আসন্ন গণভোটে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রকাশ্য সমর্থন একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনের নিরপেক্ষতার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে- সাম্প্রতিক সময়ে এমন প্রশ্ন ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং একটি স্পষ্টকরণ ব্যাখ্যা দিয়েছে।

প্রেস উইংয়ের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, অন্তর্বর্তী সরকারের ম্যান্ডেট এবং আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চার আলোকে মূল্যায়ন করলে এ ধরনের সমালোচনার কোনো ভিত্তি নেই। বরং সঙ্কটময় এই সময়ে নীরবতা নিরপেক্ষতার প্রতীক নয়, তা দায়িত্বশীল নেতৃত্বের অভাবকেই নির্দেশ করে।

ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার শুধু দৈনন্দিন রাষ্ট্র পরিচালনা বা নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য গঠিত হয়নি। দীর্ঘদিনের অপশাসনের ফলে সৃষ্ট শাসনতান্ত্রিক সঙ্কট, জনঅনাস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রেক্ষাপটে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এই সরকার গঠিত হয়েছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যে এ সরকারের মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করা, গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে প্রয়োজনীয় সংস্কারের একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি করা।

প্রেস উইং জানায়, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গত ১৮ মাসে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী ও তরুণদের সাথে ব্যাপক পরামর্শের মাধ্যমে যে সংস্কার প্রস্তাব প্রণয়ন করেছেন, বর্তমান সংস্কার প্যাকেজ তারই ফল। সে কারণে এই সংস্কারের পক্ষে অবস্থান না নেয়ার পরামর্শ অন্তর্বর্তী সরকারের মূল উদ্দেশ্যকে ভুলভাবে বোঝার শামিল।

ব্যাখ্যায় আরো বলা হয়, যে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের দায়িত্ব নিয়ে গঠিত, গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের মুহূর্তে সেই সংস্কার থেকে নিজেকে দূরে রাখবে- এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।

আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চার প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রেস উইং জানায়, অন্তর্বর্তী হোক বা নির্বাচিত- কোনো সরকারপ্রধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন নিয়ে নীরব থাকার বাধ্যবাধকতা নেই।

গণতন্ত্রে প্রত্যাশা করা হয়, নেতারা জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরবেন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর ছেড়ে দেবেন।

ব্যাখ্যায় বলা হয়, গণভোট কোনো টেকনোক্র্যাটিক প্রক্রিয়া নয়, এটি সরাসরি জনগণের মতামত জানার একটি গণতান্ত্রিক মাধ্যম। সরকারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা যখন তাদের অবস্থান স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন, তখন ভোটারদের সিদ্ধান্ত আরো তথ্যভিত্তিক ও অর্থবহ হয়।

প্রেস উইংয়ের ব্যাখ্যায় গণতান্ত্রিক বৈধতার তিনটি মূল প্রশ্নও তুলে ধরা হয়- ভোটাররা সেই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করতে স্বাধীন কি না, বিরোধী পক্ষ প্রকাশ্যে প্রচারণা চালাতে পারছে কি না এবং পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য কি না। ব্যাখ্যায় বলা হয়, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই সব শর্ত অক্ষুণ্ণ রয়েছে।

সংস্কার ও গণভোটকে বাংলাদেশের বাস্তব সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করে প্রেস উইং জানায়, এটি কোনো বিমূর্ত নীতিগত প্রশ্ন নয়। বরং দীর্ঘদিনের শাসনব্যর্থতার জবাব, যা বছরের পর বছর নাগরিক সমাজ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্বিগ্ন করেছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন ও তত্ত্বাবধানকারী সংস্থার রাজনীতিকরণের মাধ্যমে দেশকে সঙ্কটে ফেলেছে।

এই বাস্তবতায় সংস্কারের পক্ষে প্রধান উপদেষ্টার অবস্থানকে ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহিতার প্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। যিনি নিজে সংস্কারের সমস্যা চিহ্নিত করেছেন এবং সমাধানে ঐকমত্য তৈরির নেতৃত্ব দিয়েছেন, তার জন্য নীরব থাকা হবে অসংগত ও দায়িত্বহীন- এমন মন্তব্য করা হয় ব্যাখ্যায়।

আন্তর্জাতিক নজির তুলে ধরে প্রেস উইং জানায়, বিশ্বজুড়ে বহু দেশে সরকারপ্রধানরা গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরিবর্তন-সংক্রান্ত গণভোটে প্রকাশ্যে পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

যুক্তরাজ্যের ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোট, স্কটল্যান্ডের ২০১৪ সালের স্বাধীনতা গণভোট, তুরস্কের ২০১৭ সালের সাংবিধানিক গণভোট, কিরগিজস্তান ও ফ্রান্সের বিভিন্ন গণভোটে সরকারপ্রধানদের ভূমিকার উদাহরণ দেয়া হয়।

এসব ক্ষেত্রে সরকারপ্রধানদের অবস্থানকে অগণতান্ত্রিক বলা হয়নি বরং এটিকে রাজনৈতিক জবাবদিহিতার স্বাভাবিক প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। নেতারা যা সঠিক মনে করেন তার পক্ষে কথা বলেন এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের সিদ্ধান্ত মেনে নেন।

গণভোটের বৈধতা নেতাদের নীরবতার ওপর নির্ভর করে না, এটি নির্ভর করে ভোটারদের স্বাধীনভাবে পক্ষে বা বিপক্ষে মত দেয়ার সুযোগের ওপর।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যের কথাও ব্যাখ্যায় তুলে ধরা হয়। গণভোটের ফলাফলের সাথে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো নির্বাচনী স্বার্থ জড়িত নয়। প্রধান উপদেষ্টা ও তার উপদেষ্টারা ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা, ব্যক্তিগত রাজনৈতিক লাভ বা দলীয় সুবিধা চান না। তাদের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে সময়সীমাবদ্ধ ও অন্তর্বর্তী।

জেলা পর্যায়ে সরকারি প্রচারণা নিয়ে ওঠা উদ্বেগের বিষয়ে প্রেস উইং জানায়, এসব কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য সংস্কারের বিষয়বস্তু ও গুরুত্ব জনগণের কাছে স্পষ্ট করা, বিশেষ করে যেখানে ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তি সচেতন অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। ক্রান্তিকালীন সময়ে এ ধরনের সরকারি সম্পৃক্ততা স্বাভাবিক এবং এটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অতিরিক্ত বা অনৈতিক প্রচারণা বলা যায় না। জন-পরিসরে থাকা আলোচনায় সরকারের উপস্থিতি বিরোধী মত দমন করে না, বরং নিশ্চিত করে যে নাগরিকরা বুঝেশুনে সংস্কার বিষয়ে মতামত দিতে পারেন।

ব্যাখ্যায় আরো বলা হয়, এই সময়ে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সমর্থনে নয় বরং দ্বিধা ও নীরবতায়।

অন্তর্বর্তী সরকার যে সংস্কারের দায়িত্ব নিয়েছে, তা সমর্থন না করলে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ণ এবং পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হবে।

ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়, ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রধান উপদেষ্টার অবস্থান সংস্কারমূলক ম্যান্ডেট, প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের অঙ্গীকার, আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চা এবং ভোটারদের প্রতি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণের হাতেই থাকবে- এটাই গণতন্ত্রের নিশ্চয়তা। নেতৃত্ব সেই সিদ্ধান্ত কেড়ে নেয় না বরং তা স্পষ্ট ও অর্থবহ করতে সহায়তা করে।

সূত্র : বাসস