‘খেয়ে নিও মা। আমার আসতে দেরি হবে।’ এই বলে বাসা থেকে বের হয়ে যায় আসিফ ইকবাল। বাসায় যখন ফিরেছে তখন নিথর দেহ। বুকের পাঁজর ভেদ হয়ে ভিতরে ঢুকেছে গুলি। ক্ষত দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। মা সেই নিথর দেহটি কিছুক্ষণ আগলে রাখবেন বুকের মধ্যে পাষণ্ড পুলিশ সেই সুযোগও দেয়নি। তাড়াহুড়া করে দাফন করতে হয়েছে ময়না তদন্ত ছাড়াই।
পল্লবীর দেয়ালে দেয়ালে শহীদ আসিফ ইকবালের ছবি। যে এলাকায় তার বসবাস ছিল সেখানে তার নামে চত্বর হয়েছে। বন্ধু ও পরিচিত মহলে তাকে নিয়েই সব আলোচনা। গত ১৯ জুলাই মাগরিবের কিছু আগে মিরপুর ১০ নম্বরে হেলিকপ্টার দিয়ে ছাত্র-জনতার উপর করা গুলিতে আসিফ শহীদ হন। আসিফের বাসা পল্লবী মডেল স্কুলের গলির শেষ মাথায় ৭ নম্বর রোডের ২৮ নম্বর বাড়িতে। আসিফরা দুই ভাই-বোন। বাবার নাম আব্দুর রাজ্জাক। ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (আইইউবি) বসুন্ধরা ক্যাম্পাসের মার্কেটিং বিভাগের মাষ্টার্সের ছাত্র ছিলেন আসিফ। গ্রামের বাড়ি মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার নোহাটা গ্রামে। আসিফের মা গণমাধ্যমকে জানান, ছাত্র-জনতার উপর পুলিশের নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আসিফ খুবই মর্মাহত ছিল। ঘটনার আগের রাতে সে তার বোনের সাথে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে অনেক আলোচনা করে। পরদিন দুপুরের দিকে বাসা থেকে বের হয়ে যায়, ‘আসতে দেরি হবে ’ বলে। মাকে বলে যায় খেয়ে নেয়ার জন্য। সে দিন ছিল শুক্রবার। স্থানীয়রা জানান, আসিফ পল্লবী এলাকাতেই জুমা’র নামাজ আদায় করে। এরপর আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার উদ্দেশ্যে মিরপুর-১০ নম্বরে যায়। যাওয়ার সময় অনেকের কাছেই বলে গেছে মিরপুর যাওয়ার কথা।
পরিবার জানায়, আসিফের সাথে তার এক কাজিনও ছিল। তারা মিরপুর ১০ নম্বরের একটি মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করে। মাগরিবের কিছু আগে ওই এলাকায় হেলিকপ্টার থেকে নির্বিচারে গুলি করা হয়। তার একটি গুলি আসিফের বুকে বিদ্ধ হয়। ঘটনাস্থল থেকে সহযোদ্ধারা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার মৃত ঘোষাণা করেন। হাসপাতাল থেকে পুলিশ বাধ্য করে ময়না তদন্ত ছাড়াই লাশটি গ্রামের বাড়িতে নেয়ার জন্য।
আসিফের প্রতিবেশী বন্ধু-সহপাঠী ও সঙ্গীরা জানান, আসিফ এলাকায় ব্রাদার হিসেবে পরিচিত ছিল। যে কোনো মানুষের বিপদে তাকে পাশে পাওয়া যেত। মানুষকে সাহায্য করাই ছিল তার কাজ। খেলাধুলায়ও তার মন ছিল। এলাকার যেকোনো খেলাধুলায় অংশ নিত। যে কারণে এলাকার ছোট-বড় সবার কাছে আসিফ ছিল প্রিয়জন। আসিফকে হারিয়ে তারা স্তম্ভিত। এলাকার দেয়ালে দেয়ালে তাই তারা আসিফের ছবি এঁকে রেখেছে। চারদিকে শুধু আসিফ আর আসিফ।
বাবা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তিনি এখনো পেছনে পেছনে আব্বু আব্বু ডাক শুনতে পান। মনে হয় আসিফ পিছনে হাঁটছে আর তাকে ডাকছে। ঘরের সব কিছুই আসিফ করত। তিনি শুধু দেখাশুনা করতেন।
আসিফের মা জানান, ঘরটা এখন ফাঁকা। সব কিছু শূন্য। তার ছেলে বলে গিয়েছিল আসতে দেরি হবে। কিন্তু সে যে আর আসবেই না তা কে জানতো। প্রতিবেশীরা বলেছিলেন, আসিফকে আটকে রাখতে। কিন্তু মায়ের কথা হচ্ছে, ওকে কি আর আটকে রাখা যায়!





