জালিয়াতচক্র সদস্যরা অভিবাসনপ্রত্যাশী কারো কারো কাছ থেকে টাকা নিয়ে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সুরক্ষিত সার্ভারে ঢুকে নিজেদের ইচ্ছেমতো স্মার্টকার্ড বানিয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিএমইটি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি টের পেয়ে ইতোমধ্যে জালিয়াতি করে বানানো ২৪টি কার্ড চিহ্নিত করেছে। জালিয়াতির সাথে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সূত্র মতে, পাঁচ সদস্যের ওই তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে বিএমইটির পরিচালক মো: মিজানুর রহমানকে। তবে সন্দেহভাজন একজন সিস্টেম অ্যানালিস্টকেও কমিটিতে রাখা হয়েছে। ফলে তদন্তে আসল অপরাধীদের শনাক্ত করা যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান বিশেষজ্ঞরা।
গত রোববার বিএমইটির পরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ভূঁইয়ার কাছে তদন্ত প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অথচ ২০১৭ সালে দুবাই কোটা জালিয়াতির ঘটনা, এরপর মালয়েশিয়া সার্ভার জালিয়াতি এবং সর্বশেষ সৌদি আরবের সার্ভার জালিয়াতির ঘটনায় সময়ও বহির্গমন শাখার পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন মিজানুর রহমান ভূঁইয়া।
বিএমইটির স্মার্টকার্ড মূলত গুরুত্বপূর্ণ ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট, যা অভিবাসনপ্রত্যাশী কোনো কর্মীর বিদেশে যাওয়ার সরকারি অনুমোদনপত্র হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। ভিসা, মেডিক্যাল রেকর্ড, ব্যাংক তথ্য, বিদেশে চাকরির সত্যতাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাই করার কাজে লাগে এই কার্ড। এই কার্ড ছাড়া কোনো শ্রমিক কাজের জন্য বিদেশে যেতে পারেন না। গুরুত্বপূর্ণ এই কার্ড মূলত দুইভাবে ইস্যু হয়ে থাকে বিএমইটি অভিবাসনপ্রত্যাশী কর্মী বিএমইটিতে আবেদন করে এই কার্ড পেতে পারেন, আবার ‘আমি প্রবাসী’ নামের একটি অ্যাপের মাধ্যমেও খুব সহজে ও কম সময়ে পাওয়া যায়। কিন্তু এই দু’টি উপায় ছাড়াই একটি জালিয়াতচক্র বিএমইটির সার্ভারে ঢুকে নিজেদের ইচ্ছেমতো স্মার্ট কার্ড সংগ্রহ করা শুরু করেছে।
জানা যায়, চলতি মাসের শুরুর দিকে সৌদি আরবে যেতে ইচ্ছুক এক কর্মীর আবেদনসংবলিত নথি আসে একজন পরিচালকের সামনে। নথি পর্যালোচনা করে ওই কর্মকর্তা একটি স্মার্টকার্ডও দেখতে পান। কিন্তু দাখিল করা স্মার্টকার্ডসহ নথি বা অ্যাপ কোনোটিই তিনি অনুমোদন করেননি। কার্ডের বিষয়ে তার সন্দেহ হলে তিনি আরো কিছু নথিতে নজর রাখা শুরু করেন। কিছুদিনের মধ্যে একের পর এক বেরিয়ে আসে জালিয়াতচক্রের তৈরি করা ২৪টি স্মার্টকার্ড। শীর্ষপর্যায়ে বিষয়টি জানানোর পর পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
জানা গেছে, রাজধানীর ১৫/১৭ ফকিরাপুল এলাকার আলিফ ওভারসিজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স (নম্বর ৮৪৭) ব্যবহার করা হয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানের নামে সৌদি আরবে যেতে ইচ্ছুক ২৪ জন কর্মী এমন স্মার্টকার্ড সংগ্রহ করেছেন। তাদের মধ্যে আছেন মো: এনামুল হক, মো: সোহেল রানা, তাইজাল, আমীন, দিদার আলী ও উসমান। বিএমইটির একাধিক কর্মকর্তা জানান, নানা ধরনের সমস্যার কারণে যেসব শ্রমিক বিদেশে কাজ করতে যেতে প্রশাসনিক ঝামেলায় পড়েন, তারাই মূলত মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কার্ড পেতে বিকল্প পথ খোঁজেন।
ওই জালিয়াতির বিষয়ে জানতে বিএমইটির মহাপরিচালক সালেহ মোহাম্মদ মোজাফফরকে গত দুই দিন ফোন করেও পাওয়া যায়নি। কথা বলার কারণ জানিয়ে বার্তা দিয়েও তার সাড়া মেলেনি।
বিএমইটিতে দাখিল করা কাগজপত্রে আলিফ ওভারসিজের মালিক হিসেবে মনিরুল ইসলামের নাম আছে। তার বক্তব্য জানতে ফোন করা হলে তিনি সব কথা শুনে কোনো মন্তব্য না করে সংযোগ কেটে দেন। এরপর একাধিকবার ফোন করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এ দিকে বিএমইটির ডিজিটাল সার্ভিস পার্টনার হিসেবে অনলাইনে সেবা দিয়ে আসছেন ‘আমি প্রবাসী’ লিমিটেড। বিষয়টি সম্পর্কে আমি প্রবাসীর সিইও নামির আহমেদ বলে, আমি প্রবাসী হলো একটি সিস্টেম অনেকটা পোস্টবক্সের মতো। সেবাগ্রহীতাদের সেবাগুলো সিস্টেমটা জেনারেট করেছি। তবে কোনো কিছু প্রুফ করা বা রিজেক্ট করার ক্ষমতা আমাদের নাই, এই ক্ষমতা বিএমইটির হাতেই ন্যস্ত।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বিএমইটির একাধিক কর্মকর্তা জানান, সার্ভারের রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তির সবদিক দেখভাল করেন মূলত সংস্থাটির সিস্টেম অ্যানালিস্ট। সেখানে দায়িত্বে আছেন সিস্টেম অ্যানালিস্ট আবু রায়হান ও মোহাম্মদ মামুন অর রশিদ। বিএমইটির সংশ্লিষ্ট লোকজনের সাথে একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক রবিউল ইসলাম রবিনের যোগসাজশ আছে। এর আগে আরেকটি জালিয়াতির অভিযোগে বিএমইটির পক্ষ থেকে করা মামলায় রবিনকে আসামিও করা হয়েছিল।
ওই কর্মকর্তারা বলেন, সুরক্ষিত সার্ভারে ঢুকে কিভাবে একটি চক্র এত স্মার্টকার্ড ইস্যু করল, তা বিবেচনায় নিতে হবে। অভিযোগের তীর যাদের দিকে তাদের একজন সিস্টেম অ্যানালিস্ট আবু রায়হান। তাকেও তদন্ত কমিটিতে রাখা হয়েছে। এতে তদন্তকাজের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
সুরক্ষিত সার্ভারে ঢুকে কিভাবে এত স্মার্টকার্ড ইস্যু করল জানতে চাইলে আবু রায়হান বলেন, ‘এ বিষয়ে কথা বলার এখতিয়ার আমার নেই। আমি যদি এর সাথে জড়িত থাকি তা বিভাগীয়ভাবে দেখবে। আপনি আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে কথা বলুন।’
সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘সরকারি সংস্থার সার্ভারে বাইরের কারো প্রবেশ করা তো সহজ বিষয় না। এখানে যারা দায়িত্বে ছিলেন, তাদের সন্দেহের বাইরে রাখা যাবে না। এখন কথা হলো, যারা ঘটনার সাথে যুক্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, তাদের কাউকে যদি তদন্ত কমিটিতে রাখা হয়, তাহলে সেই তদন্ত গ্রহণযোগ্য হবে না।’





