গ্রামগঞ্জে শীত পড়তে শুরু করেছে। খুব একটা অনুভূত না হলেও সন্ধ্যা হতেই মৃদু শীত পড়তে শুরু করেছে রাজধানী ঢাকাতেও। আবহাওয়াবিদদের ধারণা, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি ভালোভাবে শীত পড়বে। আর এই শীতের আগমন ঘটতেই পরিবর্তন আসছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের হকার ও ফুটপাথ ব্যবসায়। এতে রাজধানী ঢাকায় হকার ও ফুটপাথের অনেক ক্ষদ্র ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসা হারাচ্ছেন। আবার এদের মধ্যে কেউ কেউ তাদের ব্যবসার পণ্য পরিবর্তন করে ভিন্ন পণ্য নিয়ে নামছেন ব্যবসায়।
গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন স্থানের ফুটপাথ ব্যবসায়ী ও হকারের সাথে কথা বলে এমনটাই জানা যায়।
এসব ব্যবসায়ী নয়া দিগন্তকে জানান, শীতের আগমনে মানুষের পোশাক আর খাবারে এসেছে পরিবর্তন। সন্ধ্যা ও সকালের নাশতায় যুক্ত হয়েছে শীতের পিঠা। গ্রামের মতো খেজুরের রসের দেখা রাজধানীতে না মিললেও শীতের হরেক রকমের পিঠা এখন নগরীর অলিতে গলিতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে ভাপা পিঠাই সবচেয়ে জনপ্রিয়। দিনের শুরুতে বা দিনের শেষে ভাপা পিঠা পাওয়া যায় নগরীর রাস্তায় রাস্তায়। বিশেষ করে সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে বন্ধুদের আড্ডায়ও বেশ জায়গা করে নিয়েছে শীতের এই পিঠা।
বরিশাল থেকে ঢাকায় আসা হকার রফিকুল আমিন রাজধানীর বিভিন্ন গণপরিবহনে পানি ও কোল্ড ড্রিংকস বিক্রি করেন। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, রাস্তায় পানির চাহিদা কমে গেছে। এখন পানি তেমন চলে না। পানি ও কোল্ড ড্রিংকসের ব্যবসায় মন্দা শুরু হওয়ায় আমার সাথের অনেকে পিঠা ও সিদ্ধ ডিমের দোকান দিয়েছে। আবার অনেকে গ্রামে চলে গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গুলিস্তানে মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামের সামনে শরবত বিক্রেতা নয়া দিগন্তকে বলেন, হালকা শীত থাকায় শরবতের চাহিদা কমে গেছে। দিনে কিছু বেচাকেনা হলেও সন্ধ্যার পর তেমন বিক্রি হয় না। তাই ভাবছি কয়েকদিন পরে হালিম বা অন্য কিছু নিয়ে বসব।
রফিকুল আমিনের মতো রাজধানীর ভ্রাম্যমাণ ফুটপাথের অনেক ব্যবসায়ী ও হকাররা শীতের আগমনে তাদের ব্যবসায় এনেছেন পরিবর্তন। গরমে ফুটপাথে শরবত বিক্রি করার পরিবর্তে এখন বিক্রি হচ্ছে ভাপা পিঠা। এতে আয় বাড়ছে।
ফুটপাথের অন্যান্য খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও ভাপা এবং শীতকালীন চিতই পিঠার মান নিয়ে ক্রেতাদের নেই কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব। একাধিক ক্রেতার সাথে কথা বললে তারা জানান, এসব পিঠায় ভেজাল করার কোনো সুযোগ থাকে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে ভাপা পিঠা বিক্রেতা মো: ইব্রাহীমের সাথে কথা বলে জানা যায়, তিনি ২০ বছর আগে চাঁদপুরের মতলব থেকে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ রহমান হলে চাকরি নেন। গরমের সময় তিনি শরবত বিক্রি করতেন। এখন শীতকালে ভাপা পিঠা বিক্রি করছেন। প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ শ’ পিঠা বিক্রি করেন। শরবত বিক্রি করে দিনে ৬০০-৭০০ টাকা আয় হলেও, পিঠা বিক্রি করে তার দৈনন্দিন আয় দেড় থেকে দু’হাজার টাকা। স্ত্রী, ছোট শিশু দুই সন্তান ও মাকে নিয়ে ভালো আছেন বলেও জানান তিনি। চাঁদপুর শহর থেকে আসা আরেক ফুটপাথে পিঠা বিক্রেতা ফারুক মিয়া বলেন, গরমে শরবত বিক্রি করতাম এখন পিঠা বিক্রি করি। এ সময় মাঝে মধ্যে টিএসসি থেকে হঠাৎ দোকান উঠিয়ে দেয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, আমরা ফুটপাথে ব্যবসা করে কয়েক টাকা ইনকাম করি। কিন্তু প্রাই আমাদের এখান থেকে বাঁশি বাজিয়ে তুলে দেয়া হয়। যদি ঠিকঠাক মতো ব্যবসাটা করতে পারি তবে দু’বেলা পরিবার নিয়ে খেয়ে বাঁচতে পারতাম।
রাজধানীর শনিরআখড়া এলাকার পিঠা বিক্রেতা আবুল হোসেনের সাথে কথা বলে জানা যায়, শীতের আগে তিনি নিয়মিত আলুর চপ, পেঁয়াজু, বেগুনি দিয়ে মুড়ি বানিয়ে বিক্রি করতেন। এখন তিনি এসবের পাশাপাশি ভাপা পিঠা ও চিতই পিঠা বিক্রি করেন। তার এই কাজে তাকে সহযোগিতা করেন তার মা ও স্ত্রী। এই শীতের সময়ে পিঠা বিক্রি করে যে অতিরিক্ত টাকা আয় হবে, তা দিয়ে তিনি ঋণ পরিশোধ করবেন বলে জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে সাইফুর রহমান শান্ত নামে এক পিঠা ক্রেতার সাথে কথা বলে জানা যায়, শীতের আগমনে টিএসসি চত্বরে এসে বন্ধুরা একত্রিত হয়েছি। এখানে অনেক শীতের পিঠার দোকান বসেছে। আমাদের উদ্দেশ শীতের পিঠা খাওয়ার পাশাপাশি আড্ডা দেয়া।
আরেক ক্রেতা তানজিন আহসান মৌ বলেন, ছোটবেলা গ্রামে মাকে বাসায় পিঠা বানাতে দেখতাম। এখন তো সেভাবে গ্রামে যাওয়া হয় না আর মায়ের হাতের পিঠা খাওয়া হয় না। তাই শীতের পিঠা খাবার আনন্দটা এখানেই উপভোগ করছি।
প্রকৌশলী তানিয়া সুলতানা জানান, শীতের পিঠার মজাই আলাদা। সারা দিন অফিসে কাজকর্ম করে বাসায় এসে পিঠা বানানোর ধৈর্য থাকে না। তাই ছোট বোনকে নিয়ে পিঠা খেতে এখানে চলে এসেছি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মনসুরা আলম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির আগে যখন গ্রামে ছিলাম তখন মা এবং আমার চাচীরা পিঠা বানাতো। আমরা চুলার পাশে বসে গরম গরম পিঠা খেতাম। কিন্তু শহরের ব্যস্ত জীবনে এখন আর মায়ের হাতে সেই পিঠা খাওয়া হয় না। তাই শীতের আগমনে টিএসসির পিঠা খেয়ে সেই স্বাদ পূরণের চেষ্টা করছি।