দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোতে ইসির ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ, অগণতান্ত্রিক ও বিতর্কিত বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন দেশের বিশিষ্টজনেরা। গতকাল সোমবার আলাপকালে তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন।
বিশিষ্টজনেরা মনে করছেন, নির্বাচন কমিশনের উচিত রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া। বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল যে প্রক্রিয়ায় হলে নির্বাচনের প্রতি মানুষ আস্থাশীল হবে সেটাকেই প্রাধান্য দেয়া। নতুন পদ্ধতির সাথে সাধারণ ভোটার কতটা পরিচিত ও অভ্যস্ত সেটাও গুরুত্ব দিতে হবে। এগুলো গুরুত্ব না দিয়ে ইসি একটা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারে না।
তারা বলেন, নির্বাচনে প্রযুক্তির মাধ্যমে ভোটগ্রহণ দেখানো মূল বিষয় না বা এটা কোনো ক্রেডিট না। নির্বাচনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো যদি আস্থাশীল হয় তবে সেটাই হবে নির্বাচন কমিশনের সফলতা, ইভিএম ব্যবহার নয়।
তারা আরো বলেন, ইভিএম নিয়ে ইতোমধ্যে বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো আপত্তি জানিয়েছে। তাই ইসির উচিত তাদের আপত্তিকে সম্মান জানানো, গুরুত্ব দেয়া। কারণ রাজনৈতিক দলগুলোকে কেন্দ্র করেই নির্বাচন। ইসি তাদের মতামতকে অবজ্ঞা করতে পারে না। কারণ তাদের মতামতই জনগণের মতামত। যেহেতু ভোটাররা এসব রাজনৈতিক দলের কর্মী বা সমর্থক, তাই রাজনৈতিক দলগুলো যে পদ্ধতিতে আপত্তি জানাচ্ছে নির্বাচন কমিশনের কোনোভাবে উচিত হবে না সেই পদ্ধতি প্রয়োগ করা।
প্রসঙ্গত, সংবিধান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারির মধ্যে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন হবে। সংসদে সাধারণ আসন রয়েছে ৩০০টি। গত ২৩ আগস্ট ইসির কমিশন মিটিংয়ে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫০ আসনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়। এরপরই বিএনপিসহ দেশের বিরোধী দলগুলো ইসির এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে। তারা বলছে, ইসি আওয়ামী লীগ সরকারের আজ্ঞাবহ। এই সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যানসহ এর বিরোধিতা করছে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি। এ ছাড়া সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল ইসির এ সিদ্ধান্তকে ভোট চুরির প্রকল্প বলে মনে করছে।
পরে বিএনপিসহ একাধিক বিরোধী রাজনৈতিক দলের ইভিএম বিরোধিতার মুখে গত ২৪ আগস্ট নির্বাচন ভবনে নিজের কার্যালয়ে ইভিএমে নির্বাচন প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছিলেন, ‘আমরা একটি দলের চাওয়া বা কারো চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে নয়, আমরা বিরোধিতাগুলোকেও বিবেচনায় নিয়েছি। একটি দল ইভিএমের পক্ষে বলেনি, বেশ কয়েকটি দল পক্ষে বলেছে। কিছু কিছু দল শর্ত সাপেক্ষে বলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়েছি।’
তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ করা ছাড়াও তারা দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি পর্যালোচনা করে ইভিএম বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের তাড়াহুড়া ছিল না এবং এ সিদ্ধান্ত কমিশনের নিজস্ব। ইভিএমে যাওয়ার একটা বড় সিদ্ধান্ত আমাদের নিজেদের। ভোটটাকে রাজনৈতিক দল হ্যান্ডেল করবে না, হ্যান্ডেল করবে ইসি। আমরা কমিশন কিন্তু পুরোপুরি আস্থাশীল হয়েছি, একেবারে সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আপাতত ১৫০ সিটে আমরা ইভিএম ব্যবহার করব।
১৫০ আসনে ইভিএম ব্যবহারের বিষয় মতামত জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি যতটুকু শুনেছি ইভিএমের জন্য টাকা না পেলে ইসি এখন ৭০ আসনে ইভিএম ব্যবহার করতে চায়। এখন তারা দায়িত্বে আছেন, তারা যদি মনে করেন কারো পরোয়া করি না তবে যা চাইবেন তাই করবেন। আপনি আমি তো আটকাতে পারব না। আর যদি মনে করেন সবার মতামতের গুরুত্ব দেবে তবে তাদের মনোভাব সেক্রিফাইজ করতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, বিরোধী কোনো রাজনৈতিক দল ইভিএম চায় না। নির্বাচন কমিশন একটি দলের আজ্ঞাবহ হয়ে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে বাড়াবাড়ি করছে। ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের একটি ভুল ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত।
অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশটা বিতর্ক তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে। এরমধ্যে নির্বাচন কমিশন নতুন একটি বিতর্ক তৈরি করছে। রাজনৈতিক দলগুলো ইভিএম চাচ্ছে না। উনাদের ইভিএমে নির্বাচন করতে হবে কেন? রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে গিয়ে ইসি কাদের নিয়ে নির্বাচন করবেন?
তিনি বলেন, একটি নির্বাচন কমিশনের প্রথম কাজ হচ্ছে সব রাজনৈতিক দলকে তাদের আস্থায় আনা। এই নির্বাচন কমিশন তো সেটা পারছে না। তাহলে তারা কিভাবে নির্বাচন পরিচালনা করবেন।
সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, একটি আসনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্তকেও আমি বিতর্কিত বলব। এটি একটি জঘন্য মেশিন। এই মেশিনের মাধ্যমে সহজে ভোট কারচুপি করা যায়। তাই ইভিএমে নির্বাচন হলে জাতি একটি ভয়াবহ সঙ্কটে পড়বে।





