পুলিশের লুণ্ঠিত আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদের মধ্যে এখনো প্রায় দুই হাজার অস্ত্র ও প্রায় তিন লাখ গুলি উদ্ধার হয়নি। পলাতক রয়েছেন অনেক পুলিশ সদস্য। পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, এই অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে চেষ্টা চলছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শুরুতে কিছু পুলিশ সদস্য ও ঊর্ধ্বতন কর্তার নির্দেশে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর তাণ্ডব চালায়। প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় ছাত্র-জনতাকে। এমনকি ছাত্র-জনতাকে হত্যার পর গাড়িতে স্তূপ করে লাশ পুড়িয়ে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে। সাভারের আশুলিয়ায় হত্যার পর ৪৬ লাশ পুড়িয়ে ফেলার ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ ৩৬ জনকে আসামি করে গতকাল অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা হয়েছে। ঢাকা জেলার অতিরিক্ত এসপি আব্দুল্লাহ কাফির সরাসরি উপস্থিতিতে এই হত্যা ও লাশ পুড়ে ফেলার ঘটনা ঘটে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কাফিকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। পুলিশের এই তাণ্ডবের পরিণতি হিসেবে ছাত্র-জনতাও ব্যাপকভাবে পুলিশের ওপর আক্রমণ চালায়। এমনকি, রাজধানীসহ সারা দেশের থানায় থানায় আক্রমণ চালানো ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ সময় বেশ কিছু থানা, ক্যাম্প ও ফাঁড়ি থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ খোয়া যায়।
পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, ওই সময় সর্বমোট পাঁচ হাজার ৮১৭টি আগ্নেয়াস্ত্র খোয়া যায়। এর মধ্যে ১৮ শ’ ৯০টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। যার মধ্যে রয়েছে, চায়না রাইফেল ২৯৬টি, রাইফেল ৮টি (বিডি) একটি, এসএমজি-টি ৫৬ (চায়না) ৬০টি, এলএমজি-টি ৫৬ (চায়না ১১টি, পিস্তল-টি ৫৪ (চায়না) ৮৩১টি, এসএমজি/এসএমটি একটি, ১২ বোর শটগান ৫৬৬টি, ৩৮ মি.মি. গ্যাস গান (সিঙ্গেল শট) ১১৭টি, টিয়ার গ্যাস লাঞ্চার (সিক্স শট) ৫টি এবং ২৬ মি.মি. সিগন্যাল পিস্তল দু’টি।
গোলাবারুদের মধ্যে দুই লাখ ৯৫ হাজার ২২৭টি বিভিন্ন বোরের গুলি, বিভিন্ন ধরনের টিয়ার শেল ৮৮৭৮টি, সাউন্ড গ্রেনেড ২৫৬৪টি, কালার স্মোক গ্রেনেড ৭৮টি, সেভেন/মাল্টিপল ব্যাং স্টান গ্রেনেড ৩৭টি, ফ্ল্যাশ ব্যাং/৬ ব্যাং গ্রেনেড ৩৬০টি এবং হ্যান্ড হেল্ড টিয়ার গ্যাস স্প্রে (ক্যানিস্টার) ৮৩টি এখনো উদ্ধার হয়নি। যৌথবাহিনীর অভিযানেও এই আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে গতকাল পর্যন্ত তেমন সফলতা দেখা যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পলায়নের পর অনেক পুলিশ সদস্য আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ ফেলে রেখে, নিজেদের পোশাক খুলে রেখে পালিয়ে যায়। এমনকি, আন্দোলনকারীরা পুলিশ সদর দফতরসহ বিভিন্ন কার্যালয়ে হামলা চালালে সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরাও আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ ও পোশাক খুলে রেখে সাধারণ মানুষের বেশে যে যেদিক পেরেছেন পালিয়ে আত্মরক্ষা করেছেন। পুলিশ সদর থেকে তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ চার কর্মকর্তা হেলিকপ্টারযোগে পালিয়েছেন। বাকিরা দেয়াল টপকে যে যেভাবে পেরেছেন আত্মরক্ষা করেছেন। পরবর্তীতে ওই সব পুলিশ সদস্যের ফেলে যাওয়া আগ্নেয়াস্ত্র গোলাবারুদ ও পোশাকসহ পুলিশের ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম পরিত্যক্ত অবস্থায় অনেক স্থান থেকে উদ্ধার হয়েছে। একটি সূত্র জানিয়েছে, যেসব আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ এখনো উদ্ধার হয়নি সেজন্য পেশাদার দুর্বৃত্তদের যেভাবে সন্দেহ করা হচ্ছে; তেমনি পালিয়ে থাকা কিছু পুলিশ সদস্যকেও সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে। এখন পর্যন্ত কী পরিমাণ পুলিশ সদস্য পলাতক অবস্থায় রয়েছেন তা জানা যায়নি। তবে পুলিশেরই একটি সূত্র বলেছে, এই সংখ্যা নেহাত কম হবে না। তাদেরকে কর্মস্থলে ফেরানোর নানা চেষ্টা চলছে।