‘গুলি করলে মরে একটা কিংবা আহত হয় একটা। একটাই যায় স্যার, বাকিডি যায় না। এইটা হলো স্যার সবচেয়ে বড় আতঙ্কের এবং দুশ্চিন্তার বিষয়।’ এভাবেই সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের সাবেক আইজি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের কাছে ছাত্র-জনতা হত্যার বর্ণনা দিচ্ছিল ওয়ারী জোনের ওই সময়ের ডিসি ইকবাল। মানুষ হত্যার এই নির্মম ভিডিও দেখার পাশাপাশি ইকবালের বর্ণনা শুনে যাচ্ছিলেন কামাল ও মামুন। এভাবে মানুষ হত্যার বিষয়ে তারা কোনোই প্রতিবাদ করেননি। সেই ডিসি ইকবালকে গত সোমবার রাতে গোপন স্থান থেকে নিয়ে এসেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। তবে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে ইকবালকে গ্রেফতার বা আটকের বিষয়ে কিছুই জানায়নি। মহানগর পুলিশের জনসংযোগ বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- বিষয়টি সম্পর্কে তারা কিছু জানেন না। তাদেরকে কিছু জানানো হয়নি।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় কিছু পুলিশ সদস্যের পাশবিকতা ছিল উল্লেখ করার মতো। তারা নির্বিচারে গুলি চালিয়ে তারা ছাত্র-জনতাকে হত্যা করে। এই এলাকার একাধিক বাসিন্দা বলেছেন, আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেনি এমনও অনেক মানুষকে যাত্রাবাড়ীর পুলিশ নির্বিচারে হত্যা করেছে। এই হত্যার নেতৃত্ব দিয়েছে যাত্রাবাড়ীর তৎকালীন ওসি (তদন্ত) ও ওসি অপারেশন। তাদের নির্দেশদাতা ছিলেন ডিসি ওয়ারী ইকবাল। ওসি (তদন্ত) জাকিরকে দেখা যায় প্রকাশ্যেই এক যুবককে গুলি করে হত্যা করছে। ওই যুবককে বাঁচাতে এসেছিল অপর এক যুবক। তাকেও জাকির গুলি করেছে। জাকিরের এই গুলি করার দৃশ্য দেখে অনেকেই হতবাক হয়েছেন। ওই এলাকার বাসিন্দা শফিক আহমেদ গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, তাকে প্রকাশ্যে গুলি করেছে ওসি অপারেশন ওহিদুল হক মামুন। শফিক বলেন, পুলিশ যে এতটাই নির্মম হতে পারে তা আগে বুঝতে পারেননি তিনি। তার পাশে জুরাইন কবরস্থান রোডের এক যুবক ছিল। পুলিশ তার মুখ বরাবর টিয়ার শেল মারে। এতে ঘটনাস্থলেই শাকিল নিহত হন। এসব কিছুই ঘটে ওয়ারী জোনের ওই সময়ের ডিসি ইকবালের নির্দেশে।

শুধু গুলি করে মানুষ হত্যা করেই খান্ত হয়নি এসব পুলিশ কর্মকর্তা। ওই হত্যার ভিডিও তারা নিজেরাই ধারণ করেছে, যা সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্তাদের দেখিয়ে বাহবা কুড়িয়েছে। এমনই এক ভিডিওতে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল ও আইজিপি মামুনকে দেখানোর সময় দারুণ উচ্ছ্বসিত দেখা যায় ডিসি ইকবালকে। কে বা কারা ওই ভিডিও দেখানোর দৃশ্যটিও ভিডিও করেন, যা এখন মানুষ দেখে ছি-ছি করছে। ভিডিওতে দেখা যায়, ডিসি শিক্ষার্থীদের গুলি করে হত্যার পর মোবাইলে ধারণকৃত ভিডিও দেখিয়ে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান খান কামালকে পরিস্থিতির বর্ণনা দিচ্ছিল। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পালানোর মধ্য দিয়ে আওয়ামী সরকারের পতনের পর পুলিশের এই ডিসিকে খুলনা রেঞ্জে পুলিশ সুপার পদে বদলি করে সংযুক্ত করা হয়েছে। জানা গেছে, বদলির পর ডিসি ইকবাল সংশ্লিষ্ট রেঞ্জে যোগ না দিয়ে আত্মগোপনে চলে যায়। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, পুলিশের গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা সোমবার রাতে নরসিংদীর নিজ বাড়ি থেকে ডিসি ইকবালকে নিয়ে আসেন; কিন্তু গতকাল পর্যন্ত এ বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় ওয়ারী বিভাগের যাত্রাবাড়ী ও শনির আখড়া এলাকা ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ঢাকায় সবচেয়ে বেশি পুলিশ ও ছাত্র-জনতাসহ সাংবাদিক হতাহত হয়েছেন এই দুই এলাকায়। এর মূল দায়ী হিসেবে অনেকেই ডিসি ইকবালকে শনাক্ত করেছেন। এক যাত্রাবাড়ীতেই নিহত হয়েছে এক শ’র উপরে। এই এলাকাতেই নিহত হয়েছেন সাংবাদিক হাসান মেহেদী। মেহেদীকেও ডিসি ইকবালের নির্দেশেই গুলি করা হয়েছে বলে একটি সূত্র জানায়। অভিযোগ রয়েছে- হানিফ ফ্লাইওভারের উপরে বেশ কয়েকজনকে হত্যা করে লাশ ফেলে রেখেছিল পুলিশ। ওই লাশের তথ্য সংগ্রহ ও ছবি ধারণ করার সময় পুলিশ তাকে সরাসরি গুলি করে হত্যা করে।