সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ক্যাশিয়ার বলে খ্যাত ধনঞ্জয় এখনো বহাল তবিয়তে। অথচ এই ধনঞ্জয়ের মাধ্যমেই কামাল কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ঠতার কারণে তিনি কাউকে তোয়াক্কা করতেন না। তার ইচ্ছেমতোই চলত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বদলি, প্রমোশন সবই ছিল তার নিয়ন্ত্রণে।
কথিত রয়েছে আসাদুজ্জামান কামাল যখন বাসা থেকে বের হতেন, তখন তার স্ত্রী বলে দিতেন ধনঞ্জয়ের কথা মতো কাজ করতে। কামাল তার স্ত্রীর কথা শুনতে বাধ্য ছিলেন। মন্ত্রণালয়ে ঢুকে তিনি ধনঞ্জয়ের কথামতোই কাজ করতেন। এভাবেই ধনঞ্জয় কুমার দাস স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক ক্ষমতাধর কর্মকর্তায় পরিণত হন। যুগ্মসচিব পদমর্যাদার এই কর্মকর্তা ঘুষ দুর্নীতিতে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. হারুন অর রশীদ বিশ^াসের সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা। মোট কথা কামালের ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করতেন এই ধনঞ্জয়।

এ ছাড়া ধনঞ্জয়ের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উসকানির অভিযোগ রয়েছে। হাসিনা সরকারের আমলেই এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তার এমন বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। স্বৈরাচার হাসিনার পতনের পরও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধাতে নানাভাবে চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনে নিজেই মাঠে নেমেছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অধিশাখার দায়িত্বে থাকা যুগ্ম সচিব ধনঞ্জয় কুমার দাস।
২০২২ সালের ১০ এপ্রিলে আওয়ামী লীগ সরকারের একটি গোপন প্রতিবেদনে ধনঞ্জয় কুমার দাস সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি চরম দুর্নীতিগ্রস্ত। তিনি ২০১৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে জননিরাপত্তা বিভাগে কর্মরত ছিলেন। পুলিশে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য করে তিনি বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন। ২০১৯ সালে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর নিয়োগে ১০ জনের কাছ থেকে এক কোটি টাকা নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই সময় পুলিশের শীর্ষ কর্তাদেরও তিনি তোয়াক্কা করতেন না। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মেজর (অব:) সিনহা রাশেদ খান হত্যাকাণ্ডে জড়িত টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাসের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নিতেন ওই সময়ে। ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ার কুয়ালামপুরে বাংলাদেশ দূতাবাসের ফাস্ট সেক্রেটারি থাকাকালে সেখানে সেকেন্ড হোম তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ আছে। বাড়ি কিনেছেন কানাডায়। তার অবৈধ আয়ের অর্থ আরো অনেক দেশে পাচার করেছেন বলে অভিযোগ আছে।

ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের লোকদের তিনি অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কমার্শিয়াল কাউন্সেলর ও প্রথম সচিব পদে প্রার্থী ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপসচিব ধনঞ্জয় কুমার দাস। ওই সময়ে তার জীবন বৃত্তান্ত যাচাই সংক্রান্ত এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়।
পরবর্তীতে ধনঞ্জয় যুগ্ম সচিব হন। পুলিশের বদলি, পদায়ন তখন তার হাতের মুঠোয়। এ ছাড়াও জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে আওয়ামী লীগ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে মূল ভূমিকায় অবতীর্ণ হন তিনি। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমন করতে আগস্টের শুরুতে দুই দিন তাকে রাজপথে দেখা গেছে। পরবর্তীতে সরকারের পতনের পর দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন তিনি। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র ধনঞ্জয় থাকতেন জগন্নাথ হলে। পদ-পদবি না থাকলেও সক্রিয় ছিলেন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব হারুন অর রশীদ বিশ্বাসের সিন্ডিকেটের হয়ে অবাধে ঘুষবাণিজ্য করেছেন এই ধনঞ্জয় কুমার দাস। এই সিন্ডিকেটের আশীর্বাদ ছাড়া পুলিশের কেউ কোনো জেলায় বা গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন পেতেন না। জেলা পুলিশ সুপার পদায়নের ক্ষেত্রে ১ থেকে ৩ কোটি টাকা নিত এই সিন্ডিকেট। ওসিদের ক্ষেত্রে থানা অনুসারে ১৫ লাখ থেকে দেড় কোটি পর্যন্ত বাণিজ্য করার তথ্য রয়েছে।
এক তারকা নারী সাংবাদিকের সাথে রয়েছে ধনঞ্জয় কুমার দাসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ধনঞ্জয়ের স্ত্রী শ্রাবণী সূত্রধর জলিকে এটিএন নিউজে সংবাদ পাঠিকা হিসেবে চাকরি দিয়েছিলেন ওই নারী সাংবাদিক। কাওরানবাজার এলাকায় তারা বিভিন্ন সময় নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। সেখানে উপস্থিত হতেন ধনঞ্জয় কুমার দাসসহ সিন্ডিকেটের অনেকেই। স্বামীর বদৌলতে অত্যন্ত বিলাসী জীবনযাপন করেন শ্রাবণী সূত্রধর জলি। প্রায়ই ঘুরে বেড়ান বিশে^র বিভিন্ন দেশে। বনানীর ১৩ নম্বর সড়কে ‘ত্রিভ’ নামে একটি ফ্যাশন হাউজের মালিক শ্রাবণী। সূত্রাপুর, নিকেতনসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসা করেছেন ধনঞ্জয়। ধনঞ্জয়ের প্রভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্টেনোগ্রাফার হিসেবে চাকরি করছেন শ্যালিকা লাবণী সূত্রধর।
জানা গেছে, একাধিক বাড়ি, বিলাসবহুল গাড়িসহ বিপুল সম্পদের মালিক ধনঞ্জয় কুমার দাস। ছেলে সৌভিক দাস জয়কে লেখাপড়া করাচ্ছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মালয়েশিয়াতে তার বিপুল সম্পত্তি রয়েছে বলে জানা যায়। বর্তমানে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েই বহাল তবিয়তে আছেন।