২০২৩ সালে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত দিন ছিল ২৮ অক্টোবর। এই দিনে একসাথে রাজধানীতে প্রায় ৫০টি রাজনৈতিক দল মহাসমাবেশ করে। বিশেষ করে স্বল্প দূরত্বের ব্যবধানে রাজধানীর নয়াপল্টন, বায়তুল মোকাররম ও মতিঝিল শাপলা চত্বর এলাকায় যথাক্রমে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর সমাবেশকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপের অন্ত ছিল না। এই সমাবেশকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক তৎপরতাও ছিল লক্ষ্য করার মতো।
দীর্ঘদিন বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো রাজপথে সফলতা না পেলেও ২৮ অক্টোবরকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলোর তৃণমূল নেতাকর্মীর মধ্যে একপ্রকার উদ্দীপনা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল দলগুলো। মাঠে সরকার পতনের যে হাকডাক ছিল তাতে আশাবাদী ছিল নেতাকর্মীরা। তবে সরকারের কঠোর অবস্থানে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর সাথে

পুলিশ সংঘর্ষে জড়ালেও পুলিশের কঠোর অবস্থানে কোণঠাসা হয়ে পড়ে তারা। এসব সংঘর্ষের ঘটনায় একাধিক মামলায় বিএনপি-জামায়াতের শীর্ষ নেতাসহ হাজার হাজার বিরোধী নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে সরকার বিরোধীদলগুলোর চলমান আন্দোলনকে দমন নিষ্ঠুরভাবে করেছে।
উল্লেখ্য, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিলকে সামনে রেখে এ দিন রাজধানীতে মহাসমাবেশ করে বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো। একই দিনে রাজধানীতে সমাবেশ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সমাবেশের পূর্বে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপিকে সমাবেশের অনুমতি দিলেও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে তাদের পছন্দমতো মতিঝিল শাপলা চত্বরে সমাবেশের অনুমতি দেয়নি ডিএমপি। এমনকি জামায়াতকে ২৮ অক্টোবর রাজধানীতে কোনোভাবে সমাবেশ করতে দেয়া হবে না এমন সিদ্ধান্তে অনড় ছিল পুলিশ। তবে পুলিশের সব বাধা উপেক্ষা করে সমাবেশস্থলে লাখ লাখ জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী সমাবেশ শুরুর আগেই সমাবেশ স্থলের দিকে যেতে থাকে। পরে পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে জামায়াতকে তাদের পছন্দের ভেনু মতিঝিল শাপলা চত্বরের পাশেই আরামবাগ মোড়ে সমাবেশের অনুমতি দেয়। পরে জামায়াত শান্তিপূর্ণ সমাবেশের মাধ্যমে সমাবেশস্থল ত্যাগ করে। এ দিন জামায়াতের সাথে পুলিশের কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি।

তবে নয়াপল্টনে বিএনপির সমাবেশে আসা লাখ লাখ নেতাকর্মীর ঢল ছড়িয়ে পড়ে কাকরাইল-পুরানাপল্টনসহ আশপাশের এলাকায়। এসব এলাকা দিয়েই বায়তুল মোকাররমে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমাবেশে আসছিল আওয়ামী ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। বিএনপির দাবি- সমাবেশে সিনিয়র নেতাদের বক্তৃতা চলাকালীন বিনা উসকানিতে সমাবেশ পণ্ড করতে তাদের নেতাকর্মীর ওপর হামলা চালায় পুলিশ। যে হামলা রূপ নেয় সংঘর্ষে। পুলিশের সাথে বিএনপি নেতাকর্মীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে কাকরাইল থেকে ফকিরাপুল, নাইটেঙ্গল মোড় থেকে পুরনো পল্টন মোড়, পুরনো পল্টন মোড় থেকে দৈনিক বাংলা মোড় হয়ে আবার ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সংঘর্ষের ঘটনায় এক পুলিশসহ একাধিক প্রাণহানীরে ঘটনা ঘটে। পুলিশসহ আহত হয় বিএনপির বহু নেতাকর্মী। পুলিশি হামলার প্রতিবাদে সমাবেশ থেকেই পরদিন ২৯ অক্টোবর সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দেয় বিএনপি।
সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সংঘর্ষের ঘটনায় একাধিক মামলা করে পুলিশ। এসব মামলায় বিএনপির সিনিয়র নেতাদেরসহ সারা দেশে হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে দাবি বিএনপির। বন্ধ করে দেয়া হয় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়। পরে কার্যালয়ে যেতে কোনো বাধা নেই পুলিশের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য দেয়া হলেও এখনো পর্যন্ত তালাবদ্ধ রয়েছে কার্যলয়টি। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, ২৮ অক্টোবর সরকারবিরোধী দলগুলোকে নির্মূল করতে ক্র্যাকডাউন চালিয়েছে।

উল্লেখ্য, ২৮ অক্টোবর দেশের রাজনৈতিক মাঠে গুরুত্বপূর্ণ দিন হওয়ায় দেশসহ আন্তর্জাতিক মহলের নজর ছিল দিনটির প্রতি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এদিন পুলিশ যদি যেকোনো সংঘর্ষ এড়িয়ে যেতে পারত তা হতো ক্ষমতাসীনদের জন্য আশীর্বাদের মতো। এ দিন বিএনপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে যে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়েছে তা সরকারের জন্য মড়ার উপর খাড়ার ঘাঁ হিসেবে কাজ করেছে। কারণ ২০১৪ ও ২০১৮-এর নির্বাচনে সরকারের ওপর যে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল এবং বিরোধী দলগুলো অন্যায়ভাবে নিপীড়ন নির্যাতনের যে অভিযোগ করে আসছিল তা অনেক বেশি শক্ত ভিত পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলের সামনে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো নিপীড়ন-নির্যাতনের অভিযোগকে দাঁড় করাতে শক্তিশালী প্রমাণ পেয়েছে। তবে সরকারদলীয় শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে ফুটে উঠেছে ভিন্ন চিত্র। তারা বলছে, সরকার দেশে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য ঠেকাতে সক্ষম হয়েছে। সরকারদলীয় নেতারা বলছেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হচ্ছে। নির্বাচনে অংশ নেয়া বা না নেয়া উভয়ই গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করা অসাংবিধানিক। কেউ যদি অগ্নিসন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টা করে বা নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে চায় তবে তাদের কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।