দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ তারিখ ছিল ৩০ নভেম্বর। এই নির্বাচনে ৭৪৭ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ৩২টি রাজনৈতিক দল থেকে ১৯৬৬ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। এর মধ্যে পাঁচটি আসনে দু’জন করে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। আর ১৮টি আসনে লাঙ্গল প্রতীকে দু’জন করে প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয়। এ ছাড়া বিএনপি থেকে বাগিয়ে নিয়ে নৌকার প্রার্থী করার অভিযোগ রয়েছে।
এ দিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না রাজপথের প্রধান দুই বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ৪৭টি রাজনৈতিক দল। তাদের মধ্যে বিএনপিসহ ১১টি ইসিতে দল নিবন্ধিত। আর জামায়াতে ইসলামীসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। এ ছাড়া সকল ক্রাইটেরিয়া পূরণের পরেও একাধিক বিরোধী রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন না দিয়ে সরকারের পছন্দের কয়েকটি দলকে নিবন্ধন দেয়ার অভিযোগ করে আসছে বিরোধী দলগুলো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে সরকারের উচিত সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করা। মুষ্টিমেয় সরকারের অনুগত দলগুলোকে নিয়ে যেনতেন একটা নির্বাচন করা হলে দেশ জাতীয় সঙ্কটে পড়বে। তারা আরো বলেন, যেসব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন তারা অধিকাংশই বানানো চরিত্র। মূলত তারা সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেয়া দলগুলোকে জনসমর্থনহীন কিংস পার্টি উল্লেখ করে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুটো ব্র্যান্ড। একটি হলো ‘বিএনপি’ আরেকটি ‘আওয়ামী লীগ’। এই দুই দলের একটি যদি নির্বাচনে অংশ না নেয় তবে সেটা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে পারে না। বিএনপি ছাড়া অনুগত কিছু দল ও ব্যক্তিকে নিয়ে সরকার যে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিয়েছে সেটাকে আপনি নির্বাচন বলতে পারেন না। এটা একটি সিলেকশন। এর ফলাফল পূর্ব নির্ধারিত যা আমরা সবাই জানি। এখন শুধু ঘোষণার বাকি।

এ বিষয়ে বিশ্লেষক প্রফেসর দিলারা চৌধুরী বলেন, সরকার তার পছন্দের কিছু অনুগত দলকে বিরোধী দল বানিয়ে একটি পাতানো নির্বাচনের আয়োজন করেছে। যেই নির্বাচনে জনসমর্থিত দলগুলো অংশগ্রহণ করছে না। এটাকে কোনোভাবে নির্বাচন বলা যায় না। সরকারের উচিত মানুষের মনের ভাষা বুঝে পদত্যাগ করে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের রাস্তা করে দেয়া। এর ফলে চলমান যে জাতীয় সঙ্কট তৈরি হয়েছে তার সমাধান হবে। আর অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে এই সঙ্কট আরো অনেকগুণ বৃদ্ধি পাবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা: সাখাওয়াত হোসেন সায়ান্ত বলেন, নির্বাচনকে বৈধতা দিতে সরকার নিবন্ধিত দলের হিসাব দেখাচ্ছে। মূলত এ দেশে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টি জনসমর্থিত দল। এ ছাড়া যারা আছেন তারা এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক। তাদের তেমন কোনো জনসমর্থন নেই। তাই এদেরকে বাদ দিয়ে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে পারে না। এ সময় ডা: সায়ান্ত আরো বলেন, আপনি শুধু বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলো কেন, নির্দলীয় অনেক সংগঠন আছে তাদের কথা শুনুন। যেমন- টিআইবি, সুজন। সর্বোপরি যারা ভোট দেবেন তারা কী বলছেন তা দেখুন। সরকারের পোষ্য কিছু দল ছাড়া কেউ এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু, ন্যায্য, গ্রহণযোগ্য ও বৈধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে মনে করে না।

এ দিকে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর তৃণমূলের নেতাকর্মীরা দাবি করছেন, ৭ জানুয়ারি সরকারকে কোনো একতরফা নির্বাচন করতে দেয়া হবে না। তাদের দাবি বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো আগের চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালী। সরকারবিরোধী দলগুলোতে দীর্ঘদিন যাবৎ ঘাপটি মেরে থাকা বেঈমানদের বাগিয়ে নিয়ে গেছে। ফলে তারা অতীতের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। ঝালকাঠির বিএনপি নেতা গোলাম আযম সৈকত নয়া দিগন্তকে বলেন, শাহজাহান ওমরসহ বিএনপিতে থাকা বেঈমানদের সরকার নিয়ে গিয়ে বিএনপিকে বেঈমান মুক্ত করেছে। দল এখন বেঈমানমুক্ত। তাই তারেক রহমানের নেতৃত্বে চলমান সরকার পতনের আন্দোলন শিগগিরই সফলতা অর্জন করবে বলে দাবি করেন তিনি।

বাংলাদেশ লেবারপার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা যারা ভোটের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করছি তাদের সাথে এখন জেনারেল ইবরাহিমদের মতো বেঈমানরা নেই। আমরা এখন একে অপরের ওপর অত্যন্ত বিশ্বাসী। শিগগিরই আমরা চলমান আন্দোলনের মাধ্যমে এই সরকারের পতন ঘটিয়ে দেশের মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনবো।
উল্লেখ্য, নির্বাচনে অংশ না নেয়া নিবন্ধিত ১১ রাজনৈতিক দল হলো, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি-এলডিপি, ইসলামী আন্দোলন, সিপিবি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, খেলাফত মজলিস, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ইনসানীয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাপ।

নিবন্ধন ছাড়া বাকি ৩৬টি দল হলো- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি (জাফর), নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদ, ভাসানী অনুসারী পরিষদ, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, বাংলাদেশ জাস্টিস পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় দল, ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি, বাংলাদেশ এলডিপি, বাংলাদেশ লেবারপার্টি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট, এনডিএম, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল, বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপি, জাগপা (খন্দকার লুৎফুর), ডেমোক্র্যাটিক লীগ (ডিএল), বাংলাদেশ ন্যাপ, বিকল্প ধারা (নুরুল আমিন), সাম্যবাদী দল, গণদল, ন্যাপ-ভাসানী, ইসলামী ঐক্যজোট, পিপলস লীগ, গণফোরাম, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী)।

বিগত দুটো জাতীয় নির্বাচনে মানুষের ভোটের অধিকার হরণ করা হয়েছে এমন অভিযোগ তুলে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে দীর্ঘ দিন ধরে রাজপথে আন্দোলন করে আসছে এসব রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু বিরোধী দলগুলোর চলমান আন্দোলন কর্মসূচির মধ্যেই গত ১৫ নভেম্বর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। তফসিল ঘোষণার পর পরই তা প্রত্যাখ্যান করে সরকার পতনের একদফা দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয় বিরোধী দলগুলো। চলমান আন্দোলনের মধ্যেই আন্দোলনে থাকা বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ মুসলীম লীগ- বিএমএল ও বাংলাদেশ মাইনরটি পার্টি নামে তিনটি দল বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনেই নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দেয়। তবে বিএনপি-জামায়াতসহ বাকি ৪৭টি রাজনৈতিক দল নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন ও সরকার পতনের একদফা দাবিতে অনড় রয়েছে।