২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছে। সে ক্ষেত্রে ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারির মধ্যে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন শেষ করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় গত ১৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচন ভবনের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

তাই নির্বাচনী বছরে বিগত দু’টি জাতীয় নির্বাচনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে সরকার পতনের এক দফা দাবিতে রাজপথে সক্রিয় বিএনপিসহ তাদের সাথে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা সমমনাবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। যুগপৎ আন্দোলনের অংশ হিসেবে একের পর এক রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করে আসছে দলগুলো। সেই ধারাবাহিকতায় আগামী ২৭ জুলাই রাজধানীতে মহাসমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো। একই দিনে দেশব্যাপী বিএনপি-জামায়াতের হত্যা, ষড়যন্ত্র, নৈরাজ্য ও তাণ্ডবের প্রতিবাদে ‘তারুণ্যের জয়যাত্রা’ ব্যানারে ঢাকায় সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে যুবলীগ। তবে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল গত শনিবার শান্তি সমাবেশে জানিয়েছিলেন ২৪ জুলাই সমাবেশ হবে। পরে যুবলীগের দফতর থেকে জানানো হয়, এ সমাবেশ হবে ২৭ জুলাই। একই দিনে রাজধানীতে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সঙ্ঘাত ও সহিংসতার আশঙ্কা করছে খোদ বিএনপিসহ তাদের সাথে আন্দোলনে থাকা সমমনা দলগুলো।

গত সোমবার দুপুরে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যৌথসভা-পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করে বলেন, সরকার পতনের এক দফা দাবিতে বিএনপির ডাকা ২৭ জুলাই মহাসমাবেশের দিন রাজধানীতে যুবলীগের সমাবেশের ঘোষণা দেয়ার মাধ্যমে সরকার সঙ্ঘাত সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। কোনো ধরনের সঙ্ঘাত হলে এর দায়ভার সরকারকে নিতে হবে। এ সময় সরকারি দলকে তাদের সমাবেশের তারিখ পরিবর্তনের আহ্বান জানান তিনি।
তবে একই দিনে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক উপকমিটির পরিচিতি সভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপির ২৭ জুলাইয়ের সমাবেশ ঘিরে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কোনো সঙ্ঘাতের আশঙ্কা নেই। কোনো উসকানি আওয়ামী লীগ দেবে না। কিন্তু কেউ যদি সঙ্ঘাত সৃষ্টি করে, তখন জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেবে আওয়ামী লীগ সরকার।

তবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য উড়িয়ে দিয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেছেন, আগামী ২৭ জুলাই অনুষ্ঠেয় বিরোধী দলের কর্মসূচি দেখে সরকারের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। সমাবেশে কী হবে সেই চিন্তায় তারা গায়েবি মামলা দিতে শুরু করেছে। মারা যাওয়ার ২০ বছর পরও অনেককে মামলার আসামি করা হয়েছে। মোটকথা আওয়ামী লীগ শান্তি সমাবেশ আহ্বান করে অশান্তি সৃষ্টি করতে চাচ্ছে।
সঙ্ঘাতের আশঙ্কার বিষয় জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না নয়া দিগন্তকে বলেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন আমরা কোনো সঙ্ঘাত চাই না। তিনি বলেন, তোমরা (ওবায়দুল কাদের) যদি সঙ্ঘাত না চাও তাহলে আমরা যে দিন সমাবেশ দিয়েছি তোমরা সে দিন সমাবেশ দিয়েছ কেন? সর্বশেষ শুনলাম আওয়ামী লীগ সোহরাওয়ার্দীতে সমাবেশের অনুমতি চেয়েছে। এখানে তো বিএনপিও অনুমতি চেয়েছে। তা হলে তোমরা যদি সঙ্ঘাত না চাও তাহলে তোমরা একই স্থানে অনুমতি চাচ্ছো কেন? এটিই তো প্রমাণ করছে তোমরা পায়েপারা দিয়ে সঙ্ঘাতের চেষ্টা করছ।

এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল অলি আহমদ নয়া দিগন্তকে বলেন, বিগত প্রায় এক বছর ধরে বিএনপি ও তাদের সাথে থাকা সমমনা দলগুলো যখনই কর্মসূচি দিয়েছে, আওয়ামী লীগ একই দিনে পাশাপাশি স্থানে শান্তির নামে কর্মসূচি পালন করেছে। এটি সুষ্ঠু রাজনীতি হতে পারে না। এ থেকে মনে হয় আওয়ামী লীগ ইচ্ছাকৃতভাবে গায়ে পরে ঝগড়া লাগাতে চাচ্ছে। তাই আমি বলব তারা যদি শান্তিতে বিশ্বাস করে, দেশের কল্যাণ চায়, দেশের মানুষের কল্যাণ চায় তবে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পরিহার করে ভিন্ন ভিন্ন তারিখে কর্মসূচি পালন করবে।
কল্যাণপার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল সৈয়দ ইবরাহিম বীর প্রতীক নয়া দিগন্তকে বলেন, আওয়ামী লীগ সঙ্ঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তা না হলে তারা ২৪ তারিখের সমাবেশ ২৭ তারিখ নিয়ে আসত না। কারণ ২৭ তারিখ বিরোধীদের মহাসমাবেশ তাদের কর্মসূচি আগেই ঘোষিত হয়েছিল। তাই আমি সঙ্ঘাতের পথ পরিত্যাগের আহ্বান জানাচ্ছি। আওয়ামী লীগকে বলব, রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়ে মোকাবেলা করুন। সঙ্ঘাত আমাদের জাতির জন্য কল্যাণকর নয়।

বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান নয়া দিগন্তকে বলেন, ২৭ তারিখ রাজধানী ঢাকা হবে মিছিলের নগরী। ব্যাপক সমাগমের আঁচ পেয়ে সরকার এরই মধ্যে হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করছে। আমরা সঙ্ঘাত চাই না, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করতে চাই। তবে কেউ যদি বিনা উসকানিতে আমাদের ওপর হামলা চালিয়ে সঙ্ঘাতের পথে ঠেলে দেয়, তবে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমরা কাউকে ছাড় দেবো না।
গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকার মরণ কামড় দিতে চাচ্ছে। তাই তারা হামলা করে, সঙ্ঘাত সৃষ্টি করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে বিরোধীদের মনোবল ভাঙার চেষ্টা করবে। তবে জনগণের সম্মিলিত যে শক্তি তার সামনে সরকারের কোনো কিছু করার সক্ষমতা আছে বলে আমি মনে করি না।
বিপ্লবী ওয়াকার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকার ইচ্ছে করে সন্ত্রাস সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। আওয়ামী লীগ পরিকল্পিতভাবে নানা ধরনের উসকানি দিচ্ছে। তবে সরকারের এসব অপচেষ্টা ও উসকানিতে আমরা বিন্দুমাত্র ভীত না। এবার আমরা সব কিছু মোকাবেলা করে আমাদের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করব।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা: শাখাওয়াত হোসেন সায়ান্ত নয়া দিগন্তকে বলেন, বিএনপি যখন কর্মসূচি দেয়, আওয়ামী লীগ একই দিনে পাশাপাশি কর্মসূচি পালন করে। এটি স্পষ্ট সঙ্ঘাতের উসকানি। কারণ বিএনপি কর্মীরা দীর্ঘ ১৪ বছর হামলা মামলার শিকার। তাই সঙ্ঘাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তখন সরকারের মামলা দিয়ে কোণঠাসা করতে সুবিধা হবে। সে কারণে ইচ্ছাকৃতভাবে সরকার সঙ্ঘাতের অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল নয়া দিগন্তকে বলেন, নিকটাতীতে আমরা দেখেছি সরকার তিন পদ্ধতিতে বিরোধী দলকে দমন করে। প্রথমত, সরকার উসকানি দিয়ে সঙ্ঘাত তৈরি করে। এরপর পুলিশ দিয়ে মামলা দেয়। তার পর আদালতকে ব্যবহার করে জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠায়। সর্বশেষ সন্ত্রাসের মতো মিথ্যা অপবাদ দিয়ে দমন-পীড়ন চালায়। তাই ২৪ জুলাইয়ের সমাবেশ ২৭ জুলাই স্থানান্তর করে, পার্টি অফিস বাদ দিয়ে বিএনপির সমাবেশের অরো কাছাকাছি বায়তুল মোকাররম এসে সমাবেশের ঘোষণাকে সঙ্ঘাত সৃষ্টির আলামত মনে হচ্ছে; যা অতীতেও হয়েছে। তবে আমি বলব, সরকারের সঙ্ঘাতের পথ এড়িয়ে চলা উত্তম। অতীতে এসব কাজ এত বেশি হয়েছে, মানুষ তাতে বিরক্ত।