নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধারক সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। দেশের বেশির ভাগ বিরোধী রাজনৈতিক দল যুগপৎ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। বিএনপির নেতৃত্বে যুগপৎ ধারায় তারা ইতোমধ্যে নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে। সেই ধারাবাহিকতায় গতকাল টানা ১৫ দিনের যুগপৎ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপিসহ যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো।
রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অসুস্থ থাকায় তিনি উপস্থিত থাকলেও তার বদলে দলের এই স্থায়ী কমিটির সদস্য কর্মসূচি ঘোষণা করেন। টানা ১৫ দিনের কর্মসূচিতে সরকার পতনের এক দফা দাবিতে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনাসহ ছয় বিভাগে রোডমার্চ-সমাবেশ করবে দলটি।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা জেলার জিনজিরা, কেরানীগঞ্জ ও গাজীপুরের টঙ্গীতে সমাবেশ করবে বিএনপি। ২১ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেটে রোডমার্চ করবে বিএনপি। ২২ সেপ্টেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনায় বাদ জুমা সারা দেশের জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া ২৩ সেপ্টেম্বর বরিশাল বিভাগের রোড মার্চ, ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার রায়ের বাজার ও আমিন বাজারে দু’টি সমাবেশ, ২৬ সেপ্টেম্বর খুলনা বিভাগে রোডমার্চ এবং একই দিনে ঢাকায় পেশাজীবীদের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।
২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার গাবতলী ও নারায়ণগঞ্জে ফতুল্লায় সমাবেশ, ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকায় মহিলা দলের সমাবেশ, ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় শ্রমজীবীদের সমাবেশ, ১ অক্টোবর ময়মনসিংহ থেকে কিশোরগঞ্জ রোডমার্চ, ২ অক্টোবর ঢাকায় কৃষক সমাবেশ ও ৩ অক্টোবর কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামে রোডমার্চ অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া আলাদা-আলাদা স্থানে সংবাদ সম্মেলন করে একই কর্মসূচি ঘোষণা করে ১২ দলীয় জোট, গণতন্ত্র মঞ্চ, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, সমমনা পেশাজীবী জোট, এলডিপি, লেবার পার্টি, গণফোরাম, পিপলস পার্টি ও বাম গণতান্ত্রিক জোট।
উল্লেখ্য, গত ১৮ জুলাই (মঙ্গলবার) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগসহ নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক দফা দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন যুগপৎ আন্দোলনের প্রথম কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। সে দিন সকাল থেকে রাজধানীর অন্তত আটটি পয়েন্ট হতে বিএনপি ও বিরোধী দলগুলো পদযাত্রার মাধ্যমে এ কর্মসূচি শুরু করে। দেশের ৩৭টি রাজনৈতিক দল ও সংগঠন এই যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেয়।
এর পর থেকেই একটি গুঞ্জন ছিল সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় সরকার পতনের চলমান আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করতে পারে। বিএনপির পক্ষ থেকে টানা ১৫ দিনের যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার পর থেকে সেই গুঞ্জন আরো শক্তিশালী রূপ ধারণ করে। বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সাথে কথা বলে এই গুঞ্জনের সত্যতার বিষয়ে অনেকটা আভাস পাওয়া যায়।
যুগপৎ আন্দোলন কোন পর্যায়ে আছে- এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির বলেন, এই সরকারের পায়ের নিচে মাটি নেই। আমরা সরকার পতনের যে যুগপৎ আন্দোলন নিয়ে মাঠে আছি সেটি চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। যেকোনো মুহূর্তে জনগণ এ সরকারের পতন ঘটাবে। সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত জনগণ রাজপথ থেকে ঘরে ফিরবে না।
এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব:) অলি আহমেদ বলেন, আমরা একটি বৃহত্তর আন্দোলনের সূচনালগ্নে আছি। এখান থেকে যেকোনো মুহূর্তে চূড়ান্ত পর্যায়ের কর্মসূচি চলে আসবে। রাজপথ চূড়ান্ত আন্দোলনের সময় নির্ধারণ করবে।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি ও গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষ নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা এই সরকারের পতনের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা সরকার পতনের দাবিতে রাজপথে আছি। এটা কখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রূপ নেবে সেটি রাজপথ ঠিক করে দেবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম (বীর প্রতীক) বলেন, আমরা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর প্রবেশমুখে আছি। চূড়ান্ত আন্দোলন শুরুর প্রস্তুতি হিসেবেই আজ ১৫ দিনের এই লাগাতার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এই কর্মসূচি শেষের পরই চূড়ান্ত কর্মসূচির ঘোষণা আসবে। আমরা সেই আন্দোলনে সবাই আছি এবং থাকব।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, মানুষ রাস্তায় নেমে গেছে। আমরা ও গণতন্ত্র মঞ্চ আগামী ৪ অক্টোবর পর্যন্ত কর্মসূচি ঘোষণা করেছি। আগামীকাল ঢাকায় আমাদের চারটি স্থানে সমাবেশ হবে। এ ছাড়া পেশাজীবী সমাবেশ, শ্রমিক সমাবেশ ও ছাত্র সমাবেশের যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে তাদের আমরা রাজনৈতিকভাবে সহযোগিতা করব। মোটকথা আপনি বলতে পারেন আমরা আন্দোলনের একটা চূড়ান্ত পর্যায়ে আছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষ নেতা ও ভাসানী অনুসারী পরিষদের আহ্বায়ক শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু বলেন, আমরা ঢাকাসহ সারা দেশে ১৫ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছি। এই কর্মসূচির পরই সব কর্মসূচি ঢাকাকেন্দ্রিক হবে। আমরা আন্দোলনের সব পদ্ধতি ব্যবহার করব। ঘেরাও, হরতাল, অবরোধ সব থাকবে। সেই আন্দোলন কী রূপ ধারণ করবে তা সরকারের ওপর নির্ভর করে। সরকার যদি সহনীয় হয় আমাদের আচরণও সহনীয় হবে। সরকার যদি আক্রমণাত্মক হয়, হামলা-নির্যাতন চালায় তাহলে আমরা তা প্রতিরোধ করব। সরকারের ভাষায় আমরা জবাব দেবো। সরকারের আচরণের ওপর নির্ভর করবে আমাদের আচরণ।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, আমরা সরকার পতনের চূড়ান্ত আন্দোলনে আছি। এই সরকারের বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে। তফসিল ঘোষণা করে দলীয় সরকারে অধীনে আরেকটি নির্বাচন করার খায়েশ আওয়ামী লীগকে পূরণ করতে দেয়া হবে না। তফসিলের আগেই জনগণ এই সরকারকে বিদায় করবে।





