অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
কোনোভাবেই ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না দেশের পুঁজিবাজার। একদিন কিছুটা ভালো কাটলেও পরদিন ফের বিক্রয়চাপে অস্থির হয়ে পড়ছে দেশের পুঁজিবাজারগুলো। সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও পুঁজিবাজারগুলো কর্তৃপক্ষ সবার পক্ষ থেকে বারবার আশার বাণী শোনানো হলেও তার কোনো প্রভাব নেই পুঁজিবাজারে। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে যে মন্দাভাব বিরাজ করছে তারই স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটছে পুঁজিবাজারে। এখানে কথার  চেয়ে অর্থনীতির বাস্তবতাই বেশি প্রাধান্য পায়। 
গড় সপ্তাহে (২৭ সেপ্টেম্বর -১ অক্টোবর) দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৪৬ দশমিক ০৮ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। রোববার পাঁচ হাজার ৫৭৮ দশমিক ৩৩ পয়েন্ট থেকে সপ্তাহ শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার সপ্তাহান্তে নেমে আসে পাঁচ হাজার ৫৩১ দশমিক ৬৫ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৮ দশমিক ৫৮ ও ১৫ দশমিক ৬৩ পয়েন্ট। 
সপ্তাহটির মোট পাঁচটি কর্মদিবসের চারটিতেই সূচক হারায় ডিএসই। সপ্তাহের শুরুটাও ছিল পতন দিয়ে। পরবর্তী দু’দিনও নেতিবাচক আচরণেই শেষ হয় বাজারটির লেনদেন। তবে চতুর্থ দিনের এসে হারানো সূচকের কিছুটা ফিরে পেলেও সপ্তাহের শেষ দিন ফের বিক্রয়চাপের মুখে পতন ঘটে সূচকের। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, পুুঁজিবাজার হচ্ছে অর্থনীতির আয়নাস্বরূপ। দেশের অর্থনীতি যেভাবে পারফর্ম করবে তারই প্রতিফলন দেখা যাবে পুঁজিবাজারে। এ মুহূর্তে বৈশি^ক বিভিন্ন অস্থিরতা বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ গোটা বিশ^ব্যবস্থাকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এতে জড়িত পক্ষগুলোও হয়তো জানে না এ যুদ্ধ কোনদিকে মোড় নিচ্ছে। এই অনিশ্চয়তাই বিশ^ অর্থনীতিকে অনেকটা স্থবির করে তুলছে যার ভোগান্তির অংশীদার আমরাও। 
নেতিবাচক বাজার আচরণের কারণে গত সপ্তাহে ডিএসই্র লেনদেনেরও অবনতি ঘটেছে। বাজারটি গত সপ্তাহে তিন হাজার ৫৩০ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ কম। আগের সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেন ছিল তিন হাজার ৯২৮ কোটি টাকা। একইভাবে ডিএসই’র গড় লেনদেন নেমে আসে ৭৮৫ কোটি টাকা থেকে ৭০৬ কোটি টাকায়। 
একই কারণে বিদায়ী সপ্তাহটিতে ডিএসইর বাজার মূলধনেরও বড় ধরনের অবনতি ঘটে। সপ্তাহান্তে বাজারটির মূলধন দাঁড়ায় ছয় লাখ ৮৫ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা দশমিক ৬৭ শতাংশ কম। সপ্তাহের শুরুতে বাজারটির মূলধন ছিল ছয় লাখ ৯০ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। 
খাতভিত্তিক লেনদেনে গত সপ্তাহে বস্ত্র খাতের শেয়ারের আধিপত্য ছিল। লেনদেনচিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সপ্তাহে ডিএসইর মোট লেনদেনের ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ দখলে নিয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে বস্ত্র খাত। ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ লেনদেনের ভিত্তিতে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল সাধারণ বীমা খাত। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ওষুধ ও রসায়ন খাতের দখলে ছিল লেনদেনের ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। মিউচুয়াল ফান্ড খাত ৮ শতাংশ লেনদেনের ভিত্তিতে তালিকার চতুর্থ অবস্থানে ছিল। আর পঞ্চম অবস্থানে থাকা ব্যাংক খাতের দখলে ছিল মোট লেনদেনের ৬ দশমিক ১ শতাংশ।
ডিএসইতে গত সপ্তাহে বেশির ভাগ খাতেই দরপতন ঘটে। এখানে মোট ২০টি খাতের মধ্যে দু’টি বাদে ১৮টি খাতেরই দরপতন ঘটে। পতন সামলে নেয় টেক্সটাইল ও পাট খাত। এ দু’টি খাতে যথাক্রমে ১ দশমিক ৪১ ও ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। অন্যান্য খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দরপতনের শিকার ছিল সেবা ও রিয়েল এস্টেট খাত। এ খাতটিতে দরপতন ঘটে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এ ছাড়া কাগজ খাতে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ, সিরামিক ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ৩ দশমিক ১ শতাংশ, সিমেন্ট খাথতে ২ দশমিক ৮ শতাংশ দরপতন ঘটে। বাজারটিতে এর বাইরে থাকা খাতগুলোতেও কমবেশি দরপতনের ঘটনা ঘটে। 
গত সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল টেক্সটাইল খাতেরই সায়হাম টেক্সটাইলস। গড়ে ৩১ কোটি ১৬ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে কোম্পানিটির যা ছিল  ডিএসইর মোট লেনদেনের ৪ দশমিক ৪১ শতাংশ। গড়ে ২৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা টাকা লেনদেন করে এ সময় দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইপিডিসি ফিন্যান্স। সপ্তাহিক লেনদেনে ডিএসইর শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস, মালেক স্পিনিং, ব্র্যাক ব্যাংক, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, এপেক্স স্পিনিং মিলস, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স ও এনভয় টেক্সটাইলস। 
লেনদেনের মতো গত সপ্তাহে ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতেও শীর্ষ কোম্পানি ছিল সায়হাম টেক্সটাইলস। পুরো সপ্তাহে কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ১২ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল একই খাতের এসকে ট্রিমস। সাপ্তাহিক মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সিএপিএম আইবিবিএল ফান্ড, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স, অ্যাসোসিয়েটেড অক্সিজেন, সমতা লেদার, তুংহাই টেক্সটাইলস, দুলামিয়া কটন মিলস, ইভিন্স টেক্সটাইলস ও প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস। 
গত সপ্তাহে ডিএসইর দরপতনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল প্রাইম ফিন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড। ১১ দশমিক ৫৮ শতাংশ দর হারায় এ ফান্ড। ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল টেক্সটাইল কোম্পানি সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলস। দরপতনে ডিএসইর শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে বিডি থাই ফুডস, বিআইএফসি, এএফসি এগ্রো বায়োটেক, বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেমস, আইসিবি এএমসিএল সেকেন্ড মিউচুয়াল ফান্ড, জাহিন স্পিনিং, ঝিল বাংলা সুগার মিলস ও এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড।