যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটনে এক জাঁকজমকপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে একটি বাল্ড ঈগলের ভাস্কর্য উপহার দিয়েছেন। এই বাল্ড ঈগল উত্তর আমেরিকার একটি স্থানীয় পাখি এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতীক।

বৃহস্পতিবারের (২৪ সেপ্টেম্বর) ওই নৈশভোজে ভিআইপি বা অতি গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের সামনে উন্মোচিত হওয়া উপহারটি ‘আমেরিকার স্বাধীন ও ঊর্ধ্বগামী চেতনার’ প্রতীক বলে জানান ট্রাম্প।

তিনি বলেন, তিনি ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প এর নকশা তৈরির কাজে অংশ নিয়েছিলেন।

মূর্তিটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি মূল্যবান, তবে কখনো কখনো জটিল একটি দিকের অংশ; আর তা হলো- উপহার বিনিময়।

এ ধরনের উপহার শি ও ট্রাম্পের তিনদিনের শীর্ষ বৈঠকের বৃহত্তর লক্ষ্য, অর্থাৎ বিশ্বের দুই পরাশক্তির নেতাদের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রচেষ্টার একটি ছোট হলেও তাৎপর্যপূর্ণ উপাদান।

এশিয়া গ্রুপের অংশীদার ড্যানিয়েল ক্রিটেনব্রিঙ্ক বলেন, ‘তারা এসব জটিল বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন। কিন্তু দিনের শেষে, তারা দু’জনই মানুষ। তাই সেই ব্যক্তিগত সম্পর্কের গুরুত্ব আছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমার মনে হয়, উপহার বিনিময় তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’

যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিক হিসেবে ৩০ বছরেরও বেশি সময় কাজ করা ক্রিটেনব্রিঙ্কের বেশিভাগ সময় কেটেছে এশিয়ায়। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক শির জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তার বিশ্বাস, ট্রাম্প ও শির সরাসরি সম্পর্কই ‘বিশ্বের সবচেয়ে জটিল এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কটিকে’ একসাথে ধরে রাখার আঠার কাজটি করছে।

ক্রিটেনব্রিঙ্কের মতে, ‘নেতা-পর্যায়ের কূটনীতি’কে ট্রাম্পও গুরুত্ব দেন।

ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিতে উপহারের একটি স্বতন্ত্র উপস্থিতি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট একটি বিলাসবহুল জাম্বো জেট, খোদাই করা সোনার বার, হীরা ও রত্নখচিত সোনার আংটি এবং আরো নানা উপহার পেয়েছেন।

নরওয়েজিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের ওলে জ্যাকব সেন্ডিং বলেন, ‘আপনি যদি এভাবে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির দিকে তাকান, তাহলে আমার মনে হয় উপহার দেয়া, অন্তত বিস্তৃত অর্থে, তার কাজের পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’

বৃহস্পতিবার সকালে শি ঘোষণা করেন, চীনের পক্ষ থেকে আটলান্টার একটি চিড়িয়াখানাকে দু’টি পান্ডা উপহার দেয়া হবে এবং একটি নতুন শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি চালু করা হবে, যার আওতায় পাঁচ বছরে এক লাখ মার্কিন শিক্ষার্থী চীনে পড়াশোনার সুযোগ পাবে।

শি বলেন, ‘জায়ান্ট পান্ডা চীনা ও আমেরিকান জনগণের মধ্যে বন্ধুত্বের দূত হিসেবে কাজ করেছে। আর কয়েক দিনের মধ্যেই দু’টি পান্ডা, পিং পিং ও ফু শুয়াং, তাদের নতুন আবাস জু আটলান্টায় যাবে এবং আমেরিকান জনগণের সাথে দেখা করবে।’

তিনি আরো কোনো উপহার দিয়েছেন কি-না, তা স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে বিবিসি হোয়াইট হাউসের সাথে যোগাযোগ করেছে।

বর্তমানে জাঁকজমকপূর্ণ উপহার দেয়ার চর্চা মূলত উপসাগরীয় দেশগুলো এবং স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলোতে বেশি দেখা যায়।

সেন্ডিংয়ের সাথে কূটনীতি ও উপহার বিষয়ে একটি গবেষণাপত্রের সহলেখক মর্টেন স্কুমসরুড অ্যান্ডারসন বলেন, ‘চীনের মতো স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো অনেক বেশি দামী উপহার দেয়।’

তিনি আরো বলেন, পশ্চিমা বিশ্বে গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধের কারণে এই ঐতিহ্য অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে গেছে।

উদাহরণ হিসেবে, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে একটি এমোলুমেন্টস ধারা রয়েছে, যা বিদেশী সরকারের কাছ থেকে একজন প্রেসিডেন্ট কত মূল্যের উপহার গ্রহণ করতে পারবেন তার সীমা নির্ধারণ করে।

বর্তমানে সেই সীমা ৫২৫ ডলার (৩৯৭ পাউন্ড)। এর চেয়ে বেশি মূল্যের কিছু হলে তা ফেডারেল সম্পত্তি হয়ে যায়, যদি না প্রেসিডেন্ট নিজের অর্থে তা কিনে নেন।

এছাড়া নির্দিষ্ট মূল্যের বেশি কোনো উপহার দিতে গেলে একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, যদি না তিনি ব্যক্তিগতভাবে এর মূল্য পরিশোধ করেন।

সেন্ডিং বলেন, ‘এখানে অনেক নিয়ম ও প্রটোকল জড়িত। কী ধরনের উপহার দেয়া হবে, কোথায় উপহার বিনিময় হবে, কিভাবে হবে, কখন হবে, এসব নিয়ে প্রচুর ভাবনা ও প্রক্রিয়া থাকে। এসবই অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং এর সাথে নিম্নস্তরে বহু সপ্তাহ ধরে চলা আলোচনা ও সমন্বয় জড়িত।’

অ্যান্ডারসন যোগ করেন, ‘এটি বিমানবন্দরে শেষ মুহূর্তে কেনা কোনো জিনিস নয়।’

২০১৩ সালে শির যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাকে ক্যালিফোর্নিয়ার স্থানীয় রেডউড কাঠ দিয়ে তৈরি একটি খোদাইকৃত বেঞ্চ উপহার দিয়েছিলেন, যেখানে তারা দু’জন সাক্ষাৎ করেছিলেন। পরে তারা সেটিতে একসাথে বসেন এবং ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে ছবি তোলেন।

এটি ২০০৯ সালের তুলনায় অনেক সফল উদাহরণ ছিল, যখন তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন ওবামাকে একটি ঐতিহাসিক দাসবিরোধী জাহাজের কাঠ দিয়ে তৈরি শোভাবর্ধক পেন হোল্ডার উপহার দিয়েছিলেন; আর ওবামা ব্রাউনকে কিছু ডিভিডি উপহার দিয়েছিলেন, যা যুক্তরাজ্যের ডিভিডি প্লেয়ারগুলোর জন্য উপযুক্ত ফরম্যাটে ছিল না বলে জানা যায়।

সেন্ডিং বলেন, ‘এটি এক ধরনের বিব্রতকর বিনিময়ের উদাহরণ।’ 

সৌভাগ্যবশত, ব্রাউন ও ওবামা ছিলেন মিত্র দেশের নেতা, এমন প্রতিদ্বন্দ্বী নন যারা আপাতদৃষ্টিতে অমীমাংসিত মতপার্থক্য মেটানোর চেষ্টা করছিলেন।

সেন্ডিং বলেন, ‘আপনি ভুল করতে চাইবেন না।’ 

তিনি যোগ করেন যে ভুল উপহার সম্ভাব্যভাবে বড় কূটনৈতিক লক্ষ্যও ভেস্তে দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে ট্রাম্প ও শির মধ্যে অনেক কিছুই ঝুঁকির মুখে থাকতে পারে।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর এটি তাদের তৃতীয় সরাসরি বৈঠক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর সম্ভাব্য বিপর্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকার প্রেক্ষাপটে এই শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন দুই দেশ দ্রুত বিকাশমান এ শিল্পে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় রয়েছে।

এটি এমন সময়েও হচ্ছে, যখন তিক্ত যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ সাময়িক যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে কেবলমাত্র স্থগিত রয়েছে এবং এই সফরে সেই বিরতি আরো বাড়ানো হয়েছে।

তাই সামরিক বিমানের উড্ডয়ন হোক, অনুষ্ঠান হোক, গ্লাসে মদ ঢালা হোক, উপহার বিনিময় হোক, ‘এ সবই প্রটোকল, দৃশ্যমান বার্তা এবং উপহার বিনিময়, যার লক্ষ্য একটাই, স্থিতিশীল যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক,’ ক্রিটেনব্রিঙ্ক বলেন।

সূত্র : বিবিসি