স্বৈরাচার সরকারের পেটোয়াবাহিনী তাদের অত্যাচার-নির্যাতন শুধু দেশে বসবাসকারীদের ওপরই করেনি। বিদেশের মাটিতেও তাদের হাতে অনেক প্রবাসী জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। স্বৈরাচারের এমনই এক সহযোগী কর্মকর্তা হলেন উপসচিব মোহাম্মদ নাহিদ ইসলাম। ওমানে তার হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অনেক প্রবাসী। এখন ওই প্রবাসীরা এই নাহিদ ইসলামের বিচার দাবিতে সোচ্চার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নাহিদ ইসলামের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, লোপাট ও প্রবাসীদের হয়রানি করাসহ অনেক অভিযোগ আছে। কথিত আছে রাষ্ট্রদূত পর্যন্ত তার কাছে অসহায় ছিলেন। দূতাবাসের প্রথম সচিব আবু সাইদসহ আরো কয়েকজন ছিলেন তার সহযোগী। ‘চেতনার’ কথা বলে তারা সব অন্যায়কে বৈধ করার চেষ্টা চালিয়েছেন বছরের পর বছর। তার আক্রোসের শিকার হয়ে অনেককে চাকরিচ্যুত হয়ে কিংবা ব্যবসা খুইয়ে ওমান থেকে দেশে ফিরতে বাধ্য হতে হয়েছে। তার নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা এখন তার বিরুদ্ধে মামলাসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছেন।
এমনই একজন নির্যাতিত ব্যক্তি হলেন, ডা: মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন চৌধুরী। তিনি জানান, ‘আল্লাহ সদয় না হলে আমাকে এখনো ওমানের জেলে থাকতে হতো অথবা দেশের আয়নাঘরে কিংবা ক্রসফায়ারেও পড়তে পারতাম।’

সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের মদদে নাহিদ তার ওপর সমস্ত ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে বলে সাজ্জাদ হোসেন অভিযোগ করেন। তিনি জানান, ‘আমি লিয়নে ওমানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইবরা হাসপাতালে জুলাই ২০১১ থেকে মার্চ ২০২১ পর্যন্ত শিশু বিশেষজ্ঞ পদে কাজ করেছি। আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে তারা বাংলাদেশ স্কুল মাসকাটে পড়ত। তাই আমি ২০১৯ সালের স্কুলের ১২ এপ্রিল স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের অভিভাবক সদস্য পদে নির্বাচন করি। মাস্কাটে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রবল বিরোধিতার মুখেও আমি অভিভাবকদের ভোটে নির্বাচিত হই। শুধু তা-ই নয় ওমানের শিক্ষা মন্ত্রণালয় আমাকে পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত করে। কিন্তু দূতাবাসের কর্মকর্তা নাহিদ ইসলাম ও আবু সাঈদ আমার বিরুদ্ধাচরণ করতে থাকেন। তারা আমাকে মিথ্যা ট্যাগ প্রদান করেন। আমি ইসলামিক উগ্রবাদী ওথবিএনপি-জামায়াতকে বিদেশে সংগঠিত করছি এমন অভিযোগ দিয়ে আমাকে ওমান থেকে বহিষ্কার করতে ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমার নিয়োগকারী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি দেয়। এতে তৎক্ষণাৎ আমাকে ওমান থেকে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

এ দিকে ওমানের মিনিস্ট্রি অব ওয়াকফের করা মামলায় আদালত বাংলাদেশ স্কুল জালান বু আলীকে ৩২ হাজার রিয়াল প্রদানের জন্য রায় প্রদান করে। ডা: সাজ্জাদ বলেন, ‘দূতাবাস ষড়যন্ত্র করে এই রায়ের কপি গোপন করায় আমি স্কুলের চেয়ারম্যান থাকায় আমাকে গ্রেফতার করে। কোনো ব্যক্তিগত অপরাধে নয়, বরং বাংলাদেশ স্কুল মাসকাটের জিম্মাদার হিসেবে আমি গ্রেফতার হয়েছিলাম। কিন্তু তবুও বাংলাদেশ দূতাবাসের কেউ আমার জামিনের জন্য সাহায্য করেনি। বরং কমিউনিটির মাধ্যমে আমার বন্ধুদের শাসিয়েছে- কেউ যেন আমাকে সাহায্য না করে। জামিনযোগ্য মামলায় ২৩ দিন জেলে থাকার পর ওমান দূতাবাস বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তায়েব আলায়ির জামিন আবেদনের পর আমার জামিন হয়।’
তিনি বলেন, ‘আমার ফেসবুকের লেখাগুলোকে সে এভিডেন্স বানিয়ে দেশের সব গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পাঠিয়েছিল।’ এ ছাড়া পাসপোর্ট নবায়ন বাবদ সার্ভিস চার্জ হিসেবে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে বাংলাদেশের মাস্কাট দূতাবাস। গালফ ওভারসিজ ও ওমান এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে এই অর্থ আদায় করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠান দু’টি আর্থিকসংশ্লিষ্ট হলেও পাসপোর্টের মতো ব্যক্তিগত তথ্য সমৃদ্ধ বিষয় নবায়ন করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানকে। ফলে অনেকের গোপনীয়তা ফাঁস হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন ডা: সাজ্জাদ।

জানা গেছে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম যখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন তখন নাহিদ তার পিএস ছিলেন। সেই সম্পর্কের সূত্র কাজে লাগিয়ে তিনি বিসিএস প্রশাসন থেকে ডেপুটেশনে বিসিএস পররাষ্ট্রে আসেন এবং ওমানে পদায়ন পান। শাহরিয়ার আলমের মদদে তিনি ওই সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ও বাংলাদেশ দূতাবাসে একজন ছাত্রলীগ নেতার মতো কাজ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, গত ১০ জুন থেকে ৬ ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত যে সেবার জন্য মাথাপিছু চার রিয়াল, যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৯০০ টাকা করে আদায় করা হয়েছে। একই সেবার জন্য ৬ ডিসেম্বর ২০২০ থেকে ১ রিয়াল বা ২২১ টাকা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। যে সেবা এক রিয়ালে দেয়া সম্ভব হচ্ছে, ওই সেবার জন্য সাত মাস ধরে চার রিয়াল করে কেন আদায় করা হলো? অতিরিক্ত টাকা কোথায় গেল?
অভিযোগ রয়েছে, গালফ এক্সচেঞ্জের কর্মকর্তা ইফতেখার চৌধুরী ও দূতাবাসের কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাহিদ ইসলামের যোগসাজশে এ দুর্নীতি হয়েছে। লকডাউনের কারণে ওমানে বসবাসরত প্রবাসী শ্রমিকরা যখন দুঃসহ জীবনযাপন করশ্রণ, তখন তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে তা লুটপাট করায় বিদেশে সরকার ও বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য উপসচিব নাহিদ ইসলামের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি।