রমজানের প্রথম দিনেই রাজধানীতে ইফতারির ব্যাপক আয়োজন দেখা গেছে। বিশেষ করে রাজধানীর কাওরান বাজার, ফার্মগেট, মতিঝিল, পল্টন, কাকরাইল, চকবাজার, নতুন বাজার, মহাখালী ও বেইলি রোড ফুটপাথে বাহারি খাদ্যপণ্যে সাজানো হয়েছে ইফতারির দোকান। পছন্দের ইফতার পণ্য পাওয়ায় ক্রেতারা যেমন খুশি, তেমনি বিক্রি ভালো হওয়ায় সন্তুষ্ট বিক্রেতারাও। তবে অন্য বছরের চাইতে পণ্যের মূল্য অনেক বেশি হওয়ায় কিছুটা অস্বস্তিতে ক্রেতারা।
পেঁয়াজু, বেগুনি, ডিম ও চিকেন চপ, বিফ স্টিক, শামি কাবাব, রেশমি কাবাব, সুতিকাবাব, হালিম, কাটলেটসহ বাহারি ইফতার কেনা-বেচায় ব্যস্ত এই এলাকার ক্রেতা-বিক্রেতারা।
সরেজমিন দেখা যায়, রাজধানীর মতিঝিলের অফিসপাড়ার ফুটপাথে স্বল্প মূল্যে বিক্রি হচ্ছে বাহারি ইফতার। রমজান উপলক্ষে স্থাপিত বিভিন্ন দোকানে বিকেল থেকে এসব দোকানে ইফতার কিনতে দেখা গেছে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষকে। গতকাল শুক্রবার (২৪ মার্চ) রাজধানীর পল্টন, মতিঝিল, ফার্মগেট, কাওরানবাজার ও বেইলি রোড এলাকা ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে। বিশেষ করে নতুন বাজার থেকে আবুল হোটেল পর্যন্ত প্রায় পুরো রাস্তার দুই ধারে ছিল ইফতারির বাহারি পসরা, সাথে ক্রেতাদের ছিল উপচে পড়া ভিড়।
দোকানিরা বলছেন, তীব্র যানজটের কারণে অনেকেই ইফতার কাওরানবাজারসহ এসব এলাকায় সেরে বাড়ি ফেরেন। তাই নিম্ন আয় ও কর্মব্যস্ত মানুষের ইফতারির বড় ভরসা ফুটপাথের এসব দোকান। অভিজাত হোটেলের মতো দামি ইফতার সামগ্রী না থাকলেও ফুটপাথের এসব দোকানে বাহারি পদের অভাব নেই।
বেগুনি, পেঁয়াজু, ছোলার ঘুগনি, মুড়ি, জিলাপি, জালি কাবাব, চিকেন হালিম, গরু ও খাসির হালিম, আলু সমুচা, বিফ সমুচা, আলুর চপ, শাকের চপ, ভেজিটেবল রোলসহ বাহারি ইফতারি অল্প দামেই কিনছেন কর্মব্যস্ত ও নি¤œ আয়ের মানুষেরা।
দোকানিরা জানান, বেগুনি, পেঁয়াজু, সমুচা, আলুর চপ প্রতি পিস বিক্রি হচ্ছে ৫ টাকা করে। তবে ডিমের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় গত বছরের চাইতে ১০ টাকা বেড়ে ডিমের চপ হয়েছে ২৫ টাকা, জালি কাবাব ১৫ টাকা, ভেজিটেবল রোল ২০ টাকা, জিলাপি প্রতি কেজি ১৮০ টাকা, বুন্দিয়া কেজি ১৮০ টাকা, চিকেন ললি পপ ৩০ টাকা পিস, চিকেন বল ১৫ টাকা পিস, হালিম ছোট বাটি ৬০ টাকা, মাঝারি ১২০ টাকা, লুচি ১০ টাকা পিস, চিকেন পেটিস ৩০ টাকা পিস বিক্রি হচ্ছে।
মতিঝিলের ব্যাংক পাড়ায় ইফতারির দোকান নিয়ে বসা মো: শফি নয়া দিগন্তকে বলেন, দুই যুগের বেশি সময় ধরে এখানে ইফতার সামগ্রী বিক্রি করছি। আমাদের কাছ থেকে সাধারণত বিভিন্ন অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ইফতারি কিনে নিয়ে যান। ছোলা, মুড়ি, বেগুনি, পেঁয়াজু, আলুর চপ, জিলাপি স্বল্প মূল্যে বিক্রি করেন বলে জানান শফি। তিনি আরো জানান, কেউ চাইলে দোকানে বসেও ইফতার করতে পারেন। আবার চাইলে ইফতার নিয়েও যেতে পারেন। একজন চাইলে ৪০ থেকে ৫০ টাকার মাধ্যমে ভালোভাবে ইফতার করতে পারবেন। তিনি বলেন, অন্যান্য বছরের চাইতে জিনিসের দাম বেশি থাকার কারণে দাম একটু বেশি পড়ছে। গত বছরও এখানে ৩০ টাকার মধ্যে একজন রোজাদার ইফতার করেছেন।
দৈনিক বাংলা মোড়ের ইফতার বিক্রেতা মো: ফারুক বলেন, গত দুই বছর করোনার কারণে বেচাকেনা কম ছিল। এবার একটু বেশি ক্রেতা থাকবে বলে আশা করছি। দুই-চার দিন গেলে বোঝা যাবে।
তিনি বলেন, আমরা রোজাদারদের চাহিদা ও পছন্দ অনুযায়ী ইফতারি বানাই। বেগুনি, পেঁয়াজু, আলুর চপ, হালিম, জিলাপি, সমুচা, ভেজিটেবল রোল, ভেজিটেবল চপ, ঘুগনিসহ ইফতারির প্রায় সব আইটেমই আমাদের কাছে আছে। হোটেলে এসব আইটেমের যে দাম আমরা তা থেকে অনেক কম রাখি।
ইফতার কিনতে আসা বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, ইফতার অফিসে করতে হবে। তাই আসরের নামাজ পড়ে ইফতার কিনে নিলাম। গত দুই বছর এখান থেকে ইফতার কিনি। মতিঝিল দিলকুশার ইফতারি বিক্রেতা রফিক বলেন, একজন রোজাদার অল্প টাকায় ইফতারি করতে পারেন- এই চিন্তা করেই আমরা ইফতারির খাবার তৈরি করি।
রাজধানীর বেইলিরোডে ইফতার কিনতে আসা আসাদুজ্জামান হেলাল নামে এক ক্রেতা নয়া দিগন্তকে বলেন, গত কয়েক বছর করোনার সংক্রমণ থাকায় বাইরে ইফতার পাওয়া যায়নি। গত বছর থেকে আবার ইফতারের দোকান জমেছে, এটা ভালো দিক। তবে এ বছর তুলনামূলকভাবে ইফতারের দাম অনেক বেশি। যা সাধারণ কর্মজীবীদের ক্রয় ক্ষমতার বইরে।
রাজধানীর বাইতুল মোকাররমে খেজুর কিনতে আসা মতিউর রহমান বলেন, গত বছর যে খেজুর কিনেছি ২২০ টাকা কেজি, এ বছর তা ৩০০ টাকা কিনতে হলো।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, রমজানে সারা পৃথিবীতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য কমানো হয়। আর আমাদের দেশে পণ্যের মূল্য ২-৩ গুণ আবার কোনো ক্ষেত্রে আরো বেশি বাড়ানো হয়। এই সংস্কৃতি থেকে আমরা বের হতে না পরলে সমাজের নির্দিষ্ট একটা শ্রেণীর মানুষ ছাড়া অন্যরা অভুক্ত থাকবে।