খাদ্য গুদামের পরিদর্শক। দারুণ লোভনীয় একটি পদ। এই পদে নিয়োগ পেতে সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্রের মিন্টো রোডের সরকারি বাস ভবনে লাইন লেগে থাকত মানুষের। লেনদেন হতো কোটি কোটি টাকা। তবে বিপুল অঙ্কের টাকা দিয়েও অনেকে নিয়োগ পাননি বলে অভিযোগও আছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাবেক খাদ্যমন্ত্রীর ডিও লেটার ও সুপারিশে গুদামের ধারণ ক্ষমতা ও বিলি-বিতরণের পরিমাণ বিবেচনায় গুদামভেদে ৩০ লাখ থেকে এক কোটি টাকার বিনিময়ে খাদ্য গুদামে পরিদর্শক পদায়ন করা হতো। সাবেক মন্ত্রীর সুপারিশে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দলীয় ঘরানার এসকল গুদাম কর্মকর্তাগণ চাল ও গম কালো বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ডজনখানেক খাদ্য পরিদর্শক মন্ত্রীর মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবন ও আশপাশে থাকতেন সব সময়। খাদ্য বিভাগের কতিপয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মদদে সাধন চন্দ্র মজুমদারের গা ছুয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া খাদ্য পরিদর্শকসহ বেশ কিছু কর্মকর্তা এখনো স্বপদে বহাল তবিয়তে সক্রিয়। খাদ্য ভবনসহ মাঠপর্যায়ের সব স্থাপনা সাবেক খাদ্যমন্ত্রীর নিয়োগ দেয়া জনবল দিয়ে চলছে এখনো। একই কর্মস্থলে দুই বছর বা অনধিক তিন বছর পূর্ণ হলে খাদ্য অধিদফতরের বদলি বা পদায়ন নীতিমালা অনুযায়ী অন্যত্র বদলির বিধান যথাযথভাবে বাস্তবায়ন ও উল্লেখযোগ্য রদবদল নেই। খাদ্য অধিদফতরে সরেজমিন দেখা যায় যে, মহাপরিচালকের একান্ত সচিব দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর একই চেয়ারে আছেন। সহকারী উপপরিচালক পর্যায়ের কেউ কেউ ১৫ বছর, ১০ বছর ও ৫ বছর ধরে খাদ্য ভবনে একই কর্মস্থলে কর্মরত আছেন।
স্বল্প মূল্যে প্রতি কেজি চাল ৩০ টাকা ও প্রতি কেজি আটা ২৭.৫০ টাকা দরে খোলাবাজারে বিক্রি (ওএমএস) কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত ডিলার বা ব্যবসায়ীরা ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক সরকারের এমপি, মন্ত্রীর সুপারিশে নিয়োগ পেয়েছেন। একজন ডিলার বা ব্যবসায়ীকেও ক্ষমতাচ্যুত মন্ত্রীর সুপারিশ ব্যতিরেকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। অসাধু খাদ্য গুদাম কর্মকর্তাদের (ওসি এলএসডি) সহযোগিতায় সাবেক খাদ্যমন্ত্রীর নিকটাত্মীয় ও আস্থাভাজন ডিলার-মিলাররা সরকারি গুদাম হতে ওএমএসের মানসম্মত চাল ও আটা পরিবর্তন করে নিম্নমানের চাল বা আটা গরিব অসহায় মানুষকে সরবরাহ করে আসছেন বলেও অভিযোগ আছে। এমনকি খোলা বাজারে বিক্রি (ওএমএস) চাল, আটা সামান্য কিছু ভোক্তাকে সরবরাহ করে বিরাট একটা অংশ খাদ্য পরিদর্শকদের যোগসাজশে বেশি দামে কালো বাজারে বিক্রি করে দেয়ার বহু নজির রয়েছে। খোলাবাজারে বিক্রির চাল-আটা ও বিভিন্ন কর্মসূচির খাদ্যদ্রব্য ভোক্তা যথাযথভাবে না পেলে হঠাৎ করে বাজার দর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। খাদ্য পরিদর্শক, ডিলার ও ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে বাজারে চাল, গম ও আটার বাজার দর বেড়ে গেলে সরকার বেকায়দায় পড়বে এবং তাদের ভাবমর্যাদাও ক্ষুণœ হবে।
খাদ্য অধিদফতরে খোঁজ নিয়ে জানা যায় যে, প্রতিটি পদের কাজের ধরন ও প্রকৃতি অনুযায়ী পদ সৃষ্টি হলেও তার বাস্তবায়ন নেই। খাদ্য পরিদর্শক পদের কাজ হলো মাঠপর্যায়ে বাজার মনিটরিং করা, বাজার দর নজরে রাখা, ধান, চাল ও গম ক্রয় করা ইত্যাদি হলেও তাদের যথাযথ কাজে না লাগিয়ে অফিসে ক্লার্ক প্রকৃতির কাজে নিযুক্ত রাখা হয়েছে। অডিটরদের কাজ অডিট করা হলেও তাদের দিয়ে অফিসে কম্পিউটার টাইপের কাজে নিযুক্ত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া কারিগরি প্রকৃতির সাইলোর জনবল বিভিন্ন সংস্থাপনায় সংযুক্তি দিয়ে অফিস সহায়ক ও ক্লার্কের কাজ করানো হচ্ছে। কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবল সাধারণ সংস্থাপনায় সংযুক্তিতে থাকায় সরকারের উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে, সরকারি অর্থের ক্ষতি হচ্ছে ও প্রতিনিয়ত অডিট আপত্তি হচ্ছে। বদলি নীতিমালায় সাধারনত অনধিক তিন বছর পরপর কর্মস্থল পরিবর্তনের বিধান থাকলেও খোদ খাদ্য অধিদফতরের প্রধান কার্যালয়ে এর বাস্তবায়ন নেই।