দোলন করতে সক্ষম হয়, তবেই এই সরকারের পতন সম্ভব। একটি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের যে দাবি, তা পূর্ণ করা সম্ভব।


কবে নাগাদ এ আন্দোলনের কর্মসূচি আসতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে বিভিন্ন দলের একাধিক শীর্ষ নেতা বলেন, এ আন্দোলন কর্মসূচি শুরু হয়ে গেছে। প্রাইমারি লেভেলে এই কর্মসূচি চলমান। বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আরো গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভেতরে ভেতরে আলোচনা হচ্ছে। সবাই সম্মত হলে এ বছরের ডিসেম্বরে যুগপৎ আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট কঠোর কর্মসূচি আসতে পারে বলেও জানান তারা।
যুগপৎ আন্দোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, আগামী ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় বিএনপির সমাবেশ হওয়ার কথা আছে। সেই সমাবেশের আগে বিএনপির পক্ষ থেকে জাতির উদ্দেশে একটি ডাক আসতে পারে। সেখানে তারা সুনির্দিষ্ট কিছু দফা উল্লেখ করবেন। সেখানে সম্ভবত আমরাও থাকব। সেসব দফার সাথে যারা একমত হবেন এবং এরই মধ্যে বিএনপির সাথে যারা সংলাপে বসে যুগপৎ আন্দোলনের পক্ষে ঐকমত্য পোষণ করেছেন তারা যুগপৎ আন্দোলনের ভিত্তিতে কর্মসূচি পালন করবেন।


এ বিষয় জানতে চাইলে এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল অলি আহমেদ (বীর বিক্রম) নয়া দিগন্তকে বলেন, বিএনপির সাথে আমরা তিনবার সংলাপ করেছি। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে, এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাওয়া হবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন করতে হবে। এই সংসদ ভেঙে দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। আমরা এসব সিদ্ধান্তে ঐকমত্য হয়েছি। এখন বিএনপির পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট যে কর্মসূচি আসবে, তা বাস্তবায়নের জন্য এলডিপি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা ও ভাসানী অনুসারী পরিষদের মহাসচিব শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু বলেন, আমরা চাই আজকেই এই সরকারের পতন হোক। সে লক্ষ্যে আমরা যুগপৎ আন্দোলনের পক্ষে। তবে জোটগতভাবে ‘গণতন্ত্র মঞ্চের’ সাথে বিএনপির এখনো সংলাপ হয়নি। আমরা আগামী শনিবার বাংলাদেশ জাসদের সাথে সংলাপে বসব এবং এরপর আমাদের সাতদলীয় জোট ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ জোটগতভাবে বিএনপির সাথে সংলাপে বসব। তার পরই আমরা ৭ দল ও আমাদের জোট আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে পারব।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, আমরা এ সরকারের পতনের জন্য একটি যুগপৎ আন্দোলনের বিষয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা করেছি। আমরা কিছু বিষয় ঐকমত্য হয়েছি। আরো আলোচনা হবে। শিগগিরই আপনারা এর ফলাফল জানতে পারবেন।


গণফোরাম নেতা মোস্তফা মহসিন মন্টু বলেন, আমরা ২০১৮ সাল থেকে বিএনপির সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করে আসছি। এখনো আমরা একটি যুগপৎ আন্দোলনের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে কথা বলেছি। এ জন্য বিভিন্ন জেলায় আমাদের সাংগঠনিক তৎপরতা চলছে। ইনশা আল্লাহ ডিসেম্বরের মধ্যে আমরা একটি সিদ্ধান্তে ঐকমত্য হয়ে এই গণবিরোধী সরকারের পতন ঘটাতে সক্ষম হবো। একটি নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবো।
এ ছাড়া বাম গণতান্ত্রিক জোটের ছয় দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, ‘গণতন্ত্র মঞ্চের’ ৭ দল জেএসডি, নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদ, ভাসানী অনুসারী পরিষদ ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, ২০ দলীয় জোটের সব ক’টি দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বিএনপি, গণফোরাম, নাগরিক ঐক্য, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশসহ মোট ৩৭টি রাজনৈতিক দল যুগপৎ আন্দোলনের স্বপক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন।
উল্লেখ্য, নাগরিক ঐক্য ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট উভয় জোটে আছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিগত দুটো জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে আলাদা প্রেক্ষাপটে হবে। কারণ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে আর ছাড় দিতে রাজি না। তাই তারা অনেক মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও আগামী জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যুগপৎ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখবে।